ডেঙ্গু ভ্যাকসিন কবে পাবেন? কারা নেবেন?
  • ২২ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

প্রতি বছর ডেঙ্গুর কবলে পড়ে সারাদেশেই প্রাণ হারাচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ। অথচ সামান্য সচেতনতাই পারে অকাল মৃত্যু রুখে দিতে। পরামর্শে কেপিসি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের প্রফেসর ও প্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপাল ডাঃ কুণালকান্তি মজুমদার।

Advertisement

ডেঙ্গু জ্বর কী এবং কেন হয়?
ডেঙ্গু হলো একটি মশাবাহিত সংক্রামক রোগ, যা মূলত স্ত্রী এডিস মশার কামড়ে একজন মানুষের শরীর থেকে অন্য মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। ভাইরাসজনিত এই রোগে সাধারণত হঠাৎ করেই তীব্র জ্বর আসে। সঙ্গে গায়ে, হাতে, পায়ে, মাথায় এবং সারা শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা থাকে। এ ছাড়া চোখের পেছনে ব্যথা, বমি ভাব বা পেটে ব্যথা হতে পারে।
ডেঙ্গু মূলত চার ধরনের ভাইরাসের কারণে হতে পারে— ডেঙ্গু ১, ২, ৩ এবং ৪। বর্ষা শেষ হওয়ার পর এবং বর্ষার সময়ে (বিশেষ করে আগস্ট থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত) যখন চারদিকে জল জমে, তখন এই মশার উপদ্রব বহুগুণ বেড়ে যায়।
মশা চেনার উপায়:
এডিস মশা আকারে বেশ ছোট। এই মশার পায়ে পায়ে কালো- সাদা ডোরাকাটা দাগ থাকে। এই কারণে এডিস মশাকে টাইগার মসকুইটো নামেও ডাকা হয়। এই মশা মূলত দিনের বেলায় (ভোরের দিকে বা বিকেলের দিকে) কামড়ায়।
সাধারণ ভাইরাল ফিভার নাকি ডেঙ্গু জ্বর? পার্থক্য কী?
ঋতু পরিবর্তনের সময় সাধারণ ভাইরাল ফিভার ও ডেঙ্গু— দুটিই বেশি দেখা যায়। সাধারণ ভাইরাল জ্বরে গলা ব্যথা, গায়ে-হাতে ব্যথা, ম্যাজমেজে ভাব থাকে এবং জ্বর সাধারণত দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে কমে যায়।
অন্যদিকে ডেঙ্গু জ্বরের তীব্রতা অনেক বেশি থাকে এবং তা তিন থেকে সাত দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। হঠাৎ করে জ্বর আসার পাশাপাশি সারা শরীরে ও গাঁটে তীব্র ব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, খিদে কমে যাওয়া এবং বমি ভাব থাকলে ডেঙ্গুর সন্দেহ করা উচিত। এই ঋতুতে এমন লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে রক্ত পরীক্ষা করানো অত্যন্ত জরুরি।
হেমোরেজিক ফিভার ও শক সিনড্রোম
সাধারণ ডেঙ্গু ফিভার বা ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু হলে কটা দিন ভোগান্তির পর নিজের প্রতিরোধ ক্ষমতার বলে রোগী ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং এতে মৃত্যুঝুঁকি কম থাকে। তবে ডেঙ্গুর দুটি মারাত্মক রূপ হলো—ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার এবং ডেঙ্গু শক সিনড্রোম।
এই জটিল রূপগুলোয় রোগীর প্রচুর রক্তক্ষরণ হতে পারে, প্লাজমা লিক হয়ে শরীর থেকে ফ্লুইড বেরিয়ে যায় এবং রোগী শকে চলে যেতে পারে। হঠাৎ দুর্বলতা, হাত-পা ঘামা, অস্থিরতা বাড়া, রক্তচাপ কমে যাওয়া এবং পালস রেট বেড়ে যাওয়া হলো শকের লক্ষণ। এক্ষেত্রে মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া বা চামড়ার নিচে রক্তক্ষরণ হয়ে কালো হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা যেতে পারে।
মনে রাখবেন, সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় চিকিৎসা না করালে এই ধরনের জটিল ডেঙ্গুতে প্রায় ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রাণহানির ঝুঁকি থাকতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে উচ্চ জ্বরের সময় খিঁচুনি (ফ্রেব্রাইল কনভালশন) হওয়ার প্রবণতাও দেখা যায়। তাই জ্বর এলে অথথা দেরি না করে চিকিত্‍সকের পরামর্শ মতো করান ডেঙ্গু নির্ণায়ক টেস্ট।
ডেঙ্গু নির্ণায়ক রোগ পরীক্ষা
ডেঙ্গু নির্ণেয় জ্বর আসার পর পাঁচদিনের মধ্যে করাতে হবে এনএস১ অ্যান্টিজেন পরীক্ষা। এই রিপোর্ট পিজিটিভ এলে রোগীর রোগের গতিপ্রকৃতির দিকে নজর রাখতে হবে। চিকিত্‍সকের পরামর্শ অনুসারে করাতে হবে প্লেটলেট কাউন্ট। তাতেই রোগীর শারীরিক পরিস্থিতির অবনমন ঘটলে তা সহজেই বোঝা যাবে। 
বন্ধ করুন মশার বংশবৃদ্ধি
গ্রামঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চলে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেশি হওয়ার একটাই কারণ, আর তা হল কৃত্রিম জলাধারের সংখ্যা বেশি থাকা। কৃত্রিম জলাধার কোনগুলি?
ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের কাপ, নারকেলের খোল, ভাঙা টিনের বাক্স, টবের জল, মাটির ভাঁড়, ঢাকনা ছাড়া জলের ট্যাঙ্ক, এয়ার কুলার, গাড়ির টায়ার কিংবা ফ্রিজের নিচে জমে থাকা জলে এডিস মশা ডিম পাড়ে। ফলে কোথাও জল জমতে দেবেন না। কোথাও জল জমে আছে দেখলে তা দ্রুত পরিষ্কার করুন।  প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার টবের জল বা চৌবাচ্চার জল ফেলে দিয়ে তা পরিষ্কার ও শুকনো করে আবার ব্যবহার করতে হবে।
রোগ প্রতিরোধের উপায়
শিশুদের খেলতে পাঠানোর সময় ফুলহাতা জামা ও ফুল প্যান্ট পরাতে হবে। জামায় মশা তাড়ানোর জন্য রোল অন ব্যবহার করতে পারেন।
এছাড়া দিনের বেলায় বিছানায় ঘুমালোও মশারি ব্যবহার করুন। ঘরের জানালায় নেট লাগান। মশা মারার স্প্রে ব্যবহার করতে পারেন।
প্লেটলেট কাউন্ট নিয়ে সতর্কতা
ডেঙ্গু হলে, প্লেটলেট কাউন্ট কমে যাওয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক কাজ করে। সাধারণত আমাদের রক্তে ২ থেকে আড়াই লক্ষ প্লেটলেট থাকে। প্লেটলেট ১ লক্ষের নিচে নামলে সামান্য ঝুঁকি থাকে, তবে রক্তক্ষরণের প্রবণতা সাধারণত প্লেটলেট ২০ থেকে ৩০ হাজারের নিচে নামলেই বাড়ে।
তাই অযথা আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে রোগীর প্লেটলেটের অবস্থার উপর নিয়মিত নজরদারি রাখা উচিত। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা শুরু করলে এই বিপদ থেকে মুক্ত পাওয়া সম্ভব।
খাদ্যাভ্যাস ও করণীয়
ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে ডিহাইড্রেশন বা জলশূন্যতা এড়ানো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রচুর পরিমাণে জল, ফলের রস এবং তরল খাবার খাওয়াতে হবে। রোগীকে ডিহাইড্রেটেড হতে দেওয়া যাবে না।
ডেঙ্গুতে অন্যান্য জ্বরের মতো সহজে হজমযোগ্য পাতলা ঝোল ভাত, ফল ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার খাওয়া যাবে।
ওষুধ নিয়ে সাবধান
ডেঙ্গু জ্বরে প্যারাসিটামল ছাড়া অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন বা কর্টিকোস্টেরয়েডের মতো ওষুধ ব্যবহার করলে রক্তক্ষরণের আশঙ্কা মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে কোনো ওষুধ খাওয়া যাবে না।
ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়ার মতো মশাবাহিত অসুখে রোগ সেরে যাওয়ার পরেও বেশ কিছুদিন শরীরে, গাঁটে এবং হাড়ে তীব্র ব্যথা ও শারীরিক দুর্বলতা থেকে যায়। এছাড়া জ্বর একবার কমে যাওয়ার পরেও হঠাৎ করে ক্রিটিক্যাল পিরিয়ডে শারীরিক জটিলতা ফিরে আসতে পারে। তাই জ্বর সেরে যাওয়ার পরও অন্তত সাত দিন সাবধানতা অবলম্বন করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শে থাকা প্রয়োজন।
ডেঙ্গুর নতুন ভ্যাকসিন
যে কোনও রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও কার্যকর উপায় হলো টিকাকরণ। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে বর্তমানে কিউডেঙ্গা নামক নতুন ভ্যাকসিনটি দেশের ড্রাগ কন্ট্রোল অথরিটি কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে।
একটি বেসরকারি সংস্থা এই ভ্যাকসিন বাজারজাত করবে। ২০২৭ সালের প্রথম দিকে এই ভ্যাকসিন বাজারে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। ভারত সরকারের ইউনিভার্সাল ইমিউনাইজেশন শিডিউলের (জাতীয় টিকাকরণ কর্মসূচি) মধ্যে এটি অন্তর্ভুক্ত হলে তা আরও সহজলভ্য ও সস্তা হবে। শুরুর দিকে এর আনুমানিক দাম প্রতি ডোজ ৩,০০০ থেকে ৬,০০০ টাকার মতো হতে পারে এবং চামড়ার নিচে (সাবকিউটেনিয়াসলি) অন্তত তিন মাসের ব্যবধানে দুটি ডোজ নিতে হবে।
কারা নিতে পারে
৪ বছর থেকে ৬০ বছর বয়সের মধ্যে থাকা যেকোনো মানুষ এই ভ্যাকসিন নিতে পারবেন। ডেঙ্গু ট্রান্সমিশন সিজন শুরু হওয়ার আগে এই ভ্যাকসিন নিয়ে নিলে রোগ থেকে অেনেকখানি সুরক্ষা পাওয়া যায়।
কারো একবার ডেঙ্গু হয়ে থাকলেও তিনি এই ভ্যাকসিন নিতে পারবেন। কারণ ডেঙ্গুর চার ধরনের ভাইরাস রয়েছে। ফলে কোনও ব্যক্তি দ্বিতীয়বার অন্য স্ট্রেনের ভাইরাসে আক্রান্ত হলে তাঁর শারীরিক জটিলতা বাড়ার ঝুঁকি থাকে। এই ভ্যাকসিনটি চার ধরনের ভাইরাস থেকেই সুরক্ষা দেয়। রোগীর হাসপাতালে ভর্তির আশঙ্কা কমায়।
শেষ কথা
যতদিন না বাজারে সর্বজনীন ভ্যাকসিন আসছে, ততদিন সচেতনতাই আমাদের প্রধান হাতিয়ার। বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রেখে মশার বংশবৃদ্ধি রোধ করতে হবে এবং মশার কামড় থেকে নিজেদের রক্ষা করতে হবে। ডেঙ্গুর কোনো লক্ষণ দেখা দিলে অযথা আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা ও সচেতনতাই ডেঙ্গু এবং এর মারাত্মক জটিলতা থেকে আমাদের পুরোপুরি মুক্ত রাখতে পারে।
লিখেছেন: সুপ্রিয় নায়েক