অগ্নিভ ভৌমিক, ধুবুলিয়া: বাংলাদেশ থেকে ছিন্নমূল হয়ে ভারতে আসার পঞ্চাশ বছর পর ফের আর একবার ভিটে হারানোর ভয় তাড়া করছে প্রিয়দাসীকে।
অগ্নিভ ভৌমিক, ধুবুলিয়া: বাংলাদেশ থেকে ছিন্নমূল হয়ে ভারতে আসার পঞ্চাশ বছর পর ফের আর একবার ভিটে হারানোর ভয় তাড়া করছে প্রিয়দাসীকে।
পুরো নাম প্রিয়দাসী বিশ্বাস। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাক্ষী তিনি। বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতা অর্জনের সেই যুদ্ধ নিজের চোখে দেখেছেন। কিন্তু, পূর্ব পাকিস্তানের তকমা হারিয়ে সদ্য জন্মানো বাংলাদেশকে বেশিদিন দেখার সুযোগ হয়নি তাঁর। বাল্য বয়সেই স্বামীহারা হন। বাংলাদেশের নাগড়ায় শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে চলে আসেন ভারতে। বয়সের ভারে তারিখটা ঠিক মনে করতে পারেন না। শুধু মনে পড়ে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পরপরই চলে আসেন তিনি। থাকতে শুরু করেন কৃষ্ণনগর-২ ব্লকের সাধনপাড়া-২ পঞ্চায়েতের ধুবুলিয়া এক বাই চার এলাকায়। যাকে উদ্বাস্তু কলোনি বলে লোকে চেনে। সেই প্রিয়দাসী ফর্ম পাননি এসআইআরের। তার মানে নাম বাদ পড়ার প্রবল সম্ভাবনা। যদি এসআইআরের পর এনআরসি’র মতো কিছু হয়, তা হলে ভিটে ছাড়তে হবে তাঁকে। শেষজীবনে আতঙ্কের প্রহর গুণছেন তিনি।
ধুবুলিয়ায় আসার পর ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত প্রিয়দাসী নিয়মিত ভোট দিয়েছেন ভারতের প্রতিটি নির্বাচনে। তার পর ভোটার তালিকার সংশোধনীতে কোনওকারণে তাঁর নাম বাদ পড়ে। সেই থেকে আর নাম তুলতে পারেননি পঁচাত্তরের বৃদ্ধা। স্বাভাবিকভাবেই এসআইআরের ভিত্তিবর্ষ (২০০২)-এর তালিকায় প্রিয়দাসীর নাম নেই। পঁচিশের তালিকায় তো কোনওভাবেই থাকার কথা নয়! আবারও ভিটে ছাড়ার আতঙ্ক গ্রাস করেছে প্রিয়দাসীকে।
ভিটে বলতে জাতীয় সড়কের ধারে কয়েকটা ফুটিফাটা টিনের এক চিলতে ঘর। কোনওরকমে মাথা গুঁজে থাকেন প্রিয়দাসী। সামনে এক টুকরো জায়গা। সেখানে রান্না করেন। রেশনের চালই ভরসা। অর্থাৎ, তাঁর রেশনকার্ড রয়েছে। দেখিয়েছেন আধারকার্ড, ব্যাঙ্কের বইও। নেই শুধু গণতান্ত্রিক অধিকার। পড়শিরা বলছিলেন, ১৯৯৫ সালের ভোটার তালিকা সংশোধন হয়েছিল। তখনই কোনওকারণে বৃদ্ধার নাম বাদ পড়ে যায়। তারপর থেকে আর ভোটার তালিকায় নাম তুলতে পারেননি প্রিয়দাসী।
মাত্র আট বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল প্রিয়দাসীর বিয়ের চার বছরের মাথায় মারা যান স্বামী গুরুপদ বিশ্বাস। মাত্র ১২ বছর বয়সে বিধবা। আতান্তরে পড়ে ছোট্ট প্রিয়দাসী। এক গুরুর আশ্রয়ে থাকতে শুরু করেন। তাঁর কাছে দীক্ষাও নেন। মুক্তিযুদ্ধের পর ভাশুরের সঙ্গে দীক্ষাগুরুর এক শিষ্যের বাড়িতে এসে ওঠেন। কয়েকবছর পর সেই দীক্ষাগুরুও মারা যান। শিষ্যের বাড়ি থেকেও বেরিয়ে আসেন তিনি। নতুন দেশে ক্রমশ একা হয়ে পড়েন প্রিয়দাসী।
জীবনের সেই কঠিন সময়ের স্মৃতি এখনও অনেকটাই সতেজ। বৃদ্ধা বলছিলেন, ‘বাংলাদেশের নাগড়ায় স্বামীর বাড়িতে খুব একটা খারাপ ছিলাম না। যদিও ওই বয়সে স্বামীর ঘর কি জিনিস বুঝতাম না। এরমধ্যেই বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হল। মুজিবরকে হত্যা করা হল। উত্তাল হল গোটা দেশ। ভাশুর আমাকে সঙ্গে নিয়ে চলে এলেন এদেশে। তাঁরা আর কেউ বেঁচে নেই। এখন শুধু আমি আর আমার এই কুঁড়েঘর। সঙ্গে আধার, প্যান ও রেশন কার্ড। আমি আগে ভোট দিয়েছিলাম। তারপর তালিকা থেকে নাম কেটে দিয়েছে। আমি কোনও ফর্ম পাইনি। ফলে, আদৌ আর এখানে থাকতে পারব কি না, চিন্তায় পড়েছি।’
স্থানীয় বিজেপি নেতা তথা কৃষ্ণনগর সাংগঠনিক জেলার বিজেপির সহ সভাপতি রঞ্জন অধিকারী বলছিলেন, ‘প্রিয়দাসী আমাদের এলাকার বাসিন্দা। খুব কষ্ট করে থাকেন। অনেকবার চেষ্টা করা হয়েছিল ওঁর নামটা ভোটার তালিকায় তুলতে। কিন্তু, নাম তোলা যায়নি। তাই এসআইআরের ফর্মও পাননি তিনি।’
প্রিয়দাসীর বুকে ফের ভিটে ছাড়ার যন্ত্রণা!