কাজলকান্তি কর্মকার, ঘাটাল: পয়লা বৈশাখে দেবী বিশালাক্ষীকে পুজো দিয়ে নতুন বছর শুরু করেন ঘাটাল মহকুমা ও তার আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা। ঘাটালের এই প্রাচীন মন্দিরের সঙ্গে ইতিহাসের এক ধূসর অধ্যায় জড়িয়ে রয়েছে। ঘাটালের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক নিদর্শনের মধ্যে অন্যতম শোভা সিংহের কীর্তি ওই বিশালাক্ষী মন্দির।
ঘাটাল শহর থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে পূর্বদিকে রয়েছে ‘বরদা অঞ্চল’ বা অধুনা অজবনগর পঞ্চায়েত। এই এলাকাতেই শোভা সিংহ বিশাল গড় স্থাপন করেছিলেন। সেই গড়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবী বিশালাক্ষী, যিনি স্থানীয়দের কাছে ‘বাঁশুরি’ নামে পরিচিত। ঘাটাল-চন্দ্রকোণা রাস্তার ধারে বাহির গড়ে এই মন্দির অবস্থিত। জনশ্রুতি অনুসারে, দলপতি সিংহের পতনের পর শোভা সিংহ এই গড় দখল করেন।
মন্দিরের এক পুরোহিত জয়ন্ত বটব্যাল বলেন, প্রতিবছর পয়লা বৈশাখ, অক্ষয় তৃতীয়া, বুদ্ধপূর্ণিমায় অনেক মানুষ হালখাতার পুজো করতে আসেন। এছাড়া, দুর্গাপুজোর সময় এই মন্দিরে ঘটা করে দেবী বিশালাক্ষীর আরাধনা হয়। পৌষ সংক্রান্তিতে মেলা বসে।
মন্দিরের ইতিহাস অনুযায়ী, একটি পুকুর থেকে দেবীর স্বর্ণমূর্তি পাওয়া গিয়েছিল। এরপর রাজার স্বপ্নাদেশে মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে রাজপুরোহিত ক্ষমানন্দ বটব্যাল দেবীর মৃন্ময়ী মূর্তি স্থাপন করেন। দেবীর হাতে ধানের শিষ থাকায়, তাঁকে লক্ষ্মীরূপে পূজা করা হয়। বিশাল চোখ থাকায় তাঁর নাম বিশালাক্ষী। প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় পুজো ও আরতি হয়। পান ও দোক্তা দেবীর প্রিয় নৈবেদ্য। দুর্গাপুজো, কালীপুজো, জগদ্ধাত্রী পুজো ও পৌষ সংক্রান্তিতে এখানে বিশেষ পুজো হয়।
ইতিহাস অনুযায়ী, শোভা সিংহের কন্যা চন্দ্রপ্রভার সঙ্গে বিষ্ণুপুরের রাজা রঘুনাথ সিংহের বিবাহ হয়। যৌতুক হিসেবে চন্দ্রপ্রভা সোনার বিশালাক্ষী মূর্তিটি পান। চন্দ্রপ্রভার সঙ্গে বিষ্ণুপুর যান লালবাঈ, যিনি ছিলেন শোভা সিংহের সহযোগী ওড়িশার আফগান সর্দার রহিম খানের কন্যা। রঘুনাথ সিংহ লালবাঈয়ের রূপে মুগ্ধ হন। চন্দ্রপ্রভার নিষেধ সত্ত্বেও তিনি লালবাঈয়ের জন্য লালবাগ নামে একটি প্রাসাদ ও উদ্যান তৈরি করেন। রাজ্যে অনাবৃষ্টি হলেও নাকি রঘুনাথ সিংহের রাজধর্মে মন ছিল না। কথিত আছে, তিনি লালবাঈকে বিয়ে করেছিলেন। তাঁদের একটি পুত্রসন্তান ছিল। লালবাঈ তাঁর পুত্রকে সিংহাসনে বসানোর স্বপ্ন দেখতেন। লালবাঈয়ের প্রভাবে রঘুনাথ সিংহ প্রজাদের ধর্মান্তরিত হতে আদেশ দেন বলেও কথিত আছে।অবশেষে, চন্দ্রপ্রভা স্বামীর এই কাজের প্রতিশোধ নেন। নতুন মহলের ভোজনালয়ে তিনি বিষমাখানো তীর ছুঁড়ে রঘুনাথ সিংহকে হত্যা করেন। পরে স্বামীর চিতায় সতী হন। এরপর প্রজারা লালবাঈকে হত্যা করে। এঘটনার পরই নাকি বরদায় ঘটা করে দেবী বিশালাক্ষীর সন্ধ্যারতি শুরু হয়।-নিজস্ব চিত্র