নিজস্ব প্রতিনিধি, ঝাড়গ্ৰাম: বেলপাহাড়ীর উচ্চতম পাহাড় কানাইসর। জঙ্গলমহলের মানুষের কাছে তিনি পাহাড় দেব। অরণ্য ও পাহাড় উপত্যকার মানুষের তিনি রক্ষাকর্তা। আষাঢ় মাসে ধুমধাম করে কানাইসর পাহাড়ের পুজো হয়। পাহাড়ের পাদদেশে মেলা বসে। শনিবার পুজো উপলক্ষ্যে ঝাড়খণ্ড, ওড়িশার পাশাপাশি পুরুলিয়া, বাঁকুড়া জেলার বহু মানুষ এখানে ভিড় জমান। প্রথা ও রীতি মেনে ভক্তরা পাহাড় থানে পুজো দেন।
ঝাড়গ্রামের বেলপাহাড়ী ও ঝাড়খণ্ডের মধ্যবর্তী এলাকায় এই পাহাড়টি রয়েছে। কানাইসর পাহাড়ের একাংশ বেলপাহাড়ীর সন্দাপাড়া পঞ্চায়েতের মধুপুর মৌজায় রয়েছে। বাকি অংশ ঝাড়খণ্ডের চাকুলিয়া ব্লকের মধ্যে পড়ে। পাহাড়ের উপরের স্থান সমতল। ভক্তরা পাহাড়ে উঠে পরম্পরা মেনে পুজো দেন। পুজো কমিটিতে রয়েছেন ঝাড়গ্রামের শিলদা, মুনিয়াদা, মধুপুর, ডুমুরিয়া এবং ঝাড়খণ্ডের বেহারপুর, শিলাখুনি, দুয়ারিশোল গ্ৰামের বাসিন্দারা। প্রতিবারের মতো এবারও উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে পুজোর আয়োজন করা হয়েছে। কানাইসর পাহাড় পুজোর পর আগামী ১৯ জুলাই শিলদার বুরুবঙা ও ২৬ জুলাই বেলপাহাড়ীর হাতিমারা পাহাড়ের পুজো হবে। প্রাচীনকাল থেকে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রকৃতিকে তুষ্ট করতে পাহাড়পুজো করে আসছেন। পুজোর মধ্যে দিয়ে বর্ষা ঋতুতে বৃষ্টির আহ্বান করা হয়। যাতে আমন ধান চাষ করা সহজ হয়। এছাড়াও, বহু মানুষ নিজেদের মনস্কামনা পূরণে মানত করেন। পাহাড় থানে আম, জাম, কাঁঠাল নিবেদন করা হয়। প্রথা মেনে হাঁস, মুরগি, ছাগ বলির রীতিও রয়েছে। কানাইসর পাহাড় ঘিরে স্থানীয় মানুষের মাঝে নানা লোকশ্রুতি ছড়িয়ে রয়েছে। কানাই হলেন স্বয়ং শিব এবং সর হলেন দেবী দুর্গা। এই পাহাড় দেবদেবীর আবাসস্থল। এলাকার মানুষ বিশ্বাস করেন, কানাই শবর নামে স্থানীয় এক দেহরি(পূজারি) পাহাড় পুজো করতেন। তাঁর নাম অনুসারেই এই পাহাড়ের নাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। নানা কারণে পুজোর দায়িত্ব পরবর্তীতে শবরদের কাছ থেকে মাল সম্প্রদায়ের হাতে চলে যায়।
পুজো কমিটির সদস্য সহদেব নায়েক বলেন, প্রথা ও রীতি মেনে প্রতিবারের মতো এবারও পাহাড় থানে পুজো হয়েছে। মেলার আয়োজন করা হয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা পুজো দিতে এসেছেন। রক্ষাকর্তা পাহাড়দেব পুজোয় সন্তুষ্ট হন, এটাই আমাদের প্রার্থনা। বেলপাহাড়ী এলাকার বাসিন্দা কুনামি মাণ্ডি বলেন, প্রতিবার এখানে পুজো দিতে আসি। এবছরও পুজো দিয়েছে। পাহাড়দেব নিশ্চয়ই আমার মনস্কামনা পূরণ করবেন। পূর্ব মেদিনীপুর জেলার মেচেদার বাসিন্দা চাণক্য চট্টোপাধ্যায় বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়পুজো দেখার ইচ্ছে ছিল। বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে এসেছিলাম। সীমানা মধ্যবর্তী স্থানে পাহাড় পুজো হওয়ায় পুজোস্থলটিকে চিহ্নিত করতে পারিনি। ঝাড়খণ্ডের দিকে চলে যাই। পরে বেলপাহাড়ীর দিকে আসতে হয়। দুই রাজ্যের বহু পর্যটক এদিন এই সমস্যায় পড়েন। পর্যটকদের স্বার্থে দুই রাজ্যের প্রশাসনের বিষয়টি দেখা দরকার। বারাকপুরের বাসিন্দা স্বাগতা ভট্টাচার্য বলেন, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এখানে পাহাড় পুজো দেখতে এসেছিলাম। আমাদের রাজ্যে এমন একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে, তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন হতো।