সাধারণ বাঙালির কাছে দুর্গাপুজো একটা বড় ব্যাপার। শারদ উৎসব ঘিরেই পাক খায় তার জীবন। সেই পাক খাওয়া জীবনে ঘোরতরভাবে ঢুকে পড়েছে আর এক ‘পাক খাওয়ানো’ জিনিস, যার নাম ‘রিল’। ইংরেজি শব্দ, বহুবচনে ‘রিলস’। নামটি কে রেখেছিলেন জানি না, কিন্তু যিনিই রাখুন, মোক্ষম রেখেছিলেন। আমাদের অনেকের জীবনযাপন আজ মুহুর্মুহু পাক খায় রিলকে কেন্দ্র করে। সে এমন পাক খাওয়া যে তার থেকে অব্যাহতি পাওয়া শুধু মুশকিল নয়, প্রায় না মুমকিন! রিলের প্যাঁচে পেঁচিয়ে শুধু বাঙালি গিয়েছে, একথা বললে ভুল হবে, গোটা বিশ্বের
বিরাট সংখ্যক মানুষ আজ মুঠোফোন-স্থিত রিলে মুগ্ধ।
যে কোনও সাধারণ, অসাধারণ, মনোগ্রাহী অথবা চটকদার ঘটনা বা বিষয়কে আকর্ষক ভিডিওতে সাজিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় টুক করে পরিবেশন করে ফেলাটাই হল ‘রিল কালচার’। এহেন ঘটনা অবশ্য সামাজিক মাধ্যমের জন্মলগ্ন থেকেই ঘটে চলেছে, তবে রিল সংস্কৃতির নতুনত্ব তার পরিবেশনার চমকে। রয়েবসে গল্প শোনানো বা ছবি দেখানোতে বিশ্বাসী নয় রিল। দক্ষতার সঙ্গে দ্রুত গতিতে যা দেখানোর, যা শোনানোর তা সেরে ফেলতে হবে আধ মিনিট থেকে বড়জোর এক মিনিটে।
মানুষের মনোযোগের গ্রাফ নাকি নিম্নাভিমুখী হতে হতে এখন ওই আধ মিনিটেই এসে ঠেকেছে। যা বলতে চাও তা তিরিশ সেকেন্ডের মধ্যে ধাঁ করে বলে দিতে পারো ভালো, নইলে তোমার ‘টার্গেট অডিয়েন্স’ টুক করে চলে যাবে পরের রিলে। স্বল্পসময়ে তথ্য পরিবেশনের কৌশল আজ রিলের চেহারা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। মানুষের হাতে সময় ও ধৈর্য কমছে বলেই আজ রিল কালচারের এই রমরমা। এই নিয়ে তর্ক জমতেই পারে।
গত শতাব্দীর পাঁচ, ছয় বা সাতের দশকে যাদের জন্ম তাদের মতো ‘অভিজ্ঞ’ প্রজন্ম দ্বিতীয়টি নেই। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে একের পর এক পরিবর্তনের ঢেউ পৃথিবীতে আছড়ে পড়তে দেখেছে তারা। প্রযুক্তির শেষতম যে ফসলটি আজ ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলের হাতে হাতে ঘোরে, সেই সেলফোনের তিরিশ বছর বয়সকালের মধ্যেও পরিবর্তনের কত না সুনামি। একদা শুধুমাত্র কথা বলার যন্ত্রটি আজ জীবনযাপনের প্রতিটি অধ্যায় জুড়ে আছে। আমাদের জীবনযাপনের ‘ট্রেন্ড সেটার’ও অনেকখানি আজ সে-ই। আর সেই ট্রেন্ড সেটিংয়ে এই মুহূর্তে বড় ভূমিকা রিলের।
পুজোর বাজার একটা সময় বঙ্গজীবনে ছিল বহু প্রতীক্ষিত বিলাস। সে বিলাস এখনও রয়েছে, হয়তো আরও বেড়েছে; কিন্তু তার জন্য পায়ে ধুলো লাগিয়ে বাজার-কর্ষণ আজ না করলেও চলে। জামা-জুতো-গয়নাগাটি সহ পুজো-উপহারের বিস্তৃত বিজ্ঞাপনের পসরা সাজিয়ে মোবাইলে রয়েছে অসংখ্য রিল। শুধু বেছে নেওয়ার অপেক্ষা। গ্রাহকের সামনে নিজের পণ্য মেলে ধরার এমন সহজ, কার্যকরী আর সুলভ উপায় আগে কখনও ছিল না। বাজারের বিস্তৃতিও অভাবনীয়, একেবারে গ্লোবাল। মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার আর ব্যবসায়ীদের বুঝে নিতে দেরি হয়নি, মার্কেটিং-এর কাজে রিলস-এর অপার সম্ভাবনার বিষয়টা। শর্ত একটাই, সামাজিক মাধ্যমকে ব্যবহারের কায়দাটি জানতে হবে।
পুজোর সময় কোন ঠাকুর দেখবেন বা দেখবেন না, কাদের প্যান্ডেল আলোকসজ্জা এবার দুর্ধর্ষ, কোন থিম ফাটিয়ে দিচ্ছে, এসব জানিয়ে দেওয়ার জন্যও এখন প্রতি বছর তৈরি হয় হাজারে হাজারে রিল। এ চর্চা টিভির পর্দাতেও কম হয় না, বয়স্করা দেখেন সেসব। জেনারেশন জেড কিন্তু চোখ রাখে সোশ্যাল মিডিয়াতেই, আর নিজেদের পুজো হপিং প্ল্যান ঠিক করে রিলস স্টাডি করেই।
যে রিলের ভাগ্য ক্লিক করে যায়, ভাইরাল হয় সে একদিনে। ড্রোন ক্যামেরায় জমিয়ে তোলা রিল ভাইরাল হয়ে গিয়ে কত অজানা অনামী পুজোকেও যে করে তোলে সুপারস্টার! রিলের পরিক্রমণ যেহেতু বিশ্বজোড়া তাই বিদেশবাসী বঙ্গসন্তানদের নস্টালজিয়ার তৃষ্ণা মেটাতেও এ জিনিস অদ্বিতীয়। সত্যি বলতে, বিদেশিদের নজরও কিছু কম কাড়ে না এসব রিল। ফলে বঙ্গসংস্কৃতির বিশ্বায়নও ঘটে বইকি। আবার এ দেশের গ্রামগঞ্জে বসেও মানুষ দিব্যি সুন্দর মোবাইল স্ক্রিনেই দেখে ফেলে নিউ ইয়র্কের টাইম স্কোয়ার কিংবা আবু ধাবিতে হওয়া পুজোর ছবি।
পুজোর সাজ, খাওয়াদাওয়া, বেড়ানো-কোথায় নেই রিলের প্রভাব? সাজগোজ কেমন হবে সে ট্রেন্ড পুজোর বহু আগে থাকতে রিলই ঠিক করে দেয়। ক্রেতার নজর কাড়তে, রেস্তরাঁ থেকে ক্লাউড কিচেন, সকলেই মাঠে নেমে পড়ে রিলের হাত ধরে। ভ্রমণের এমন চমৎকার সব রিল তৈরি হয়, যা না দেখে
মানুষ এখন পুজোর ছুটির ভ্রমণসূচি তৈরিই করে না। ফিরে এসে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে কি না বা কতটা হয়েছে সেকথাটা অবশ্য তেমন জানা যায় না, যদি না বাজারে ছাড়া হয় প্রতিযোগিতামূলক পাল্টা রিল। মোট কথা, ক্যামেরা ব্যবহারের কুশলতা আর সৃজনশীলতা আজ অতি সাধারণ জিনিসকেও পৌঁছে দেয় অসাধারণ উচ্চতায়।
বারোয়ারি দুর্গোৎসবে সাধারণত ধর্মাচারণের থেকে উৎসবের অংশটাই প্রাধান্য পেয়ে এসেছে। দৈনন্দিনতার থেকে মুক্তি আর আত্মীয়-বন্ধু-স্বজনদের সঙ্গলাভের আশা নিয়েই মানুষ তাকিয়ে থাকে উৎসবের দিকে। কিন্তু এই শতাব্দীতে পৌঁছে উৎসবের সেই মূল সুর যেন একটু আধুনিক হয়ে গিয়েছে। আজ সর্বত্র শুধু মনমাতানো মনভোলানো ছবি। ভার্চুয়াল জগতেই বেঁচে থাকা। দিনের পর দিন মোবাইলে চেয়ে চেয়ে দেখে চলি আমরা। সমাজমাধ্যম থেকেই জীবনের রসদ পাচ্ছি আমরা। মানসিক আরামও কোথাও লুকিয়ে আছে এখানেই। ভালো রিলের সঙ্গে ‘ডোপামিন’ নামের ফিলগুড হরমোনটির নিঃসরণও সম্পর্কযুক্ত। অফিস ফেরত মানুষের সারাদিনের স্ট্রেস, বসের কটূক্তি, সহকর্মীর ঈর্ষা, বাড়িতে দৈনিক কাজের ক্লান্তি ভুলতে রিল হয়ে ওঠে উপশমের সমান।
উৎসবের মরশুমে শুধু মণ্ডপ ও প্রতিমা দেখানোই নয়, রিল করিয়েরা নিখুঁতভাবে খুঁজে বের করেন এমন সব অ্যাঙ্গেল, যেখান থেকে গোটা দৃশ্যকেই অসাধারণ একটা ফ্রেমে এনে ফেলা যায়। শুধু জেন জি নয়, আট থেকে আশি সকলেই থাকেন দর্শক হিসেবে।
রিলের সঙ্গেই মিশে থাকে নস্টালজিয়া। আধুনিক রিল দেখতে দেখতে চোখের সামনে ভেসে ওঠে ফেলে আসা পুরনো কোনও ছবি। যে ছবি মনে করিয়ে দেয়, ছোটবেলার উৎসবকে। মনে হয়, যন্ত্রের শুধু যন্ত্রণা নেই, উপকারও আছে। আহা শৈশবের সেসব দিন যদি আমরাও ধরে রাখতে পারতাম রিলে!