অগ্নিভ ভৌমিক, কৃষ্ণনগর: ‘অতীতে নদীয়া জেলা শুধু রাজনীতিই দেখেছে। জেলার সামগ্রিক বিকাশে কেউ ফিরেও তাকাত না ।’ বৃহস্পতিবার কৃষ্ণনগর গভর্নমেন্ট কলেজের মাঠে রাজনৈতিক জনসভার মঞ্চে জেলা সহ গোটা বাংলার উন্নয়নকেই প্রাধান্য দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপধ্যায়। আর এই উন্নয়নই যে বিধানসভার ভোট-যুদ্ধে তৃণমূলের মোক্ষম অস্ত্র, সেটাও স্পষ্ট করে দিলেন তিনি। জানিয়ে রাখতে ভুললেন না কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বাংলার প্রতি বঞ্চনার কথাও। বললেন, ‘গত পাঁচ বছরে এক লক্ষ ৮৭ হাজার কোটি টাকা আমরা পাই কেন্দ্রের কাছ থেকে। কিন্তু কেন্দ্র সরকার বাংলাকে বঞ্চনা ও লাঞ্ছনা করেছে।’
নদীয়া জেলা মতুয়া সম্প্রদায় অধ্যুষিত বলে পরিচিত। বাম আমলে তাঁদের নিয়ে শুধু রাজনীতি হয়েছে। এমনই অভিযোগ ওঠে মাঝে মধ্যে। বিজেপিও বাংলায় ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন নিয়ে মতুয়াদের দাবার বোর্ডে তুলছে বলেও অভিযোগ। এদিন, মমতা সেই রাজনীতির ধারেকাছে না গিয়ে বার্তা দিলেন স্রেফ উন্নয়নের। একই সঙ্গে জেলাবাসীকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন অতীত এবং বর্তমানের পার্থক্যকে। যা শুনে রাজনৈতিক মহল মনে করছে, মুখ্যমন্ত্রী ঐতিহাসিক শহর কৃষ্ণনগরে এসে এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চেয়েছেন। তাই তিনি তাঁর বক্তব্যে আগাগোড়াই প্রাধান্য দিয়েছেন উন্নয়ন আর উন্নয়নকেই।
এদিন মুখ্যমন্ত্রী প্রথমে গাবতলা ময়দানে রাজ্যজুড়ে পথশ্রী-৪ প্রকল্পের সূচনা করেন। তারপর কৃষ্ণনগরের জনসভায় যোগ দেন। মঞ্চে ওঠার আগে মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষদের সঙ্গে পা মেলাতেও দেখা যায় তাঁকে। বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি জানান, ২০ হাজার কিলোমিটার নতুন রাস্তার কাজ শুরু হচ্ছে বাংলাজুড়ে। আগে অবশ্য ৩৯ হাজার কিলোমিটার রাস্তা তৈরি হয়েছে। সবমিলিয়ে কেন্দ্রের বঞ্চনার মধ্যেও এক কোটি এক লক্ষ ৮৩ হাজার কিলোমিটার রাস্তা তৈরি কথাও তুলে ধরেন তিনি। এরপরই নদীয়া জেলার উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা আসার পর নদীয়া জেলায় ৯৫টি প্রকল্প তৈরি করেছি। কল্যাণীতে তিনটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক করেছি। যার মধ্যে রয়েছে কল্যাণী ইনট্রিগেটেড টেক্সটাইল পার্ক, কল্যাণী ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল পার্ক, হরিণঘাটা ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল পার্ক। ১৫টি এমএসএমই ক্লাস্টার, তিনটি আইটি পার্ক—একটি কৃষ্ণনগরে এবং দু’টি কল্যাণীতে গড়ে তোলা হয়েছে। ২৯টি কর্মতীর্থ করা হয়েছে।’
নদীয়া জেলা যে বাংলার ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতির গৌরবভূমি সেটা মনে করিয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ঘূর্ণির মাটির পুতুল, শান্তিপুরের তাঁত, কাঁসা-পিতল শিল্প, কৃষ্ণনগরের সরপুরিয়া-সরভাজার খ্যাতি বিশ্বজোড়া। যা বাংলার অহংকার। কৃষ্ণনগরে হয়েছে মসলিন তীর্থ। যখন প্রথম আমি ক্ষমতায় আসি তখন দেখি, মাত্র ছ’জন মসলিন তীর্থে কাজ করেন। ছ’জনকে ট্রেনিং দিয়ে ছ’শো জনকে তৈরি করেছি। তাঁরা আজকে মসলিন তৈরি করেন। ফুলিয়ায় চালু হয়েছে হ্যান্ডলুম টেকনোলজি। কৃষ্ণনগরের সরপুরিয়া এবং সরভাজাকে সারা বিশ্বে পৌঁছে দিতে সরতীর্থ তৈরি করেছি।’ মমতার উন্নয়ন-খতিয়ানে ঠাঁই পেয়েছে রাজ্য সরকারের সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলিও। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, ঐক্যশ্রী, সবুজসাথী প্রকল্প সহ রাজ্য সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের কথা তুলে ধরেন তিনি। জেলার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘১০ হাজার করবস্থান তৈরি করা হয়েছে এবং ওবিসি রিজার্ভেশন করা হয়েছে। ওয়াকফ প্রপার্টি তার নিজস্ব আইন অনুযায়ী চলবে। কেউ তা দখল করতে পারবে না। যেমন, আদিবাসী সম্পত্তি কেউ দখল করতে পারে না। এটা আইনেই আছে।’
এদিকে, মুখ্যমন্ত্রীর জনসভার মঞ্চে দেখা যায়নি পলাশিপাড়ার বিধায়ক মানিক ভট্টাচার্যকে। তা নিয়েও জলঘোলা হয় রাজনৈতিক মহলে। পরে জানা যায়, মানিকবাবু জনসভায় যোগ দিতে বেরিয়েছিলেন। পথে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁকে বেথুয়াডহরি হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। -নিজস্ব চিত্র