সোমনাথ বসু, কলকাতা: শনিবার বিকেল থেকেই শহরের সব রাস্তা মিশেছে যুবভারতীতে। গাড়ি, বাইক, ম্যাটাডোর কিংবা মিনিডোরে সবুজ-মেরুন পতাকা উড়ল স্পর্ধার সঙ্গে। শতাব্দীপ্রাচীন ক্লাবটির অনুরাগীদের স্লোগান, ‘চিরকাল রেলায় আছে, থাকবে মোহন বাগান’ কাঁপাল ইস্টার্ন মেট্রোপলিটন বাইপাস। আট থেকে আশি— প্রায় প্রত্যেকের সঙ্গেই মিশে রয়েছে সবুজ ও মেরুন রং। কারও গায়ে প্রিয় ক্লাবের জার্সি। কেউ বা গাল রাঙিয়েছেন পরিচিত দুই রঙে। ঘরের মাঠ যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ডাবলের স্বাদ পাওয়াই যে তাঁদের লক্ষ্য। মনের কোণে আশঙ্কা যে একেবারেই ছিল না তা নয়। এর আগে যে ঘরের মাঠে কোনও দলই আইএসএল ফাইনাল জিততে পারেনি।
যাবতীয় পরিসংখ্যানকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে চলতি মরশুমে মহার্ঘ ডাবল জিতল মোলিনার দল। পিছিয়ে পড়ে মোহন বাগানের এই কামব্যাকের একটাই রিংটোন, ‘এভাবেও ফিরে আসা যায়!’ প্রথমার্ধে সাদামাটা ফুটবল, বিরতির পরেই আত্মঘাতী গোল হজম। কিন্তু এই মোহন বাগান যে হারার আগে হারতে জানে না। তাই পেনাল্টি থেকে কামিংসের গোলের পর আর পিছন ফিরে তাকায়নি পালতোলা নৌকা। এরপর ম্যাকলারেনের লক্ষ্যভেদ লক্ষ লক্ষ সবুজ-মেরুন অনুরাগীদের মুখে হাসি ফোটায়।
আইএসএল ফাইনালে মোহন বাগানের প্রথম একাদশে কোনও চমক ছিল না। পরিচিত ৪-২-৩-১ ফর্মেশনেই দল সাজিয়েছিলেন কোচ হোসে মোলিনা। পক্ষান্তরে, বেঙ্গালুরুর প্রশিক্ষক জারাগোজা ভরসা রাখেন ৪-৩-৩ ফর্মেশনে। প্রারম্ভিক পর্বে মোহন বাগান বেশ কয়েকটি আক্রমণ শানালেও তা লিড নেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল না। ২০ মিনিটের পর ম্যাচে ক্রমশ জাঁকিয়ে বসে বাগিচা শহরের ফ্র্যাঞ্চাইজিটি। নোগুয়েরা-উইলিয়ামসদের সঙ্গে এডগার মেন্ডেজদের বুদ্ধিদীপ্ত বোঝাপড়া বারবার বিপদে ফেলে টম আলড্রেড-শুভাশিসদের। আসলে, মোহন বাগানের দুই ডিফেন্সিভ মিডিও অনিরুদ্ধ থাপা এবং আপুইয়া নিষ্প্রভ থাকায় সুবিধা হয় জারাগোজা-ব্রিগেডের। আপফ্রন্টে ম্যাকলারেন-কামিংসরা পর্যাপ্ত বলের জোগান পাননি। এই পর্বে দুই উইংয়ে মনবীর, লিস্টনও তেমনভাবে ডানা মেলতে ব্যর্থ। অনেকের মতে, গ্রেগ স্টুয়ার্টের অভাব অনুভূত হয়েছে।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই আলবার্তো রডরিগেজের আত্মঘাতী গোলে পিছিয়ে পড়ে মোলিনা-ব্রিগেড। ডানদিক থেকে উইলিয়ামসের নিরীহ সেন্টার ক্লিয়ার করতে গিয়ে নিজের জালেই বল জড়ান স্প্যানিশ ডিফেন্ডার (১-০)। এরপর বাধ্য হয়ে জোড়া বদল আনেন সবুজ-মেরুন কোচ। অনিরুদ্ধ ও লিস্টনকে তুলে তিনি নামান আশিক কুরুনিয়ান এবং সাহাল আব্দুল সামাদকে। ৭০ মিনিটে পরিকল্পিত আক্রমণ থেকে পেনাল্টি আদায় করে মোহন বাগান। বাঁ দিক থেকে নেওয়া কামিংসের সেন্টারে ম্যাকলারেনের পুশ চিংলেনসানার হাতে লাগে। সঙ্গত কারণেই স্পটকিকের নির্দেশ দেন রেফারি। বাঁ পায়ের মাপা শটে দলকে সমতায় ফেরাতে ভুল হয়নি কামিংসের (১-১)। বিএফসি গোলরক্ষক গুরপ্রীত সিং সান্ধু শরীর ছুড়েও বলের নাগাল পাননি। এরপর যুবভারতীতে বেঙ্গালুরুকে চেপে ধরে মোহন বাগান। ৮১ মিনিটে কামিংসের বদলে স্টুয়ার্ট নামার পর পালতোলা নৌকার গতি আরও বাড়ে। এই পর্বে আশিক কুরুনিয়ানের শট বাঁচান গুরপ্রীত। ম্যাচের শেষলগ্নে স্টুয়ার্টের পাস ম্যাকলারেন ধরতে পারলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ম্যাচে ইতি পড়ত।
অতিরিক্ত সময়ের প্রথম পর্বে দ্বিতীয় গোল তুলে নেয় মোহন বাগান। স্টুয়ার্টের পাস ক্লিয়ার করতে পারেননি চিংলেনসানা। বক্সের মধ্যে শিকারি বেড়ালের মতো ওত পেতে থাকা ম্যাকলারেন বল পেয়েই ডান পায়ের কোনাকুনি শটে হার মানান গুরপ্রীতকে (২-১)। এর আগে অবশ্য আলবার্তোর ক্লিয়ারেন্স কোনওরকমে বাঁচান বিশাল কাইথ। এরপর পেশিতে চোট পাওয়ায় ম্যাকলারেনের পরিবর্তে মাঠে নামানো হয় পেত্রাতোসকে। অন্তিম পর্বে রক্ষণ অটুট রেখে শেষ হাসি হাসে মোহন বাগান। আরেকটা কথা না বললেই নয়। চালশে সুনীলকে ১২০ মিনিট মাঠে রেখে ম্যাচ যে জেতা যায় না, তা এবার নিশ্চয়ই বুঝবেন কোচ জারাগোজা। রেফারি শেষ বাঁশি বাজানোর আগেই মোবাইল ফোনের টর্চের আলোয় আলোকিত গ্যালারি। এই ডাবলের স্বাদ সত্যিই একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার মতো।
মোহন বাগান: কাইথ, আশিস, আলড্রেড, রডরিগেজ, শুভাশিস (দীপক), অনিরুদ্ধ (সাহাল), আপুইয়া, মনবীর, লিস্টন (আশিক), কামিংস (স্টুয়ার্ট) ও ম্যাকলারেন (পেত্রাতোস)।
বেঙ্গালুরু: গুরপ্রীত, ভুটিয়া (ফানাই), চিংলেনসানা, রাহুল, রোশন (ভেঙ্কটেশ), কাপো, নোগুয়েরা, কাপো, সুরেশ (সালাহ), রায়ান (শিবাশক্তি), মেন্ডেজ (পেরেরা ডিয়াজ) ও সুনীল।



