নিজস্ব প্রতিনিধি, তমলুক: ক্যান্সার ও চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে দিনরাত লড়াই করেও উচ্চমাধ্যমিকে ৪৫২নম্বর পেয়েছেন তমলুকের শুভদীপ ভুঁইয়া। ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়ায় বুকের তিনটি হাড় চিকিৎসকরা কেটে বাদ দিয়েছেন। এখনও নিয়মিত চেকআপের মধ্যে রয়েছেন। পারিবারিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে সমুদ্রবিজ্ঞানী হয়ে পরিবারের অভাব দূর করতে চান তিনি।
তমলুক ব্লকের কেলোমাল সন্তোষিণী হাইস্কুলের ফার্স্ট বয় ছিলেন শুভদীপ। ওই ব্লকের বিষ্ণুবাড়-২ পঞ্চায়েতের বনমালী কালুয়া গ্রামে থাকেন। টালির ছাউনি দেওয়া আবাস যোজনার বাড়িই মাথা গোঁজার ঠাঁই। শুভদীপের বাবা রাধাকান্ত ভুঁইয়া কোলাঘাটে জাতীয় সড়কের ধারে একটি ধাবায় কাজ করেন। মাসে সাড়ে তিনহাজার টাকা পারিশ্রমিক পান। শুভদীপের মা মণিকা ভুঁইয়া গৃহবধূ। বাড়িতে এক বোন রয়েছে। রাধাকান্তবাবুর সামান্য রোজগারে টেনেটুনে সংসার চলে। ২০২০-’২১সালে করোনা সঙ্কট চলাকালীন শুভদীপ মারণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে নুন আনতে পান্তা ফুরনো সংসারে আকাশ ভেঙে পড়ে। কীভাবে ছেলেকে বাঁচাবেন-তা ভেবে পরিবারের সদস্যরা ভেঙে পড়েছিলেন। অবশেষে স্কুল ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতায় কলকাতার একটি হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু হয়। সেখানে শুভদীপের বুকের তিনটি হাড় কেটে বাদ দেওয়া হয়। ওই অস্ত্রোপচারের জেরে তাঁর বুকের বাঁদিকটা এবড়োখেবড়ো হয়ে গিয়েছে।
২০২৩সালে মাধ্যমিকে স্কুলে প্রথম হয়েছিলেন শুভদীপ। সেবার ৬৩৬নম্বর পেয়েছিলেন। যা গড়ে ৯০.৬৫শতাংশ। এবার উচ্চমাধ্যমিকেও স্কুলে সর্বোচ্চ ৯০.৪ শতাংশ নম্বর পেয়েছেন। অঙ্ক, পদার্থবিদ্যা ও রসায়নে ৯০শতাংশের বেশি নম্বর পেয়েছেন।
এই কৃতী পড়ুয়ার জন্য বার্ষিক স্কলারশিপের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল স্কুল কর্তৃপক্ষ। ব্রজেন্দ্রনাথ মেমোরিয়াল ট্রাস্ট স্কলারশিপ বাবদ বছরে ১৬হাজার টাকা পেতেন শুভদীপ। প্রতি তিনমাস অন্তর চারহাজার টাকা মিলত। কিন্তু এবার কলেজে পা রাখতে চলেছেন। তাই ওই স্কলারশিপ আর পাবেন না। বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত স্কুল কর্তৃপক্ষও। কেলোমাল সন্তোষিণী হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মৃণ্ময় মাজি বলেন, শুভদীপ ভুঁইয়া স্কুলের অন্য পড়ুয়াদের কাছে অনুপ্রেরণা। দারিদ্র্য ও ক্যান্সারের জোড়া বাধার সঙ্গে লড়াই করে শুভদীপ সাফল্য অর্জন করেছে। আমরা সাধ্যমতো ওর পাশে থেকেছি। ভবিষ্যতে ওর পড়াশোনার খরচ আরও বাড়বে। কোনও সহৃদয় ব্যক্তি কিংবা সংস্থা পাশে দাঁড়ালে খুব ভালো হয়।শুভদীপ বলেন, আমি মেরিন সায়েন্স নিয়ে পড়তে চাই। আপাতত পাঁশকুড়া বনমালী কলেজ থেকে ফর্ম তুলেছি। স্কুলের শিক্ষকরা পাশে দাঁড়ানোয় লড়াইটা অনেক সহজ হয়েছিল। রাধাকান্তবাবু বলেন, কোলাঘাটে একটি ধাবায় কাজ করে সামান্য আয় করি। তা দিয়ে কোনওরকমে সংসার চলে। ছেলের চিকিৎসা ও পড়াশোনা নিয়ে চিন্তায় আছি। জানি না, শেষমেশ ভাগ্যে কী আছে! শুভদীপ ভুঁইয়া