নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি ও কলকাতা: হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, বাংলায় ১০০ দিনের কাজ ফের শুরু করতে হবে ১ আগস্ট। আদালতের রায় শুনে বাংলার আপামর জনসাধারণ মনে করেছিল, এবার বঞ্চনার দিন শেষ হল। কিন্তু দিন যতই এগিয়ে আসছে, সেই আশাও ধীরে ধীরে ক্ষীণ হচ্ছে। কারণ, একদিকে ১ আগস্ট ১০০ দিনের কাজ শুরু বা প্রাপ্য মেটানো নিয়ে এখনও উচ্চবাচ্য নেই কেন্দ্রের। অন্যদিকে, প্রাপ্তির তালিকা থেকেই পশ্চিমবঙ্গের নাম স্রেফ বাদ দিয়ে দিয়েছে মোদি সরকার। শুক্রবার সংসদে তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েনের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে গ্রামোন্নয়নমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান লিখিতভাবে জানিয়েছেন, ২০২৩-২৪ সালে গোটা দেশে ১০০ দিনের কাজ করেছেন ৮ কোটি ৩৪ লক্ষ মানুষ। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ৭ কোটি ৮৮ লক্ষ। প্রত্যেক পরিবার গড়ে কাজ পেয়েছে ৫০-৫২ দিনের। অথচ, এই জবাবনামায় ২০২২ সাল থেকে পারিশ্রমিক এবং সরঞ্জাম বাবদ বকেয়া অর্থের রাজ্যওয়াড়ি তালিকা দিতে গিয়ে বাংলার নামোল্লেখই করেনি কেন্দ্র! এই ঘটনায় তৃণমূল তো বটেই, কংগ্রেসও রীতিমতো ক্ষুব্ধ। তৃণমূল সাংসদ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এদিন সংসদ চত্বরে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘বাংলা কি ভারতের মানচিত্রের বাইরে? রাজনৈতিক লড়াইয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে পেরে উঠছে না বলে রাজ্যের নামটাই বাদ দিয়ে দেবে মোদি সরকার?’ কংগ্রেসের প্রধান মুখপাত্র জয়রাম রমেশ এক্স হ্যান্ডলে লিখেছেন, ‘রাজ্যওয়াড়ি ১০০ দিনের কাজে বকেয়ার তালিকা লিখিতভাবে চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু গ্রামোন্নয়নমন্ত্রী ৩৩টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের নাম দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গ বাদ কেন? এই অন্যায় বেনজির। মেনে নেওয়া যায় না।’ এই ইস্যুতে সংসদে সরব হবে বলে কোমরও বেঁধে ফেলেছে বিরোধীরা।
রাজনৈতিক মহলের মতে, রাজ্য রাজনীতিতে কংগ্রেস-তৃণমূল দ্বন্দ্ব থাকলেও জাতীয় স্তরে ফের ঘনিষ্ঠ হচ্ছে দুই দল। বিশেষত সংসদে। তাই স্রেফ ১০০ দিনের কাজের ইস্যুই নয়, বিজেপি শাসিত রাজ্যে বাঙালি হেনস্তার ইস্যুতেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুরে গলা মিলিয়েছেন মালদহের সাংসদ ঈশা খান। তিনি বলেন, ‘বিজেপি শাসিত দেশের বিভিন্ন রাজ্যে বাংলাভাষীদের উপর অত্যাচার হচ্ছে। জোর করে বাংলাদেশি তকমা দেওয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে রাহুল গান্ধীর সঙ্গে কথা বলে বিষয়টিকে জাতীয় ইস্যু হিসেবে তুলে প্রতিবাদের আর্জি জানিয়েছি। এভাবে বাংলাদেশি তকমা দিয়ে আদতে তো এনআরসি করতে চাইছে মোদি সরকার। বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় চেয়েছি। কিন্তু তিনি সময় দিচ্ছেন না।’
তবে শুধু ১০০ দিনের কাজই নয়, বাংলায় প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার (গ্রামীণ) ক্ষেত্রেও ২০২২-২৩ অর্থবর্ষ থেকে এ পর্যন্ত একটা টাকাও কেন্দ্র দেয়নি। শুক্রবার সংসদে লিখিত প্রশ্নে তা স্বীকারও করেছেন গ্রামোন্নয়ন রাষ্ট্রমন্ত্রী চন্দ্রশেখর পেমাসানি। ডেরেক ও’ব্রায়েনের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানিয়েছেন, ২০১৬-১৭ থেকে ২০২১-২২ অর্থবর্ষ পর্যন্ত আবাস যোজনায় পশ্চিমবঙ্গকে ২৫ হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারপর থেকে কাজে অনিয়মের অভিযোগে কোনও টাকা দেওয়া হয়নি। তদন্ত চলছে। রাজ্যের থেকে এখনও সন্তোষজনক জবাব মেলেনি। যদিও এই সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য কেন্দ্রকে দেওয়া হয়েছে বলেই দাবি নবান্নের। এমনকী, কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি দল এসেও আবাসে ‘ক্লিনচিট’ দিয়েছিল রাজ্যকে। তারপরও এই বঞ্চনা কি শুধুই রাজনৈতিক কারণে নয়? প্রশ্ন কিন্তু উঠছে। আর তাই কেন্দ্রের ভরসায় না থেকে নিজেদের উদ্যোগে চালু করা কর্মশ্রী প্রকল্পে জোর দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে নবান্ন। এ নিয়ে শুক্রবারই বৈঠক করেছেন মুখ্যসচিব মনোজ পন্থ। প্রতিটি দপ্তর এবং জেলা প্রশাসনকে এই প্রকল্পের মাধ্যমে আরও বেশি করে জবকার্ড হোল্ডারদের কাজ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। রাজ্যের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, কর্মশ্রী প্রকল্পে সবথেকে বেশি কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে পূর্ব বর্ধমান জেলায়। তারপরই রয়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর। তবে এই তালিকায় একেবারে নীচের দিকে কালিম্পং, দার্জিলিং, পুরুলিয়ার মতো জেলা। যে সব জেলা বা দপ্তরে কম কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে, তাদের এই ক্ষেত্রে আরও গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে।