নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: এবারের কেসটায় বাড়াবাড়ি হয়ে গিয়েছে, বুঝেছিল মনোজিৎ মিশ্র। কসবা ল’কলেজে গণধর্ষণের ঘটনায় মূল অভিযুক্ত। তাই প্রথম থেকেই মেয়েটাকে নজরে রাখার ‘অ্যাসাইনমেন্ট’ দিয়েছিল প্রমিত-জায়িবকে। আর নিজে ফোন করেছিল এক প্রভাবশালী যুব নেতাকে। পুলিস সূত্রে খবর, ফোনেই কার্যত সারেন্ডার করেছিল মনোজিৎ। বলেছিল, ‘এবারটাও বাঁচিয়ে নাও।’ আগে বারবার এই দরজায় কড়া নেড়েই মুশকিল আসান হয়েছিল। এবারও মরিয়া চেষ্টা করেছিল মনোজিৎ। দেখা করতে বলেছিল সেই ‘মেন্টর’। কোথায়? বাড়িতে? না, বাড়িতে নয়। অন্য কোথাও। বেরিয়ে পড়েছিল মনোজিৎ। এক বন্ধুর গাড়ি নিয়ে। দেখাও করেছিল মেন্টরের সঙ্গে। তিনি বলেছিলেন গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে। ‘কয়েকটা দিন যাক, ঠান্ডা হয়ে যাবে।’ তারপর মনোজিৎ বেরিয়ে আসুক, অসুবিধা নেই।
কোথায় দেখা করেছিল সেই ‘মেন্টর’? এই তথ্য নিশ্চিতভাবে জানাচ্ছে না পুলিস। তবে সূত্রের খবর, ওই রাতে চার জায়গায় টাওয়ার লোকেশন পাওয়া গিয়েছে মনোজিতের—বালিগঞ্জ, রাসবিহারী, গড়িয়াহাট এবং কড়েয়া এলাকায়। সম্ভবত রাসবিহারী এলাকার কোথাও মেন্টর নেতার সঙ্গে সঙ্গে দেখা করেছিল এমএম। তারপর গড়িয়াহাট, বালিগঞ্জ স্টেশন এবং ফার্ন রোডে তার লোকেশন পাওয়া গিয়েছে। অর্থাৎ, এই এলাকাগুলিতে ঘোরাফেরা করেছে সে। এখানেও কি কারও সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে তার? সেই প্রশ্নের উত্তর পুলিস সূত্রে পাওয়া যাচ্ছে না। তারপরই গাড়ি ঘুরিয়ে সে কড়েয়া থানা এলাকা, অর্থাৎ বেকবাগান-পার্ক সার্কাসের দিকে চলে যায়। সূত্রের খবর, মেন্টর গা-ঢাকা দিতে বললেও খুব একটা আশ্বাস দেননি। তাই উৎকণ্ঠা বেড়েই ছিল মনোজিতের। ২৬ জুনও সে কসবার তালবাগানেই গিয়েছিল নজরদারি চালাতে। ওই তরুণীর উপর। ঘোরাফেরা করছিল কসবা থানার কাছে। মোবাইল টাওয়ার লোকেশন ট্র্যাক করে সেখান থেকেই তাকে গ্রেপ্তার করে কসবা থানার পুলিস। তখন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা।
মনোজিৎ ভাবতেও পারেনি রাজ্য এভাবে তেড়েফুঁড়ে নেমে পড়বে এই মামলায়। এতদিন তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছিল কলকাতা পুলিসের সিট। বুধবার সেই তদন্তভারই গিয়েছে খোদ গোয়েন্দা দপ্তরের হাতে। উইমেনস গ্রিভান্স সেলে। তবে শেষবেলায় আদালতে দেওয়া ফরওয়ার্ডিংয়ে সিট কিন্তু জানিয়ে দিয়েছে, তিন অভিযুক্তই প্রভাবশালী। তাই এদের বিষয়ে কোনওরকম ফাঁক রাখা যাবে না। পাশাপাশি তারা আরও জানিয়েছে, পুরো ঘটনাটাই পরিকল্পিত। মনোজিতের ‘টার্গেট’ প্রথম বর্ষের ওই ছাত্রীকে সেদিন সন্ধ্যার পর যে কলেজেই আটকে রাখা হবে, তার প্ল্যান হয়েছিল আগেই। কখন তরুণীকে আটকানো হবে, সেই সময় কলেজে কতজন থাকবেন, তাদের কী ভূমিকা হবে, মনোজিৎকে কতজন ‘এই কাজে’ সাহায্য করবে— সবটাই আগে ঠিক করা ছিল। মনোজিৎ, জায়িব ও প্রমিতের কল ডিটেলস ঘেঁটে পুলিস দেখেছে, ঘটনার দু’দিন আগে থেকেই তাদের মধ্যে ঘনঘন কথা হয়েছে। কী নিয়ে এত কথা? পুলিসি জেরায় প্রমিত ও জায়িব জানিয়েছে, তরুণীকে কীভাবে ফাঁদে আটকানো হবে, সেই প্ল্যানই চূড়ান্ত করেছিল মনোজিৎ।
মামলার জাল তাই আরও শক্ত করছে পুলিস। লালবাজার জানিয়েছে, ধৃত চারজনের বিরুদ্ধে নতুন ছ’টি ধারা যুক্ত করা হয়েছে। সেগুলি হল— গোপনে অন্যদের যৌন কার্যকলাপ দেখা, অস্ত্র দিয়ে আঘাত, হুমকি, অপহরণ করে আটকে রাখা, বলপূর্বক আটক করে নির্যাতন এবং বদ্ধ জায়গায় আটক। কোনও প্রভাবই যাতে সাজার ক্ষেত্রে বাধা হতে না পারে, সেই সমীকরণেই চেকমেটের দিকে এগচ্ছে লালবাজার।