আমাদের এই পৃথিবী সত্যিই এক বিচিত্র জায়গা। এখানে এমন অনেক কিছুই রয়েছে যার ব্যাখ্যা মেলা কঠিন। তেমনই কিছু জায়গার সঙ্গে তোমাদের পরিচয় করাচ্ছেন
কমলিনী চক্রবর্তী।
আমাদের এই পৃথিবী সত্যিই এক বিচিত্র জায়গা। এখানে এমন অনেক কিছুই রয়েছে যার ব্যাখ্যা মেলা কঠিন। তেমনই কিছু জায়গার সঙ্গে তোমাদের পরিচয় করাচ্ছেন
কমলিনী চক্রবর্তী।
রাজস্থানের জয়সলমিরের নাম কে না শুনেছে। এখানেই তো রয়েছে ফেলুদা গল্পের সেই বিখ্যাত সোনার কেল্লা। সত্যজিৎ রায়ের গল্পে যেটিকে ‘সোনার কেল্লা’ বলা হয়েছে, তার পোশাকি নাম জয়সলমির ফোর্ট। যাইহোক, এই অঞ্চলে যারা বেড়াতে গিয়েছ, তারা হয়তো একটি বিশেষ গ্রামের নাম শুনে থাকবে। গ্রামটির নাম কুলধারা। জয়সলমির থেকে মাত্র ১৭ কিমি দূরে অবস্থিত এই গ্রাম।
মরুরাজ্যের এই গ্রামটির বিশেষত্ব কী? মাত্র তিন শতাব্দী আগের কথা, খুবই বর্ধিষ্ণু গ্রাম ছিল এই কুলধারা। কিন্তু আজ আর সেই আড়ম্বরের বিন্দুমাত্র নেই। বরং নিস্তব্ধ, জনপ্রাণীবিহীন এক ভূতুড়ে গ্রামে পরিণত হয়েছে এই কুলধারা। কিন্তু এমন কেন হল? তাহলে প্রচলিত গল্পটা শুরু থেকে বলা যাক। ১২৯১ সাল থেকে পালিওয়াল ব্রাহ্মণদের বাস ছিল এই গ্রামে। মরু অঞ্চলে এই সম্প্রদায়ের হাতে সবুজ ফসল ফলত। ঐশ্বর্যের কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু হঠাৎ এক রাতে কুলধারা ও আশপাশের বহু গ্রামের বাসিন্দারা নাকি কোথায় যেন কর্পূরের মতো উবে যায়। কেউ আর তাদের খোঁজও পায় না। মোট তিরাশিটি গ্রাম একেবারে ফাঁকা করে দিয়ে লোকজন চলে গিয়েছিল। সেটা ছিল ১৮২৫ সালের ঘটনা। তারপর থেকেই এই গ্রামের বদনাম— এটি নাকি ভূতুড়ে গ্রাম। অভিশাপের জন্যই কুলধারার এই অবস্থা! সন্ধে নামলেই নিস্তব্ধ চরাচর। শুধু ফাঁকা ভাঙাচোরা ঘর-বাড়িগুলি দাঁড়িয়ে থাকে। দিনের বেলায় অনেক পর্যটক এই জনশূন্য গ্রামটি স্বচক্ষে দেখতে আসেন। কিন্তু সূর্য পাটে গেলেই ভূতুড়ে পরিবেশ। সন্ধে নামলে আর কেউ ওই অঞ্চলে যায় না। স্থানীয় লোকের বিশ্বাস, রাতের অন্ধকারে সেখানে ভূত প্রেতের আড্ডা বসে।
বর্তমানে রাজস্থান সরকার ও আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে ইন্ডিয়া কুলধারার পরিত্যক্ত বাড়ি-ঘরগুলি সংরক্ষণ করেছে। পর্যটকদের কাছে এই গ্রামের জনপ্রিয়তাও তুঙ্গে। আসলে ভূতপ্রেতের গল্প শুনলেই চোখে দেখার জন্য মানুষের মন উসখুস করে। কিন্তু যুক্তিবাদীরা এই ভূতপ্রেত, অভিশাপের জনশ্রুতি মানতে নারাজ। তাঁদের যুক্তি, কুলধারার জনশূন্য হয়ে পড়ার মূল কারণ খরা। জলের অভাবের জন্য এই গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হন বাসিন্দারা। আর তা মোটেও একরাতে ঘটেনি। ধীরে ধীরে মানুষজন মরুরাজ্যের এই গ্রাম ছেড়ে অন্য জায়গায় বসতি স্থাপন করেন। ঐতিহাসিকদের গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ১৮১৫ সাল থেকেই এই অঞ্চলের কুয়োগুলো শুকিয়ে যেতে শুরু করে। শেষপর্যন্ত শুধুমাত্র একটি ধাপ-কূপ ও দু’টি কুয়োতে জল অবশিষ্ট ছিল। পরে তাও শুকিয়ে যায়। জলের অভাবে এই গ্রামে কৃষিকাজ বন্ধ হয়ে যায়। জনসংখ্যাও ধীরে ধীরে কমতে থাকে। অবশ্য, আরো একটি গবেষণা থেকে জানা যায় যে, ভূমিকম্পের কারণে কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় কুলধারা।