নিজস্ব প্রতিনিধি, মেদিনীপুর: বেহাল রাস্তা। খানা-খন্দে ভর্তি। অল্প বৃষ্টি হলেই চরম ভোগান্তি। কিন্তু সেই ভোগান্তি এভাবে জীবন নিয়ে টানাটানি করবে, তা ভাবতেই পারছেন না ডেবরা ব্লকের ষাড়ঁপুর লোয়াদা গ্রাম পঞ্চায়েতের কাঁকড়া গ্রামের বাসিন্দারা! বৃহস্পতিবার দুপুরে বাড়িতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিল সুস্মিতা মুর্মু নামে বারো মাসের এক শিশুকন্যা। রাস্তা খারাপ। অ্যাম্বুলেন্স আসেনি। বাইকে করে নিয়ে যাবে, তারও জো নেই। অগত্যা ওই বেহাল পথ ধরেই সুস্মিতাকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিলেন বাড়ির লোকেরা। পৌঁছনোর আগেই সব শেষ! গ্রামে খবর পৌঁছতেই উত্তেজনা ছড়ায়। বিজেপির পঞ্চায়েত সদস্যকে গাছে বেঁধে রেখে বিক্ষোভ দেখান তাঁরা। পরে পুলিস এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। ক’দিন আগে গ্রামের এক জামাই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। বাঁশের খাটিয়ায় চাপিয়ে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু ওই পথেই মৃত্যু হয় তাঁর। সেই ঘটনার পরও রাস্তার হাল একটুও বদলায় নিয়ে বলে ক্ষোভে ফুঁসছিল গোটা গ্রাম। এদিন সেই ক্ষোভের আগুনে ঘৃতাহুতি পড়ে।
গ্রামবাসী কমল জানা বলেন, ‘খুবই মর্মান্তিক ঘটনা। রাস্তার অবস্থা সত্যিই খুব খারাপ। অভিযোগ জানিয়েও কোনও লাভ হয়নি। সামান্য বৃষ্টি হলে ভোগান্তির শেষ থাকে না।’ তৃণমূলের অঞ্চল সভাপতি দিলীপ কুমার ঘোষ ও
বুথ সভাপতি গোপাল ভৌমিক বলেন, ‘গ্রামটি বিজেপির দখলে। পঞ্চায়েত সদস্য কোনও কাজ করেন না। অঞ্চল অফিসেও যান না।’ বিজেপির চরম গাফিলতির কারণেই সুস্মিতার মতো বাচ্চা একটা মেয়ের জীবন চলে গেল বলে গ্রামবাসীদের অভিযোগ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সুস্মিতার বাবা সমীর মণ্ডল ও মা চম্পা মান্ডি মুর্মু দিনমজুরের কাজ করেন। তাঁদের দুই কন্যাসন্তান। ছোট মেয়ে সুস্মিতা বুধবার বিকেলেও খেলা ধুলো করে। রাতে মায়ের দুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। ভোর রাতে হঠাৎই কান্না জুড়ে দেয় সুস্মিতা। বাড়ির লোকেরা ভেবেছিলেন খিদের জন্যই হয়তো কান্নাকাটি করছে। মা দুধ খাওয়ায়। কিছু সময়ের মধ্যেই সুস্মিতার বমি শুরু হয়। তাকে কোলে নিয়ে ঘর-বাহির হতে থাকেন মা চম্পা। লক্ষ্য করেন, জ্বর এসেছে সুস্মিতার। শারীরিক অবস্থারও দ্রুত অবনতি হচ্ছে। আর দেরি না করে সমীর স্ত্রী ও মেয়েকে বাইকে চাপিয়ে স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু বেহাল রাস্তায় বাইকটি কিছুতেই ছোটাতে পারছিলেন না। সামান্য পথ যেতে দীর্ঘসময় লেগে যায়। মায়ের কোলে ক্রমেই নেতিয়ে পড়ে সুস্মিতা। কোনওরকমে চিকিৎসকের কাছে পৌঁছনোর পর দেখা যায়, মেয়েটি কার্যত নিস্তেজ। চিকিৎসক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। তড়িঘড়ি ভাড়া করে ডেবরা সুপার স্পেশালিটিতে নিয়ে গেলে চিকিৎসক সুস্মিতাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
উল্কার বেগে খবর চলে আসে গ্রামে। উত্তেজিত বাসিন্দারা বিজেপির পঞ্চায়েত সদস্য অভিজিৎ সিংকে ঘিরে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। পরে তাঁকে দীর্ঘক্ষণ গাছে বেঁধে রাখা হয়। ডেবরা থানার পুলিস এসে পরিস্থিতির সামাল দেন। সুস্মিতার বাবা বলছিলেন, ‘আমার মেয়ে হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। কিন্তু রাস্তার জন্য সময় মতো হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারলাম না। তাই মৃত্যু হল। এটা মেনে নিতে পারছি না। অবিলম্বে রাস্তা সংস্কার করতে হবে। নাহলে ফের এমন ঘটনা ঘটবে।’
ষাড়ঁপুর লোয়াদা গ্রাম পঞ্চায়েতের ১৪টি আসন গিয়েছিল তৃণমূলের দখলে। বিজেপি তিনটি আসনে জয়ী হয়। কিন্তু বিজেপি জিতলেও ওই গ্রামগুলিতে কাজ না হওয়ায় ক্ষুব্ধ মানুষজন। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা বিজেপির সহ সভাপতি শঙ্কর গুছাইৎ বলেন, ‘ব্লক প্রশাসন ও বিধায়ক তো তৃণমূলের। কেন রাস্তার সংস্কার করা হল না? তৃণমূলের আমলে কাটমানি ছাড়া কাজ হয় না।’-নিজস্ব চিত্র