Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

আলোকলতার দিনরাত

দেখতে দেখতে পাঁচবছর হয়ে গেল। পর্ণা দেশ ছেড়ে, তিতানকে ছেড়ে একা থাকতে শিখেছে

আলোকলতার দিনরাত
  • ১৭ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

কৌশানী মিত্র: দেখতে দেখতে পাঁচবছর হয়ে গেল। পর্ণা দেশ ছেড়ে, তিতানকে ছেড়ে একা থাকতে শিখেছে। শুধু জল গড়িয়ে খাওয়া ছাড়া কিছু কি পারত ও? কলকাতার সেই গরমের দিনগুলোতে ঘরের ভিতর ঠান্ডা মেশিনের হাওয়ায় নিজেকে এলিয়ে দিয়ে কখনও পড়াশোনার কাজ আবার কখনও ফোনে সোশ্যাল মিডিয়া ঘেঁটে চলা। মাঝে মাঝে ঘরের বাইরে বেরিয়ে কোনওরকমে ফ্রিজার থেকে ঠান্ডা জলের বোতলটা বের করে নিয়েই আবার টুক করে ঘরে ঢুকে পড়া। অবরেসবরে রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার অর্ডার দিতে ভালোবাসত ও। দরজা ফাঁক করে মুখ বাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করত তিতানকে, ‘অ্যাই তিতান কিছু খাবে?’ ওপাশ থেকে জবাব আসত— ‘তেলেভাজা আর মুড়ি।’ পর্ণা ফিক করে হেসে অর্ডার করত ‘প্যান ফ্রাইড মোম’ কিংবা ‘চিকেন বার্গার’।

Advertisement

সেও এখন ইতিহাস। এই পাঁচবছর পর্ণা শীতলতা দেখেছে। এদেশে গরম পড়ে না। এদেশে ঠান্ডা মেশিন লাগে না। ঠান্ডা দেশে থাকা মানুষগুলো তিতানের মতো হয় না মোটেই। আজ থেকে পাঁচবছর আগে বছর পঁচিশের পর্ণা প্রথম যখন ফিনল্যান্ডে পড়তে এসেছিল তখন অবাক হয়েছিল। শোকেসে সাজানো একটা দেশ। যেমন আদুরে দেশ, তেমন তার আদুরে মানুষগুলো। সবার মুখে সুন্দর হাসি, অচেনা মুখ দেখলেই মাথা ঝুঁকিয়ে ‘মই’ বলা চাই। পর্ণার মনে হয়েছিল আজীবন এদেশেই কাটিয়ে দেবে সে। পর্ণাকে সেদিন এয়ারপোর্টে রিসিভ করতে এসেছিল বছর আঠাশের জোয়েল। লম্বা, শার্প, সোনালি চুলের ছেলেটা ওদের সিনিয়র। পর্ণা এসেছে বার্ধক্যবিদ্যায় মাস্টার্স করতে। আর জোয়েলের সাবজেক্ট জেরিয়াট্রিক ফিজিওথেরাপি অ্যান্ড মুভমেন্ট সায়েন্স। রোভানিয়েমির ছেলেটা বাড়ি ছেড়েছে প্রায় দশবছর হল, সেই আঠারোতেই। এই দশবছরে প্রতি ক্রিসমাসে জোয়েল ফিরে যায় তার মা-বাবার কাছে। পর্ণা ভাবে সে কি তিতানের কাছে ফিরে যেতে পারবে আর?
ছোট্ট স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টে তিতানকে ছাড়াই পর্ণা একা বাঁচতে শুরু করেছিল সেদিন থেকে। জোয়েল ওকে নিয়ে গিয়েছিল এস-মার্কেটে। হতভম্ব পর্ণার দিকে তাকিয়ে নিজেই উদ্যোগ নিয়ে কিছু খাবার কিনে দিয়েছিল জোয়েল। সেই থেকে বহুবার বাজার করেছে পর্ণা, একা কিংবা জোয়েলের সঙ্গে। কিন্তু বারান্দার রেলিংয়ের ফাঁক দিয়ে ভ্যানগাড়িতে ফেরি করা সব্জিওয়ালার কাছ থেকে টম্যাটো, ঢ্যাঁড়শ, লালশাক, বরবটি... কেনা হয়নি আর।
দুই
জানলার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিল পঁচাত্তরের লতা। দক্ষিণ কলকাতার গলিতে গলিতে এই দুপুরে সব্জিওয়ালা হারু হাঁক দিয়ে যায়। হারুর সব্জি বরাবরের জ্যান্ত। সবুজ চোখ মেলে শুয়ে থাকে ভ্যানগাড়িতে। লতা একটু লালশাক আর পটল কিনবে বলে দাঁড়িয়েছিল অনেকক্ষণ। হারু এল না। ওপাশ থেকে খ্যানখ্যানে গলায় বছর কুড়ির মেয়েটা চিৎকার করল, ‘ও মাসি, ভিতরে এসে বসো না। তোমার পটল আমি ওবেলায় বাজার থেকে নিয়ে আসবখন। অমন রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে থাকলে অসুস্থ হয়ে পড়বে যে। দিদি জানতে পারলে আমাকে খুব বকবে।’ লতা লাঠি ঠুক ঠুক করে ঘরের দিকে হাঁটতে শুরু করল। একটু পটলের তরকারি করবে ভেবেছিল নিজের হাতে। কতদিন বাদে মনে হল একটু রান্না করবে। কাজল আর ও দু’টিতে খাবে। আর আজকেই হারুটা এল না।
লতা ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিল বিছানায়। কাজল এগিয়ে এল। ‘জল খাবে? একটু শুয়ে থাক মাসি। ভালো লাগবে।’ লতা ভারী গলায় বলল ‘তেষ্টা পেয়েছে, জল দে। তারপর ঘুমাই।’ জল খেয়ে লতা ঘুমিয়ে পড়ল। কাজল বসল উচ্চ মাধ্যমিকের ইংরেজি বই হাতে। দিদি টেনেটুনে ভর্তি করে দিয়েছিল দু’বছর আগে। বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস, ফিলোজফি, পলিটিক্যাল সায়েন্স। এবছর বারো ক্লাসের পরীক্ষা। যখনই কাজল বই খুলে বসে, মনে হয় এর থেকে মাসির সেবা করা অনেক সহজ। দিদি বলে মানুষের সেবা করাও নাকি সায়েন্স। কাজল অতশত বোঝে না, তবে ইদানীং ওর বিকেলের সিরিয়াল দেখা বন্ধ হয়েছে বারো ক্লাসের পরীক্ষার জন্য। কাজলের খুব মনখারাপ তাই। দু’বার কাজ ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকিও দিয়েছে। কিন্তু পরক্ষণেই কথা ফিরিয়ে নিয়েছে। যাবেটাই বা কোথায়? ওর তো আর কেউ নেই এই পৃথিবীতে। বিগত দু’বছর লতার সঙ্গে একই বাড়িতে বাস করছে কাজল। সেভাবে বললে লতাই ওর বাবা ও মা। নিজের বাবা-মাকে তো কখনও দেখেনি কাজল। কাকা মারা যাওয়ার পর কাকি এই বাড়িতে এনে কাজে লাগিয়ে দিল, ব্যস সেই থেকেই লতাই কাজলের জীবন।
বিকেলের হালকা রোদ এসে পড়েছে জানলা দিয়ে। কাজলের এখন আর পড়া হবে না। মাসির জন্য চা বানাতে উঠে গেল সে। লতা বিছানায় শুয়ে চোখ পিটপিট করল ‘কাজল, ও মেয়ে...।’
‘চা হয়ে এসেছে, দিচ্ছি মাসি। চায়ের সঙ্গে কী খাবে? 
বিস্কুট দিই?’
লতা বিছানায় উঠে বসেছে। লতার আজকাল অনেক কিছুই সময় মতো মনে পড়ে না আর। আলো বলেছে লতা বুড়ি হচ্ছে। লতার যেন কী একটা খেতে খুব ইচ্ছে করছে কিন্তু মনে পড়ছে না ঠিক। লতা ঠিক করল কাজল, যা দেবে তাই খেয়ে নেবে আজ। কাল বিকেলে আবার মনে করার চেষ্টা করবে ওর পছন্দের খাবারের নামটা।
তিন
চাকরির প্রথম দিনেই মানুষটাকে দেখেছে পর্ণা। কথা বলার সুযোগ পেল আজ। ছিয়ানব্বই বছরের এলভি ইয়ারভিনেন জন্মেছিলেন ১৯২৯-এ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এলভি ছিল বয়ঃসন্ধির ফ্রক পরা এক মেয়ে। বৃদ্ধাশ্রমের সুদৃশ্য টেরাসে হুইলচেয়ারে বসে আছে এলভি। ঘোলাটে চোখে তাকিয়ে আছে দূরের জঙ্গলের দিকে। ফিনল্যান্ডে গরমকালে আজকাল বেশ গরম পড়ে। রোদের তাপ শরীরে নিয়ে ভিটামিন ডি-র অভাব পূরণ করাতে বয়স্কদের টেরাসে এনে বসায় পর্ণা। ওদের সঙ্গে কথা বলে। মধ্য ফিনল্যান্ডের ইভ্যাস্কুলা শহরের প্রান্তে বিশাল অঞ্চল জুড়ে এই সরকারি বৃদ্ধাবাস। সেখানেই চাকরি পেয়েছে পর্ণা। প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়স্ক মানুষ নিয়ে ওর কাজ। তবে এলভির সঙ্গে সময় কাটাতে সবথেকে বেশি ভালোবাসে ও। ছিয়ানব্বইয়ের কুঁকড়ে থাকা শরীরটা জানায় পনেরোর এক কিশোরীর কথা। অল্যান্ড আইল্যান্ডে বাবার পুলিসের চাকরি এবং সেখানেই আলাপ হওয়া বছর আঠারোর ইউভালের কথা।
ঘড়ির কাঁটা তিনটের ঘর ছোঁয়। বাড়ি ফেরার পথে কিছু প্রয়োজনীয় টুকিটাকি বাজার করতে দোকানে ঢোকে পর্ণা। জোয়েলের সঙ্গে বাজার করার স্মৃতি আজও ঘুরেফিরে আসে মনে। আর মনে পড়ে এক বয়স্ক মানুষের কথা। দেশভাগের পর আরও বছর পনেরো যন্ত্রণার জীবন কাটিয়ে পূর্ব পাকিস্তান থেকে এসে হাওড়া স্টেশনে উঠেছিল যে কিশোরী তার গল্পটাও কী একইরকম ছিল?
পর্ণা ফিরে আসে তার এক কামরার বাড়িতে। শীতের মরণ ঠান্ডা আটকানোর জন্য বিশেষভাবে তৈরি নর্ডিক বাড়িগুলো যেন এক-একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। নিস্তব্ধ, নিশ্ছিদ্র। পর্ণা ডায়েরি খুলে বসে। এলভির গল্পটা ওর চেনা। চেনা গল্প লিখতে ইচ্ছে করে পর্ণার। ও শুরু করে সেই রাত থেকে যে রাতে জার্মানির সৈন্যরা ঘিরে ফেলেছিল অল্যান্ড দ্বীপ। খুঁজে খুঁজে বের করছিল ইহুদিদের। আর অন্যদিকে এক জলদস্যু নিস্কা সেদিন মানুষকে বাঁচানোর প্রতিজ্ঞা নিয়ে তার সমস্ত নৌকা নামিয়েছিল বাল্টিকের জলে। নৌকায় ভাসার আগে ইউভাল চেয়েছিল এলভিকে তুলে নিতে, কিন্তু ভাগ্য সায় দেয়নি। ইহুদি ছেলে ইউভাল আর ফিনিশ মেয়ে এলভির সে রাতে দেখা হয়নি আর। বিশ্বাসঘাতক ফিনিশ সরকার তখন ইহুদিদের শত্রু। একটুকরো ভালোবাসাকে সঙ্গে করে নৌকা এগিয়েছিল গভীর শূন্যতায়।
চার
ফোন বেজে উঠতে চটক ভাঙল পর্ণার। মুখে হাসি নিয়ে ভিডিও কলে অন হল। 
—কোথায় আমার পর্ণা? আমার আলোকপর্ণা? আমার আদরের মণি।
পর্ণা ক্ষীণ হাসল, ‘মোবাইলটা ঠিক করে ধর তিতান, তোমাকে দেখা যাচ্ছে না।’ বাপ-মা হারা পর্ণা মানে আলোকপর্ণাকে বড় করেছে তার দিদান, যাকে ছোট্ট থেকে তিতান বলে ডেকে এসেছে পর্ণা। সেই মানুষটি হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে আছে মোবাইলের দিকে। পর্ণা দেখল এক বছর পনেরোর মেয়ে ত্রিপুরাগামী রাতের ডিঙি নৌকায় গুটিশুঁটি মেরে বসে আছে তার ভাইকে জড়িয়ে। অন্ধকারে চোখ খুঁজে চলেছে একটা ছেলেকে। সবুজ আসেনি। আর আসবে না। নিটোল অন্ধকারে আলাদা পথ ধরবে কলকাতা আর কুমিল্যার সোনামুড়া গ্রামের গল্প। কিন্তু গল্প ফুরবে না। চেনা গল্পগুলো এবার শিকড় ছড়াবে। পৃথিবীর বিচ্ছিন্ন অঞ্চলের অচেনা মানুষগুলোকে জড়িয়ে নিয়ে বড় হয়ে উঠবে সে। সারা জীবন এই মানুষগুলোকে নিয়ে বাঁচবে পর্ণা। আর গল্পের শিকড়ে জল দেবে। অপেক্ষা করবে একটা সবুজ পাতা বা গোলাপি 
ফুলের জন্য।
ভিডিও কলের হাসিমাখা মুখের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে আর একটা বাচ্চা মেয়ে। কাজল! নাকি বছর কুড়ির পর্ণাই। তিতানই যার বাবা ও মা, তিতানই যার জীবন। পর্ণা অস্ফুটে বলল, ‘অ্যাই তিতান কী খেয়েছ?’
লতার মনে পড়েছে খাবারের নামটা। খুক খুক করে হেসে উঠে লতা বলল, ‘তেলেভাজা আর মুড়ি।’ 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ