বহু বছর আগেই বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু বলে গিয়েছেন, গাছের প্রাণ আছে। তবে, বিপদে পড়লে তারাও নাকি প্রাণীদের মতো চিৎকার করতে পারে। অবশ্য মানুষ সেই শব্দ শুনতে পায় না। শুনতে পায় পতঙ্গরা। গবেষণায় পাওয়া নতুন এই তথ্যের কথা জানালেন কল্যাণকুমার দে।
বহু বছর আগেই বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু বলে গিয়েছেন, গাছের প্রাণ আছে। তবে, বিপদে পড়লে তারাও নাকি প্রাণীদের মতো চিৎকার করতে পারে। অবশ্য মানুষ সেই শব্দ শুনতে পায় না। শুনতে পায় পতঙ্গরা। গবেষণায় পাওয়া নতুন এই তথ্যের কথা জানালেন কল্যাণকুমার দে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বলাই’ ছোটগল্পের ছোট্ট নায়কের প্রকৃতিতে গাছপালার মূল সুরগুলোই প্রবল হয়ে উঠেছিল। তাই তো কেউ গাছের ফুল তুললে সে কষ্ট পেত। কিংবা বন্ধুরা বকুলগাছের ডাল ভাঙলে তার চোখে জল চলে আসত। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু অনেকদিন আগেই বলে গিয়েছিলেন গাছেরও প্রাণ আছে। গাছেদের প্রাণ থাকলেও তারা নীরব। উদ্ভিদজগৎ সম্পর্কে এতদিনের ধারণাটা ছিল এমনই। চুপ থাকার দিন শেষ। দিন দিন এত অনাচার আর সওয়া যাচ্ছে না। এতদিন যারা চুপ করেছিল, তারাও এবার ধৈর্য হারিয়ে গর্জে উঠবে। ভাব তো এমনটাই যদি সত্যি হয়। আমাদের রোজকার দেখা কোনও জিনিস, যা সাত চড়ে রা কাড়ে না, হঠাৎ যদি সে চেঁচিয়ে ওঠে! আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে হুঙ্কার ছাড়ে। নেহাত হাসিঠাট্টার কথা নয় এটি। সত্যিই এমনটা হতে পারে। এ কথা বলছে বিজ্ঞান-ই। আমাদের চারপাশে থাকা গাছপালাই তেমনটা করতে পারে। সম্প্রতি এক গবেষণায় তেমন তথ্য উঠে এসেছে।
ইজরায়েলের তেল আভিভ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা জানাচ্ছেন, কোনও রকম আঘাত এলে বা প্রতিকূল পরিবেশের মুখে পড়লে গাছেরাও আর্তনাদ বা দুর্দশার কথা প্রকাশ করে। আর সেই সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ‘আলট্রাসাউন্ড’ শুনতে পায় পতঙ্গরা।
ক্রমাগত জল না পেলে অতি উচ্চমাত্রায় চেঁচিয়ে উঠতে পারে গাছ। তবে কি না সেই হুঙ্কারের শব্দতরঙ্গ অনেকটাই বেশি। তাই মানুষের কানে তা শোনা মুশকিল। উদ্ভিদরা এই ধরনের শব্দ সাধারণত খরার সময় করে থাকে। এছাড়াও গাছ কাটা হলে সেই সময়েও আর্তনাদ করে ওঠে গাছ। ব্যথা বা যন্ত্রণায় গাছও ‘চিৎকার’ করে। অবশ্য গাছের এই চিৎকার অন্য প্রাণীদের মতো নয়। তবে এটি আঙুল ফোটানো বা কম্পিউটার মাউস ক্লিক করার মতো শব্দের সঙ্গে তুলনীয়।
কোনও উদ্ভিদের উপর ধারালো অস্ত্রের কোপ পড়লে বা উপড়ে ফেলার চেষ্টা হলে তাদের দেহ থেকে এক ধরনের ‘আলট্রাসাউন্ড’ নির্গত হয়। খরা পরিস্থিতিতে দীর্ঘকাল ধরে জলের অভাব হলেও এমনটা হয়। মানুষ সাধারণত ২০ থেকে ২০ হাজার হার্ৎজ পর্যন্ত কম্পাঙ্কের শব্দ শুনতে পায়। কিন্তু আলট্রাসাউন্ডের কম্পাঙ্ক ২০ হাজার হার্ৎজের বেশি। তাই মানুষের শ্রবণশক্তি তার নাগাল পায় না। হার্ৎজ (Hz) হল কম্পাঙ্কের আন্তর্জাতিক একক, যা প্রতি সেকেন্ডে একটি নির্দিষ্ট ঘটনার পুনরাবৃত্তির সংখ্যা নির্দেশ করে। এটি জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী হেনরিখ রুডলফ হার্টজ-এর নামে নামকরণ করা হয়েছে। হার্ৎজ-কে 1 S-1 (প্রতি সেকেন্ড) হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়।
তেল আভিভ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইয়োসি ইয়োভেল ও লিলাচ হাদানির গবেষণাগারে উদ্ভিদ ও পতঙ্গের ‘শব্দের আদানপ্রদান’ সংক্রান্ত ওই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন রিয়া সেল্টজার ও গায়জেয় এশেল। গবেষণাগারে তাঁরা টম্যাটো ও তামাক গাছের উপর গবেষণাটি করেন। সেখানে কিছু গাছের পর্যাপ্ত যত্ন নেওয়া হয়েছিল। কয়েকটিতে দীর্ঘদিন জল দেওয়া হয়নি। আবার কয়েকটির বেশ কিছু পাতা ছিঁড়ে নিয়ে সালোকসংশ্লেষের হার কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
বিপদের সময় গাছ শুধুই চিৎকার করে না, বরং এত জোরে চেঁচায় যে কীটপতঙ্গসহ অন্য প্রাণীরা তা শুনতে পায়। বাদুড়ের মতো প্রাণীও সম্ভবত গাছেদের ‘শব্দ’ শুনতে পায়। গবেষকদের কথায় উদ্ভিদরা বিপদ দেখলে অন্যান্য প্রাণীদের মতো দৌড়তে পারে না। তাই চিৎকার করেই নিজের বিপদের কথা অন্যদের জানান দেয়। গমনের ক্ষমতা নেই বলে উদ্ভিদজাতির মধ্যে তৈরি হয়েছে এক জটিল জীব রাসায়নিক ব্যবস্থা। যার সাহায্যে অঙ্গ ছাঁটাইয়ের পরেও বেড়ে উঠতে পারে গাছ। আলো, পৃথিবীর টান, উষ্ণতা ইত্যাদির সাহায্য নিয়ে সহজেই বড় হতে পারে গাছ। আর সেই উপাদানগুলির সাহায্যেই গাছ সাড়া দেয় যে কোনওরকম বিপদের বিরুদ্ধে। এমনটাই জানা যাচ্ছে সাম্প্রতিকতম গবেষণায়।
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যে টম্যাটো গাছগুলি পর্যাপ্ত যত্ন পেয়েছে, তারা শান্ত থেকেছে। অন্যগুলি থেকে ভেসে এসেছে বিশেষ কম্পাঙ্কের আলট্রাসাউন্ড। টম্যাটো গাছের পাতায় কয়েকটি প্রজাতির স্ত্রী-পতঙ্গ ডিম পাড়ে। অর্থাৎ, টম্যাটো তাদের ‘আশ্রয় উদ্ভিদ’ (শেল্টার প্লান্ট)। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ‘আর্তনাদের শব্দ’ শুনেই কয়েকটি প্রজাতির পতঙ্গ জলসঙ্কটে পড়া গাছগুলিকে পছন্দ করছে না। ছেড়ে চলে যাচ্ছে অন্য গাছে। বেছে নিচ্ছে সুস্থ স্বাভাবিক গাছগুলিকে।
প্রজাতি ভেদে প্রতি ঘণ্টায় কম্পিউটার মাউসের ক্লিকের মতো গাছেরা প্রায় ৪০টি শব্দ উৎপন্ন করে। আর জল-বঞ্চিত গাছও শব্দ উৎপন্ন করে। গাছ জল শূন্যতার দৃশ্যমান লক্ষণ দেখানোর আগে আরও ক্লিক ক্লিক শব্দ তৈরি করে। শুকিয়ে যেতে থাকা গাছে এই শব্দ বাড়তে থাকে। এগুলো শুধু ১ মিটারের (৩ দশমিক ৩ ফিট) মধ্যে শোনা যায়। স্বাভাবিক বা অনুকূল পরিবেশে গাছ কোনও শব্দ তৈরি করে না। প্রতিকূল পরিবেশে গাছ অনেক শব্দ উৎপন্ন করে। রোগজীবাণু আক্রমণ, অত্যধিক তাপমাত্রা ও অন্যান্য প্রতিকূল অবস্থাও উদ্ভিদে শব্দ তৈরি করতে পারে। অন্যান্য যন্ত্রণাদায়ক অবস্থাও গাছকে শব্দ তৈরিতে প্ররোচিত করে কি না তা স্পষ্ট নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (আর্টিফিসিয়াল ইনটেলিজেন্স) যন্ত্রের ব্যবহার করে সেই শব্দ ও তার তীব্রতা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, গাছেদের আঘাত পাওয়ার আর্তনাদ একরকম, অবহেলায় থাকার চিৎকার আর এক রকম। পুরো পরীক্ষাটাই চলে সাউন্ডপ্রুফ অ্যাকুস্টিক চেম্বারে। শক্তিশালী মাইক্রোফোনে রেকর্ড করা হয় বিভিন্ন গাছেদের আওয়াজ। তাতে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, যেসব গাছ অবহেলায় ছিল, তারা সাহায্যের জন্য একটানা আর্তনাদ করেছে। তবে প্রাণ যে আছে, দুঃখ যে তাদেরও হয়, নিঃসন্দেহে এই গবেষণা এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে বিজ্ঞানের।
শুধু টম্যাটো বা তামাক গাছই শব্দ উৎপন্ন করে না। গবেষক দলটি বিভিন্ন গাছপালা পরীক্ষা করে দেখেন, শব্দ উৎপন্ন করা গাছের সাধারণ কার্যকলাপ। গবেষণায় দেখা যায়—গম, ভুট্টা, আঙুর, ক্যাকটাস ও হেনবিট সব গাছই প্রতিকূল পরিবেশ শব্দ তৈরি করে। এটি প্রমাণ করে যে গাছপালা কেবল নিষ্ক্রিয় নয়, বরং পরিবেশগত পরিবর্তনগুলি অনুভব করে এবং তাতে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। গাছের এই চিৎকার আশপাশের অন্যান্য গাছপালাকে সম্ভাব্য বিপদের জন্য সতর্ক করতে পারে। ফলে এর প্রতিক্রিয়ায় অন্য গাছগুলো নিজস্ব প্রতিরক্ষা বাড়ায় বা উদ্ভিদের ক্ষতি করতে পারে এমন কীটপতঙ্গ মোকাবিলা করার জন্য অন্য প্রাণীদের আকৃষ্ট করে। মানুষ এসব শব্দ শুনতে পেলে বিপদগ্রস্ত উদ্ভিদকে সাহায্য করতে পারত। তৃষ্ণার্ত গাছপালা মরে যাওয়ার আগেই জল দিয়ে এদের জীবন বাঁচাতে পারত বা আহত গাছকে সুস্থ করতে পারত।