জাজিগ্রামে জনতার ঢল, ৭০ কালীর আরাধনায় বীরভূমের ‘তান্ত্রিক গ্রাম’
  • ৯ নভেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সংবাদদাতা, রামপুরহাট: এক গ্রামে ৭০টি কালীপুজো! স্থান বীরভূমের পাইকরের জাজিগ্রাম। রবিবার সকাল থেকে ভিড়ে ঠাসা রাস্তা, উৎসবের কলরব আর তান্ত্রিক ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে এক রূপকথার মেজাজ নিয়েছিল গোটা গ্রাম। শুধু একটি গ্রামে প্রায় ৭০টি কালীপুজোর বিরল আয়োজন দেখতে ভিড় জমালেন হাজার, হাজার দর্শনার্থী।  ওই গ্রামে মা কালীর আরাধনাকে কেন্দ্র করে শুধু বীরভূম নয়, লাগোয়া মুর্শিদাবাদ ও পড়শি রাজ্য ঝাড়খণ্ড থেকেও কার্যত জনস্রোত আছড়ে পড়েছিল জাজিগ্রামে। পুজোর সঙ্গে রয়েছে মেলাও। 

Advertisement

প্রতিবছরই কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো শেষ হতে না হতেই দিন গোনা শুরু হয়ে যায়। আর এই দিনটি আসতেই পুরো জাজিগ্রাম যেন পরিণত হয়েছে শক্তির দেবীর আবাহনপীঠে। কালীপুজোর সকাল থেকেই ব্যাপক ভিড় জমে গ্রামে। ভিড় ও যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে আনতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়েছিল পুলিশ, প্রশাসনকে। 
জাজিগ্রাম প্রাচীন কাল থেকেই তান্ত্রিকদের সাধন ক্ষেত্র। গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই প্রতিমা গড়ে কালীর আরাধনা হয়। এক এক বাড়িতে একাধিক পুজো। কোথাও বকুলেশ্বরী, কোথাও দিগম্বরী, আবার কোথাও শিয়ালেশ্বরী, বাঞ্ছাময়ী, নিত্যকালী কিংবা ইচ্ছাময়ী রূপে পুজিতা হন দেবী। 
প্রধান আকর্ষণ ছিল মজুমদার পরিবারের অতি প্রাচীন ‘বৃদ্ধামাতা’ কালী। ধবধবে সাদা চুল আর কানে শিশুমূর্তির দুল পরা এই দেবীবিগ্রহ দেখতে মেলা প্রাঙ্গণে নেমেছিল উপচে পড়া ভিড়। এই পরিবারের বর্তমান সদস্য বিশ্বনাথ মজুমদারের কথায়, মহেশপুরের রাজাদের জমিদারি ছিল এই এলাকায়। তাঁরাই তন্ত্র সাধকদের থেকে বৃদ্ধামাতার পুজোর দায়িত্ব নিয়েছিলেন। পরে সেই পুজোর দায়িত্বভার আমরা পাই।  তিনি বলেন, এই বাড়িতেই আরও একটি বাঞ্ছাময়ী কালীর পুজো হয়ে আসছে প্রায় ১১৫ বছর ধরে। 
জানা গিয়েছে, তারা মন্দিরে বৃদ্ধামাতার মূর্তি গড়ার পর কালীপুজোর রাতে কাঁধে চাপিয়ে মেলা প্রাঙ্গনের খোলা আকাশের নীচে নিমগাছের বেদিতে দেবীকে নিয়ে যাওয়া হয়। রীতি অনুযায়ী, কালীপুজোর রাতে বৃদ্ধামাতাকে বেদিতে তোলার সময় ফাটানো হয় পটকা। সেই বিকট শব্দ শুনেই গ্রামের অন্যান্য মণ্ডপে দেবীদের বেদিতে তোলা হয়। এরপর বৃদ্ধামাতার পুজো শুরু হলে ফাটে দ্বিতীয় পটকা- যার আওয়াজে পুরো গ্রামে একযোগে শুরু হয়ে যায় কালীপুজো।
বিভিন্ন পরিবারের পুজোর রীতি একে অপরের থেকে আলাদা। মুখোপাধ্যায় বাড়ির ‘দিগম্বরী’ কালীপুজোয় গঙ্গাজলের বদলে পাত্র ও ঘট ভরা হয় কারণবারি দিয়ে। বলিদানের ছাগল দিয়ে হয় দেবীর চক্ষুদান। অন্যদিকে, ‘ইচ্ছাময়ী’ কালীর পুজো শেষ হয় বলিদানের পর পাঁঠার মাংস দিয়ে ভোগ নিবেদনের মাধ্যমে। আবার ‘দয়াময়ী’ কালীর ভোগে পরিবেশন করা হয় ইলিশ মাছ, পোলাও ও পোস্তর বড়া। শত শত মানুষের সমবেত উপস্থিতিতে নিশিরাতে এই আচার সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিটি মণ্ডপেই রাতভর ছিল মানুষের লম্বা লাইন।
উৎসবের আবহ নিয়ে গ্রামবাসী আনন্দ হালদার বলেন, আমাদের গ্রামে সাতটি দুর্গাপুজো হয় ঠিকই, কিন্তু কালীর টান যে কী জিনিস, তা এই মানুষের ভিড় না দেখলে বোঝা যাবে না। আজ, সোমবার দেবী বৃদ্ধামাতার বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটবে এই সুবিশাল ধর্মীয় সমাগমের। কালীর আরাধনাতেই যেন পূর্ণতা পায় পাইকরের জাজিগ্রাম।