নিজস্ব প্রতিনিধি, ঝাড়গ্রাম: ঝাড়গ্রামে রয়েছে লৌকিক দুর্গার নানা রুপ। লোকায়ত শারদোৎসবে মধ্যে বৈভব হয়ত নেই। আছে প্রাণের আকুতি। দেবী কোথাও এখানে অস্ত্র হাতে পূজিতা আবার কোথাও মাটির হাতি-ঘোড়ার ‘ছলনে’, কোথাও আবার পূর্বপুরুষের স্মৃতিতে করা হয় শোক যাপন। লৌকিক দুর্গার পুজো দেখতে দূরদূরান্ত থেকে পর্যটকরা ছুটে আসছেন। পর্যটন সংস্থাগুলি লৌকিক পুজো ও লোকাচারের নানা দিক তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছে।
ঝাড়গ্রাম জেলা জুড়ে লৌকিক দেবদেবীর মন্দির, থান ছড়িয়ে। লোধা শবর, বাগদি ও অন্যন্য গোষ্ঠীর মানুষের হাতে দেবদেবীরা পূজিত হন। ঝাড়গ্রাম শহরের সাবিত্রী মন্দিরে রণচণ্ডী দুর্গা রুপে পূজিত হন। গুপ্তমণি, জয়চণ্ডী কিংবা চিল্কিগড়ের কনকদুর্গার পুজোয় টিকে রয়েছে স্থানীয় রীতিনীতি ও লোকাচার । বেলিয়াবেড়ার বালিপাল গ্রামে পোড়ামাটির হাতি-ঘোড়ার স্তূপে প্রতিকী দুর্গার পুজো হয়ে থাকে।
স্থানীয় বাগদি সম্প্রদায়ের ‘দেহুরি’ বা পূজারি এই প্রতীকী মূর্তিগুলির সামনে পুজো করেন। জনশ্রুতি, রাজা বালিপাল স্বপ্নাদেশ পেয়ে কেঁদুগাছের জঙ্গলে দেবীর পুজো শুরু করেছিলেন। সেই দেবী ‘কেঁদুয়াবুড়ি’ নামে পরিচিত। রীতি অনুযায়ী, দেহুরি দেবীর উদ্দেশে নিজের হাতের রক্ত নিবেদন করেন। কথিত আছে বর্গি হামলা চলাকালীন স্থানীয় বাগদি সম্প্রদায়ের মানুষ বীরত্বের সঙ্গে জঙ্গলে লড়াই করেছিলেন। পূর্বপুরুষদের সেই স্মৃতির সঙ্গে রক্তাঞ্জলির উপাচারের যোগ রয়েছে বলেই মনে করা হয়। জামবনির সানগ্রাম ও যুগিবাঁধ গ্রামে পোড়ামাটির হাতি-ঘোড়াকে সামনে রেখে প্রতীকী ভাবে দুর্গাবুড়ির পুজো হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, চিল্কিগড়ে কনকদুর্গার মন্দির গড়ে ওঠার আগে এলাকায় শবর সম্প্রদায়ের বাস ছিল। জামবনি পরগনার সামন্ত রাজা গোপীনাথ সিংহ মত্তগজ মন্দির নির্মাণ করলে শবররা সেখান থেকে সরে সানগ্রামের কাছে গভীর জঙ্গলে বসতি গড়েন। তাঁদের আরাধ্য ‘গরামদেবী’ বা গ্রামদেবী পরবর্তীতে দুর্গাবুড়ি নামে পরিচিতি লাভ করেন। বেলিয়াবেড়ার ভোল গ্রামে দেবীর কোনো প্রচলিত প্রতিমা নেই। বাগদি সম্প্রদায়ের মানুষ সেখানে এক জোড়া প্রাচীন তরবারিকেই দুর্গার প্রতীকে পুজো করে আসছেন।
জেলার সাঁওতালি সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে এখন শোকের সময়। বিজয়ার দিনে সাঁওতাল পুরুষরা প্রতীকী বাদ্যযন্ত্র ‘ভূয়াং’ বাজিয়ে ‘দাঁশায়’ নাচের মাধ্যমে শোক প্রকাশ করেন। সাঁওতাল পুরাকথা অনুযায়ী, আশ্বিনের শুক্লপক্ষের দশমী তিথিতে পরাক্রমী আদিবাসী রাজা ‘হুদুড় দুর্গা’কে এক আর্য নারী বধ করেছিলেন। সেই স্মৃতিকে কেন্দ্র করেই দশমী তাঁদের কাছে শোকের দিন।
গোপীবল্লভপুরের ছাতিনাশোল, বিনপুরের ওরগোঁদায় দশমীর সন্ধ্যায় পাতাবোঁদা পরবের অনুষ্ঠান হয়। হাজার হাজার সাঁওতালি নারী পুরুষ ধামসা মাদল বাজিয়ে সারারাত নাচ, গান করেন। বেলপাহাড়ী ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশনের মুখপাত্র বিধান দেবনাথের কথায়, শারদোৎসবের পাশাপাশি লোকায়ত দেবীর পুজো ঘিরেও জঙ্গলমহল এলাকার মানুষের নিজস্ব ইতিহাস, বিশ্বাস ও স্মৃতির পরম্পরা রয়েছে।



