বিহার নির্বাচনে এনডিএর বিপুল জয় আসলে টাকা দিয়ে কেনা! এমনই বিস্ফোরক অভিযোগ করেছে প্রশান্ত কিশোরের দল জন সুরাজ। কিছুদিন আগে দলের সভাপতি উদয় সিং দাবি করেন, সরকারি প্রকল্প রূপায়ণের জন্য বিশ্ব ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিল সরকার। ভোট কিনতে সেই টাকাই ঢোকানো হয়েছে মহিলাদের ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। ১ কোটি ২৫ লক্ষ মহিলা ভোটারের প্রত্যেককে ১০ হাজার করে দিতে খরচ করা হয়েছে ১৪ হাজার কোটি টাকা। সাধারণ মানুষের অর্থে ভেবেচিন্তে ভোট কেনার স্পষ্ট উদাহরণ এটা। প্রশান্ত কিশোরের দলের শীর্ষ নেতার দাবি, জনতার রায় নিশ্চিত করতে ২১ জুন থেকে বিহার ভোটের দিন পর্যন্ত প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের টাকাও গিয়েছে সেই খাতে। দলের মুখপাত্র পবন বর্মার দাবি, নির্বাচনী আচরণবিধি জারি হওয়ার ঠিক একঘণ্টা আগে বিশ্ব ব্যাংকের নির্দিষ্ট প্রকল্প তহবিল থেকে ১৪ হাজার কোটি তুলে দেওয়া হয়েছিল। উদয় সিংয়ের আরও দাবি, এই সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য তাঁদের কাছে আছে।
জন সুরাজ পার্টির এই মারাত্মক অভিযোগ ও দাবি নিয়ে বিজেপি কিংবা জেডিইউ নেতৃত্ব কোনও জোরালো প্রতিবাদ জানায়নি। বরং আমরা এটাই দেখেছি, বিহারে জয়ের হাসি চওড়া হওয়া নিয়েই বাহু ফুলিয়েছে গোটা গেরুয়া শিবির। বিহার জয়কে ‘বাঁধিয়ে’ রাখতে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তো সেদিন উৎসবের চেহারা দিয়েছিলেন দিল্লিতে। এমনকি, দেশের অর্থমন্ত্রীও বিহার ভোটে টাকার খেলা নিয়ে সরাসরি উচ্চবাচ্য করেননি এতদিন। কিন্তু হঠাৎ শনিবার রেউড়ি কালচার নিয়ে নির্মলা সীতারামনের মুখেই উলটো সুর শোনা গেল। বিহারে সরকার গঠনের পক্ষকালের ভিতরে মোদি সরকারের অর্থমন্ত্রী বললেন, ‘টাকা-পয়সা বিলি করে ভোটের রাজনীতি অত্যন্ত বিপজ্জনক ও ক্ষতিকর প্রবণতা। যেভাবে বিভিন্ন রাজ্য জনতাকে হাত উপুড় করে উপহার দিচ্ছে, এটা আমাদের কাছে রীতিমতো উদ্বেগের। ঋণ করে ওইসব টাকা দেওয়া হয়। এভাবে তো রাজ্য সরকারগুলি ঋণে ডুবে যাচ্ছে!’ কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী আরও বললেন, ‘আমি নানাসময়ে বিভিন্ন রাজ্যের অর্থমন্ত্রীকে বলেছি, এভাবে ঋণ করে ভোটের উপহার দেবেন না। অর্থনীতি ডুবে যাবে। আমি রাজ্যগুলিকে বলেছি যে, ঋণ কাঠামোর এখনই সংস্কার করা যেতে পারে। কিছু রাজ্য উৎসাহ দেখিয়েছে। বাকিদেরও এটাই করতে হবে। তবে সবার আগে প্রয়োজন ঋণ করে অর্থ বিলি বন্ধ করা।’
অর্থমন্ত্রীর এই রাজনীতিকে আমরা কী কী নামে অভিহিত করতে পারি: যখন যেমন তখন তেমন; সুবিধাবাদী; রাবড়ি প্রসেস? কেননা, তাঁর এই কথার মধ্যে আন্তরিকতার ‘আ’টুকুও নেই। বিহার বিধানসভার নির্বাচনী সমাবেশ থেকে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিই তো মহিলাদের মাথাপিছু ১০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন। একদা বাংলার জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হেয় করতে রেউড়ি সংস্কৃতির নিন্দায় মুখর হয়েছিলেন এই মোদিই। আবার তিনিই রূপ বদল করে ফেলেন দ্রুত। তাঁরই দল মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও দিল্লিতে রেউড়ির মধু পান করেছে। সেই ‘সাফল্যের ধারা’ই অব্যাহত দেখলাম আমরা বিহার নির্বাচনেও। আগে দেওয়া হয়েছে কোথাও ১৫০০ টাকা তো কোথাও ২৫০০ টাকা। বিহারে সেটাই বেড়ে ১০ হাজার হয়েছে একলাফে! কোনও স্মৃতিই ফিকে হয়নি এখনও, সবই টাটকা—শীতের সবজির মতোই। তবুও উলটো গান গাওয়ার চেষ্টা করেছেন নির্মলা সীতারামন। এই ছবির মধ্যে সমন্বয়হীনতার চেয়ে হীন কৌশলই প্রকট হচ্ছে বেশি। ‘পার্টি উইথ আ ডিফারেন্স’ আসলে নীতিহীনতার চরমটাই উপহার দিচ্ছে নিত্য। মানুষ ভালো নেই। ভালো থাকতে হলে অর্থ জরুরি। টাকার কোনও গাছ হয় না। হাতে হাতে কাজের ব্যবস্থা ছাড়া পর্যাপ্ত টাকা জুটবে কোত্থেকে? বেকারদের পর্যাপ্ত কাজের ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েই মোদি ভোট বাগিয়েছেন তিন তিনবার। কিন্তু এই বিরাট কাজ কোনও ম্যাজিকে হবে না, ‘মোদি ম্যাজিকেও’ না। দরকার সুষ্ঠু পরিকল্পনা এবং তা রূপায়ণের রাজনৈতিক সদিচ্ছা। মোদিবাবুদের সেসব কোথায়? যদি রেউড়ির ‘রাবড়ি রাজনীতি’ করেই ভোট বৈতরণী পেরোনো যায়, অত কষ্ট মেহনত আর কে করে? নির্মলাদেবী আগে তাঁর ‘গুরুঠাকুরকে’ বোঝান, তারপরে না-হয় রাজ্যগুলিকে চেতাবনি শোনাবেন।