মানবজীবনের একটি প্রধান সমস্যা কর্ত্তব্যের দ্বন্দ্ব। পরস্পরবিরোধী দুইটি কর্ত্তব্য উপস্থিত। এখন ইহার কোন্টি করিতে হইবে? ইহার নিশ্চয় ও নির্দ্ধারণ করা একরীপ অসম্ভব বলিয়াই বোধ হয়। ‘উভয়তঃ পাশারজ্জুঃ’ অনেক ক্ষেত্রেই উপনীত হয়। এই ক্ষেত্রে যে মানব বুদ্ধির স্থিরতা রক্ষা করিয়া কর্ম্মক্ষেত্রে অগ্রসর হইতে পারে, তাহাকে বীর বলা হয়। সাধারণ মানুষের পক্ষে এরূপ স্থলে কর্ত্তব্যের মানদণ্ড স্থির রাখা অসম্ভব হইয়া পড়ে। স্থিরচিত্ত ব্যক্তি ভিন্ন ইহার নির্দ্ধারণে সমর্থ হয় না। বাস্তবিক এই দ্বন্দ্বের নিষ্পত্তির মূলসূত্র খুঁজিয়া বাহির করিতে না পারিলে কর্ম্মক্ষেত্রে অগ্রসর হওয়া বিশেষ বিপদ্সঙ্কুল। কর্ম্মের প্রকৃত তাৎপর্য্য থাকে না। যন্ত্রের মতন কর্ম্ম করায় মানুষের মনুষ্যত্ব লোপ পায়। কর্ত্তব্যের যে স্থলে দ্বন্দ্ব সেই স্থলেই অতিমানুষ ভাব ফুটিয়া উঠে। দ্বন্দ্বের অতীত যাঁহারা হইতে পারেন তাঁহারাই মানবের পথপ্রদর্শক। সাধারণভাবে কর্ত্তব্য সকলেই করে। যে স্থলে ‘ডাঙ্গায় বাঘ জলে কুম্ভীর’ এই অবস্থা হইয়া দাঁড়ায়, সে অবস্থায় মানুষ স্বাধীন না হইলে প্রকৃতরূপে কার্য্য করিতে পারে না। কোনও দিকের ভাবে অভিভূত হইলেই কার্য্য পণ্ড হয়; অন্তত চিত্তের শুদ্ধি হয় না। সন্দেহাকুলচিত্ত ব্যক্তি এইরূপ কর্ত্তব্যের বিপদে আত্মহারা হইয়া পড়ে। আত্মহারা হইলেই বুদ্ধির লোপ পায়। কার্য্যের ফল যে প্রকৃত শান্তি তাহা লাভ করিতে পারে না। তেজস্বী মনস্বী ব্যক্তিগণই এরূপ ক্ষেত্রে অবলীলাক্রমে আপনার আত্মভাব প্রকট করিতে সমর্থ হয়। দুর্ব্বল অকর্ম্মণ্য জীব ভাবের অধীনতায় অধীর হইয়া কিংকর্ত্তব্যবিমূঢ় হয়; কিন্তু সবল ব্যক্তি মানসিক বলে বলীয়ান্; তাহার তেজ অদম্য। সে স্থির, সে কোনও একটি পছন্দ করিয়া বুদ্ধি ও শ্রদ্ধার সাহায্যে কর্ম্ম সম্পাদন করে। নিজের অন্তরাত্মা তৃপ্ত হয়। কর্ম্মের প্রকৃত ফল চিত্তশুদ্ধি লাভ করে। স্বাধীন ব্যক্তিই এস্থলে প্রকৃত কর্ম্মাধিকারী। ন্যায় শাস্ত্রে যে ‘উভয়তঃ পাশারজ্জুঃ’ ন্যায়ের উদ্ভব হয়, কর্ম্মক্ষেত্রেও তাহার উদ্ভব হয়। মানুষ নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধির সাহায্যেই এক্ষেত্রে নির্ণয় করিতে অগ্রসর হয়। ইংরাজী ভাষায় যাহাকে dilemma বলে তাহাই ‘উভয়তঃ পাশারজ্জুঃ’ ন্যায়। কর্ত্তব্যক্ষেত্রেও এরূপ dilemma-র উদ্ভব হয়। যুক্তিশাস্ত্র বা ন্যায়শাস্ত্র সে স্থলে প্রকৃত উত্তর দিতে পারে না। আমরা ন্যায়শাস্ত্রের যুক্তি দিয়া সে স্থলে কর্ত্তব্য নির্দ্দেশে করিতে পারি না। কারণ যুক্তিবলে কর্ত্তব্য বুঝিলেও তাহা প্রাণের জিনিস হয় না। যাহাতে প্রাণ থাকে না সে কর্ম্মদ্বারা বিশেষ উপকার হয় না। কর্ম্মচারী নিরীহ প্রজার সর্ব্বস্ব অপহরণ করিতেছে—সে আদেশ সেনাপতির। আদেশ প্রতিপালন কর্ত্তব্য, কিন্তু সে স্থলে যুক্তিতর্ক আদেশ প্রতিপালনের পক্ষে হইলেও, মন তাহা করিয়াও সন্তোষ লাভ করে না, বরং ক্ষুব্ধ হয়। কেবল logic বা ন্যায়শাস্ত্র দিয়া এস্থলে কর্ত্তব্য নির্দ্দেশে চলিতে পারে না।



