পিনাকী ধোলে, সিউড়ি: প্রসূতির বয়স মাত্র ১৪ বছর। যখন প্রসবযন্ত্রণা শুরু হল, তখন মধ্যরাত। স্থানীয় আশা দিদিকে ফোন করলেন পরিবারের লোকজন। ফোন করা হল পরিচিত অ্যাম্বুলেন্সের চালককেও। দুই ফোনই বেজেই গেল। তারপর অ্যাম্বুলেন্স জোগাড় করে যখন প্রসূতিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল তখন ভোরের আলো ফুটেছে। কার্যত অচৈতন্য হয়ে পড়েছে প্রসূতি। সঙ্গে অস্বাভাবিক খিঁচুনি। অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়েই নাবালিকাকে তোলা হল অপারেশন থিয়েটারে। সিজার হল, কিন্তু বিপদ কাটল না। মাত্র এক কেজি তিনশ গ্রাম ওজনের সদ্যোজাতকে নিয়ে তখন যমে-মানুষে টানাটানি অবস্থা। শেষ পর্যন্ত হার মানলেন চিকিত্সকরা।
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছর বীরভূমে যত প্রসব হয় তারমধ্যে ২০শতাংশের বেশিই নাবালিকা। অর্থাৎ, প্রতি ১০০জন প্রসূতির মধ্যে নাবালিকা ২০জনের বেশি। এরমধ্যে আবার ১৫বছরের কম বয়সেই গর্ভবতী হওয়ার সংখ্যাটা নেহাত কম নয়। বিগত কয়েক বছর ধরেই নাবালিকা প্রসূতিতে রাজ্যের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে দু’টি স্বাস্থ্য জেলা, বীরভূম ও রামপুরহাট। নাবালিকা বিয়ে ও গর্ভবতী হওয়া থেকে আটকাতে অবশ্য কম ‘চেষ্টা’ করছে না জেলা প্রশাসন। তবে ফল যে খুব একটা মিলছে না, তা সরকারি পরিসংখ্যানে চোখ রাখলেই বোঝা যায়।
সরকারি তথ্য বলছে, বীরভূম জেলার দুই স্বাস্থ্য জেলা মিলিয়ে ২০২৩-’২৪ অর্থবর্ষে মোট ৬২হাজার ৪৬৬ জন প্রসূতির মধ্যে ১৪হাজার ৮৫০ জনই নাবালিকা। এরমধ্যে ৪৪২জন প্রসূতির বয়স ১৫ বছরের নীচে। নাবালিকা প্রসূতির হার ২৩.৭৭শতাংশ। ২০২৪-’২৫ সালে বীরভূম জেলায় মোট ৬২ হাজার ৭৩২ জন প্রসূতির মধ্যে ১৩হাজার ৩৭৩ জনই নাবালিকা। উল্লেখযোগ্যভাবে এরমধ্যে ৪১০ জনের বয়স ১৫ বছরেরও কম। নাবালিকা প্রসূতির হার ২১.৩১ শতাংশ। চলতি অর্থবর্ষে এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত গত সাত মাসে মোট ৩৭হাজার ৮৩২ জন প্রসূতির মধ্যে ৬৯৩০জনই নাবালিকা। এরমধ্যে ২০২জনের বয়স ১৫বছরের নীচে। গত কয়েক বছর ধরেই জেলার মধ্যে নাবালিকা প্রসূতির হার মহম্মদবাজার ব্লকে সবচেয়ে বেশি। চলতি বছরও এই হার ২৭.৪৫ শতাংশ। ১৭৩৪ জন প্রসূতির মধ্যে ৪৭৬জনই নাবালিকা। এছাড়াও খয়রাশোল, মুরারই-১, মুরারই-২, লাভপুর, নলহাটি-১, নলহাটি-২, রামপুরহাট-২ ব্লকেও প্রতি ১০০জন প্রসূতির মধ্যে ২০ জনের বেশিই নাবালিকা।
জেলা স্বাস্থ্যদপ্তরের এক আধিকারিকের কথায়, নাবালিকা গর্ভধারণের সঙ্গে শিশুমৃত্যু, প্রসূতি মৃত্যুর মতো বিষয়গুলিও জড়িত। অপ্রাপ্তবয়সে সন্তানধারণ করলে মা ও সন্তান দু’জনেরই জীবনের ঝুঁকি থেকে যায়। এনিয়ে লাগাতার সচেতনতার প্রচার চলছে। স্ত্রীর বয়স যদি ২১বছরের কম হয় তাহলে সন্তান গর্ভধারণ না করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। গর্ভধারণ রোধে স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলিতে প্রসূতিদের নিয়ে নিয়মিত বৈঠক হচ্ছে। গর্ভনিরোধক পিল, ইঞ্জেকশনের প্রচারও করা হচ্ছে। কিন্তু তাতেও ফাঁক-ফোকর থেকেই যাচ্ছে। কন্যাশ্রী, রূপশ্রীর মতো প্রকল্পের বাস্তবায়নেও যে খামতি থেকে যাচ্ছে, তা পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। তবে, সব সমস্যার গভীরে লুকিয়ে রয়েছে সেই বাল্যবিবাহই।