হিমাংশু সিংহ: অগ্নিগর্ভ নেপাল অনেক শিক্ষা দিয়ে গেল! আন্দোলনের তেরাত্রি কাটার আগেই ভোটে জিতে আসা ধুরন্ধর চীনপন্থী বাম শাসকের ঠাঁই হল সেনা ক্যাম্পে। গোটা দেশটা তছনছ। কিন্তু কে পি শর্মা ওলির বিদায়েই কি নেপালের জনগণ সুবিচার পাবে, দুর্নীতি ঘুচবে? রাজতন্ত্র বিদায়ের মুহূর্তেও আশায় বুক বেঁধেছিল কাঠমাণ্ডুর রাজপথ। উল্লাস দেখেছিলাম দেশীয় কমরেডদের মুখেও। বাংলায় তখন একচেটিয়া বাম থুড়ি সিপিএম শাসন। সে কী আহ্লাদ এবং অমৃত বচন, শেষ কথা নাকি বলবে বামপন্থীরাই এবং তাঁদের আদর্শ! হাওয়াই জাহাজে ইয়েচুরি সাহেবরা ছুটে গিয়েছিলেন পালাবদলের সাক্ষী হতে এবং সেই সুঘ্রাণ বোতলে ভরে এনে সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে! কিন্তু সেই অদ্ভুত আলো অচিরেই অন্ধকারে মিলিয়ে গিয়েছে। ঘোর আঁধার এক গ্রাস করেছে শান্তির দেশটাকে। মোদিপন্থী সুশীলা কারকির নেতৃত্বে সুশাসন ফিরবে কি না বলা কঠিন। নাকি আবারও বালেন্দ্র শাহ, কুলমান ঘিসিংরা মিলে নতুন অপশাসনের বৃত্ত রচনা করবে? নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া করে লুট! যেমনটি করেছেন ওলি এবং কমরেড প্রচণ্ডরা! সব পরীক্ষার শেষে আবার রাজতন্ত্রেই প্রত্যাবর্তন নয়তো! ডামাডোলের মধ্যেই পুরনো রাজার ছবি পিছনে রেখে সেনা কর্তার সাংবাদিক সম্মেলন কিন্তু যথেষ্ট ইঙ্গিতবাহী!
রাজতন্ত্রকে বিদায় দিয়ে নতুন নেপালের পথচলা শুরু ১৭ বছর আগে। অভিজ্ঞতা দিয়ে মানুষ বুঝেছে, গণতন্ত্র দেশকে আরও বেশি করে স্বজনপোষণ, ভণ্ডামি এবং দুর্নীতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। মিলিজুলি কমিউনিস্ট শাসন নতুন করে জন্ম দিয়েছে কায়েমি স্বার্থ ও শোষণের। সেই সঙ্গে সবাই মিলে করে খাওয়ারও। শব্দবন্ধগুলো বাংলায় বড্ড চেনা। সাড়ে তিন দশকের ঘরপোড়া গোরু তো আমরা! প্রতিবেশী নেপালে ১৭ বছরে ১৪ টি সরকার, কারও মেয়াদ একবছরের বেশি স্থায়ী হয়নি। সংবিধানটাই বদলে গিয়েছে অন্তত দু’বার। এখন ক্ষমতা হারিয়ে চীনপন্থী ওলি যাবতীয় দায় চাপাচ্ছেন ভারত সরকারের উপর। বিশেষজ্ঞরা বলছে, পিছনে আমেরিকার হাত নাকি স্পষ্ট। নেপালে যিনি প্রধানমন্ত্রী হন তিনি প্রথমেই আসেন ভারতে। এটাই এতদিনকার রীতি ছিল! কিন্তু কে পি ওলি চীনের সঙ্গে চুক্তি করেন। চীনের কাছ থেকে ৪১ মিলিয়ন ডলার সাহায্য নিয়ে আসেন। এটাই চেয়েছিল চীন। শ্রীলঙ্কাকেও তারা এভাবেই পকেটে পুরেছে। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। একই পথের পথিক পাকিস্তানও। নেপালেরও আক্কেলগুড়ুম, এর চেয়ে তো রাজতন্ত্রই ভালো ছিল।! আগামী একবছর কিন্তু বিরাট সাসপেন্স অপেক্ষা করছে বুদ্ধভূমির জন্য।
শুধুই কি নেপাল? বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া অস্থিরতা ক্রমশ আঙুল তুলছে ক্ষমতাসীনদের দিকে! বার্তা একটাই, শাসক সাবধান হও! মানুষ জাগছে, জনগণ তার হকের অধিকার বুঝে নিতে শুরু করেছে। রাস্তায় নেমে তারা জানান দিচ্ছে, নির্বাচনই শেষ কথা বলে না। কোনও দল কিংবা ব্যক্তি বংশ পরম্পরায় ভোটযন্ত্রকে নির্মমভাবে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে জনবিস্ফোরণ অনিবার্য। ক্ষুধার্ত মানুষকে সিস্টেমের দোহাই দিয়ে বেঁধে রাখা অসম্ভব। মানুষকে ঠকালে রাজতন্ত্র, গণতন্ত্র কিংবা কমিউনিস্ট আদর্শের বুলি কপচে পরিত্রাণ সম্ভব নয়। সেই অভিঘাতেই ভোটে জেতার বছর ঘুরতে না ঘুরতেই পালাবদলের হুঙ্কার। শুধু প্রতিবেশী নেপাল, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানেই নয়। উন্নত দুনিয়াতেও একই রা। ফ্রান্সে বিক্ষোভের ধাক্কায় গদি গিয়েছে ফ্রাঁসোয়া বায়রুর। এই নিয়ে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁর আমলেই বিদায় নিলেন তিন-তিনজন প্রধানমন্ত্রী। মার্কিন মুলুকও খুব দূরে নয়। অভূতপূর্ব জয়ের বছর ঘোরার আগেই জনপ্রিয়তা হারাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। শুল্ক চাপানোর খামখেয়ালিপনায় উত্তাল ওয়াশিংটন। নৈশভোজে গিয়ে বিক্ষোভের মুখে স্বয়ং প্রেসিডেন্ট। জমে ওঠা ক্ষোভের বিস্ফোরণেই উটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ভেজাল অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়ে মাত্র একটা বুলেটের আঘাতেই প্রাণ হারাতে হল প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ সুহৃদ, বিগত নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রচারের মুখ, ‘টার্নিং পয়েন্ট ইউএসএ’র প্রতিষ্ঠাতা ৩১ বছরের চার্লি কার্ককে। মার্কিন নির্বাচনের আগে ডোনাল্ড ট্রাম্পও একইভাবে প্রকাশ্য সভায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। সেটা ১৩ জুলাই ২০২৪। তারই রিপ্লে দেখল আমেরিকা ১৪ মাস পর। ফারাক শুধু একটাই। সেদিন আততায়ী সফল হলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আর দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হওয়াই হতো না! গরিব, বড়লোক জানি না, জনগণের রোষ কিন্তু বড়ই একরোখা। দেশকাল মানে না।
আজ এটা প্রমাণিত সত্য, শতাব্দী প্রাচীন রাজতন্ত্রকে বিদায় জানাতে গিয়ে জগাখিচুড়ি কমিউনিস্ট শাসন নেপালের মানুষকে স্বস্তি দিতে ব্যর্থ। উল্টে আরও বড় দুর্নীতি, স্বজনপোষণ ও ভণ্ডামির দরজা খুলে দিয়েছে। অতি বিপ্লবীদের গুছিয়ে খাওয়া সহ্য হয়নি সাধারণের। ক্ষমতা
পেলে হরেক কিসিমের বামপন্থীরা যে কত ভয়ঙ্কর চেহারা ধারণ করে আজকের নেপাল তারই অকাট্য প্রমাণ। ঠিক ৩৪ বছরের বাম শাসনের বিষময় অভিজ্ঞতা যেমন দেড় দশক পরও চেপে বসে আছে বঙ্গবাসীর মনে। সেইসঙ্গে অত্যাচার। আনকোরা নতুন মুখ, সংগ্রামী কর্মসূচি, সমাজ বদলের আহ্বান কোনও কিছুতেই চোখ তুলে তাকাচ্ছে না জনগণ। নেপালেও তাই। হাঙ্গামার পিছনে বৈদেশিক শক্তির হাত নিয়ে জল্পনা ঘিরে বিতর্ক চলছে উচ্চগ্রামে। কিন্তু গোটা দেশের মানুষকে একযোগে বিদ্রোহী করে তোলার পিছনে বিপথগামী শাসকের দায়কে অস্বীকার করি কী করে?
জনতার পেটে ভাত নেই, কাজ বাড়ন্ত অথচ নেতাদের সন্তান সন্ততিরা মহামূল্যবান গুচি ব্যাগ নিয়ে বিদেশ ভ্রমণে মশগুল। দামি বিদেশি গাড়ি, দেদার হুল্লোড় এবং বিলাসবহুল বিদেশ সফরের দু’শো ছবি পোস্ট করছেন স্যোশাল মিডিয়ায়, যা দেখে ফুঁসছে আধপেটা মানুষ। কমিউনিস্ট শাসনের এই ফল! গণবিস্ফোরণ তো হবেই! এই প্রজাতির নামই দেওয়া হয়েছে ‘নেপো কিড’। মিস নেপাল খেতাব জিতেছিলেন মন্ত্রী কন্যা শৃঙ্খলা খাতিদাওয়া। নেপালের সাধারণ মানুষের বদ্ধমূল ধারণা বাবা বিরোধ খাতিদাওয়ার দৌলতেই ওই খেতাব জিতেছেন শৃঙ্খলা। উল্টোদিকে সাধারণ ঘরের ছেলেমেয়েরা কাজ না পেয়ে রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধে গিয়ে ভাড়াটে সেনার কাজ করে পেট চালাতে বাধ্য হয়েছে। গুচির ব্যাগ হাতে নয়, নেপালের নয়া প্রজন্ম দেশে ফিরছে কফিনবন্দি হয়ে। কাঠমাণ্ডুর রাজপথে বিদ্রোহ সেই জমে থাকা ক্ষোভেরই মর্মান্তিক বহিঃপ্রকাশ। গুমরে ওঠা ক্ষোভ আচমকাই ফেটে বেরয় কুশীনগরের রাস্তায় মন্ত্রীর গাড়ি এক কিশোরীকে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে যাওয়ায়। কমিউনিস্টরা ক্ষমতা পেলে দৈত্যের চেয়েও ভয়ঙ্কর! চীন ও রাশিয়ায় সহজে শাসক বদল হয় না। সেখানে প্রতিবাদ করতে গেলেই মৃত্যু অবধারিত। উত্তর কোরিয়ায় বিরোধিতা করলেই ঠাঁই গ্যাসচেম্বারে।
গত কয়েক বছরে ভারতের প্রতিবেশী ৩ দেশে একই ছবি। আর্থিক সমস্যা, রাজনীতিবিদদের দুর্নীতি থেকে জনবিক্ষোভ। ক্ষমতার রদবদল। কে পি শর্মা ওলি, পুষ্প কুমার দহল ও স্টপগ্যাপ শের বাহাদুর দেউবার মধ্যে ক্ষমতা বদল হতে থাকে চক্রবৎ। ওই ৩ নেতার বিরুদ্ধেই দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে বারেবারে। তাতেই নেপালের রাজনৈতিক কাঠামোর ঘুণধরা চেহারাটা আজ বেআব্রু। রোজ নেপাল থেকে কাজের সন্ধানে বিদেশ যান ৫ হাজার মানুষ। এর পাশেই লুটে খাওয়া বাম নেতানেত্রীদের ছেলেমেয়ে থেকে নিকট আত্মীয়স্বজনরা। আসলে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল যেন একই ধারাবাহিক চিত্রনাট্যের এক একটা এপিসোড মাত্র। সর্বত্রই নির্বাচনের মাধ্যমেই সরকার ক্ষমতায় বসেছে। কোথাও একবছর কোথাও একটু বেশি। জয়ের প্রকাণ্ড ব্যবধান, বিরোধীদের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করেছে। কিন্তু তারপরও জনরোষে সরকার পড়ে যাচ্ছে। ভোটযন্ত্রকে ক্ষমতার জোরে করায়ত্ত করার অভিযোগ তুলে রাস্তায় নেমে গণবিদ্রোহ নাড়িয়ে দিচ্ছে সরকারের ভিত। প্রমাণ হচ্ছে ভোটে জেতাই শেষ কথা নয়।
ঘরের পাশে বাংলাদেশে নির্বাচন বয়কট করেছিল বিরোধীরা। সেই সুবাদেই মুজিব কন্যা হাসিনার জয় ভোটের আগে থেকেই নিশ্চিত ছিল। একবার নয় একাধিকবার। তার দল আওয়ামি লিগ এবং তার মিত্রশক্তিরা ৩০০টি আসনের মধ্যে ২২৫টি জিতে নেওয়ার পর মুজিব কন্যা হাসিনা যে টানা পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকবেন, একপ্রকার নিশ্চিতই ছিল। বিরোধীরা বারবার অভিযোগ করেছে, নির্বাচন প্রকাণ্ড প্রহসন। কেউ কান দেয়নি। সাত মাস যেতে না যেতেই প্রমাণ হল গণতন্ত্র কতবড় তামাশা! হাসিনা শুধু গদিচ্যুতই হননি, পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। পরবর্তী নির্বাচনেও আওয়ামি লিগ অংশ নিতে পারবে কি না রহস্য। শুধু হাসিনাই হারেননি বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম থেকেই মুজিবুর রহমানের ভূমিকা মুছে দিতে উদ্যত হয়েছে বিদ্রোহীরা। গত ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় ঠিক একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। শেখ হাসিনা ও গোতাবায়া দেশ ছেড়েছিলেন। বন্দি হয়েছেন ইমরান খান। শ্রীলঙ্কাতেও ঠিক একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। বিক্ষুব্ধ জনতা রাষ্ট্রপতির বাসভবনে ঢুকে তাণ্ডব চালিয়েছিল। সুইমিং পুলে সাঁতার কেটে, বেডরুম তছনছ করে তোলপাড় করেছিল। এই ঘটনাপ্রবাহকে শুধুই বিরোধী কিংবা বহির্শক্তির চক্রান্ত বলে দেগে দিলে চলবে না। ক্ষমতা দখলের পর কয়েক মাসের মধ্যেই জনতার বিশ্বাসভঙ্গ হচ্ছে। দুর্নীতি আর স্বজনপোষণের বহর দেখে তাঁরা বুঝে যাচ্ছেন, আখের গোছানো ছাড়া নির্বাচিত সরকারের বিশেষ কিছু করার ইচ্ছা নেই। আর মানুষ খুব ক্ষেপে গেলে কিছু অনুদান ছুড়ে দাও ব্যস! এই রং মেলানো তাস খেলা কতদিন চলবে?
সামনে ভোট নেই, বড় কোনও পার্বণও নয় হঠাৎ অনেকদিন পর আজ মণিপুরে পা রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী। বিরোধী নেই, চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো পাল্টা নেতানেত্রীও নেই। সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার উপহার নিয়ে গিয়েছেন তিনি। ব্যাপক নিরাপত্তা। চূড়াচাঁদপুরের প্রত্যেক বাঁকে বাঁকে রাইফেল নিয়ে আধাসেনা। তবু কি শান্তিতে ঘুরতে পারলেন ৫৬ ইঞ্চি, ইম্ফলে কুকি আর মেইতেইদের গড়ে? মণিপুরে শেষবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পা পড়েছিল তিন বছর আগে। হাজারো বিক্ষোভেও পা পড়েনি তাঁর। এখন কয়েক হাজার কোটির উপহারেই কি ইম্ফলের মাটি শান্ত হয়ে যাবে? আগামী ৬ মাস আর সেখানে একটাও জাতিদাঙ্গা হবে না, বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে ভারত সরকার! মানুষ কিন্তু শাসকের খেলাটা ধরে ফেলছে। শাসকের ধর্ম দেশে-বিদেশে এক। রাজতন্ত্রের চেয়েও ভয়ঙ্কর কমিউনিস্টতন্ত্র! ক্ষমতায় বসে গরিবকে লুট করতে লাল নীল গেরুয়া সবুজে বিশেষ পার্থক্য নেই!