হিমাংশু সিংহ: ভোটের আগেই ভোট শুরু হয়েছে বঙ্গে। স্বয়ং বিরোধী দলনেতা রোহিঙ্গা তাড়ানোর নামে যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছেন, তার ধাক্কায় প্রাণ যাচ্ছে হিন্দুদেরও। হ্যাঁ, গরিব, খেটে খাওয়া, সকাল সন্ধে তেত্রিশ কোটি দেবতার নাম জপকরা উদ্বাস্তুদের। শুরু হয়েছে মৃত্যুমিছিল। পানিহাটি থেকে কাকদ্বীপ, ধূপগুড়ি থেকে শ্যাওড়াফুলি, জাত ধর্ম নির্বিশেষে মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছেন প্রতিদিন। প্রদীপ
কর দিয়ে শুরু। শ্যাওড়াফুলির বীথি দাস, ধূপগুড়ির লালুরাম বর্মন এবং কুলপির হাইমাদ্রাসার শিক্ষক সাহাবুদ্দিন পাইক...তালিকাটা ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে। মতুয়া গড় থেকে রাজবংশী পাড়া, চা বাগান থেকে উদ্বাস্তু কলোনি, সর্বত্র অধিকার হারানোর ভয়। এখনও পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ১৭জন। এরকম চললে ৭ ফেব্রুয়ারির পর প্রাণহানির সংখ্যা পশ্চিমবঙ্গের অতীতের যে কোনও নির্বাচনের সংঘর্ষে মৃত্যুর রেকর্ডকে টেক্কা দেবে, কারণ ভয়টা ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার নয়, নাগরিকত্ব হারানোর। বিতাড়িত হওয়ার। বিপন্নতাটা গুলি, বোমার আঘাতের চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। অন্তত এমনই একটা মহল তৈরি করা হয়েছে গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল গোছের কিছু দলবদলু নেতার সৌজন্যে!
কিন্তু কে দেশের নাগরিক, আর কে নয়, তা ঠিক করার মালিক কি নির্বাচন কমিশন? এসআইআর শুরু হতেই এই প্রশ্নটা বারবার সামনে উঠে আসছে। নাগরিকত্ব নিরূপণের দায়িত্ব ষোলোআনাই কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের এ ব্যাপারে কোনও এক্তিয়ারই নেই। কমিশনের দায়িত্ব, একটা ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করে নির্বিঘ্নে ভোটপর্ব সম্পন্ন করা। তালিকার সংশোধন করা যেতেই পারে, সময়ে সময়ে তা প্রয়োজনও। কিন্তু তালিকা থেকে কারও নাম বাদ গেলেই তাঁকে দেশের নাগরিক নন বলে দেগে দেওয়ার ক্ষমতা নেই কমিশনের। অথচ এসআইআর শুরু হতেই রাজ্যে রাজ্যে পুরো বিষয়টাকে বিজেপি নাগরিকত্বের ফাঁদে ফেলতে চাইছে বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে। ভয় আর আতঙ্ক থেকেও একটা আনুগত্য তৈরি হয়। সদস্য সংগ্রহ অভিযান থেকে সাড়া না পেয়ে জেলায় জেলায় দিশাহারা গেরুয়া পার্টি কাঠখড় যা পাচ্ছে, আঁকড়ে ধরে বাঁচতে মরিয়া। জনগণনা, এনপিআর, এনআরসি নিয়ে অনেক কথা হয়েছে, কিন্তু কাজ একটুও এগোয়নি। তা করতে গেলে কেন্দ্রের সরকার বেকায়দায় পড়তে পারে, জনপ্রিয়তা ক্ষুণ্ণ হতে পারে বুঝেই ঘুরিয়ে এনআরসি’র রাস্তা সুগম করতে ১২ রাজ্যে তড়িঘড়ি এসআইআরের দামামা বাজিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিহারের পর এই তালিকায় আছে বাংলা, তামিলনাড়ু, পুদুচেরি, কেরল, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তিশগড়, গোয়া, গুজরাত, উত্তরপ্রদেশ, লাক্ষাদ্বীপ এবং আন্দামান ও নিকোবর। ১২ রাজ্যের ৫১ কোটি মানুষ এই মুহূর্তে এসআইআরের আওতায়। মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশেরও বেশি। তালিকার দিকে তাকালেই একটা জিনিস স্পষ্ট, কোনও ডাবল ইঞ্জিন রাজ্যে কিন্তু ভোটের মুখে এসআইআর হচ্ছে না। তাই ওঠ ছুঁড়ি তোর বিয়ের মতো অবস্থা কোথাও নেই। সেখানে ভোটের ঢের দেরি। কিন্তু দক্ষিণ ও পূর্ব ভারতের যে রাজ্যগুলিতে গেরুয়া দল রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করার শত চেষ্টা করেও ব্যর্থ, সংগঠন মুখ থুবড়ে, মোদি অমিত শাহ গেলে জাগে তারপর আবার ঘুমিয়ে পড়ে, উঠে দাঁড়াতে ক্রাচ লাগে, সেইসব রাজ্যেই নির্বাচন কমিশনকে ঢাল করে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া চলছে ভোটের ঠিক আগে। এসআইআরের আড়ালে এনআরসির পদধ্বনিই উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। নির্বাচন কমিশন নয়, মোদি সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককে জবাব দিতে হবে, বিভ্রান্তি থেকে মৃত্যুমিছিলের দায় কার? কেন অমিত শাহের মন্ত্রক স্পষ্ট করে বলছে না যাদের নাম কাটা যাবে তাদের ভবিষ্যৎ কী? তাঁরা ভোটাধিকার হারিয়েও দিব্যি এদেশে থেকে যেতে, কাজকর্ম করতে পারবেন কি না? উত্তরটা না দিয়ে মোটা টাকার বিনিময়ে মতুয়া গড়ে নাগরিকত্ব প্রদানের দোকান খুলছে বিজেপির জনপ্রতিনিধিরা। এ কাজটা বেআইনি নয়? সেখানে দুর্নীতি নেই!
এদেশে যে কোনও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার দু’টো দিক থাকে। একটা দিক হচ্ছে, এতে ভোটে কার কতটা ফায়দা হবে তার হিসেব কষা। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রে যা অনিবার্য দস্তুর, বিশেষ করে শাসকের। অন্যদিকে, এই কাজ করতে গিয়ে মানুষ স্বস্তি পাবে না নোট বাতিলের মতো আর একদফা হেনস্তাই ভবিতব্য, মাটিতে নেমে তার মূল্যায়ন। গা সওয়া হলেও সত্যি, রাজনৈতিক দলের কুটিল ভোট অঙ্কে চিরদিন প্রাণ যায় সাধারণেরই। আমাদের গরিব দেশে শীতের বলি, গরমে মৃত্যু, অত্যন্ত পরিচিত বাক্যবন্ধ। সেই তালিকায় এবার স্থান করে নিল এসআইআরের আতঙ্কে আত্মঘাতী হওয়ার নয়া আখ্যান। পশ্চিমবঙ্গে গত দু’দশকে জনবিন্যাসের যে বিরাট বদল ঘটেছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ‘ওয়াটার টাইট’ সীমান্ত বলে কিছু হয় না। তা বলে বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে এমনটা কেন? কমিশন কি এতদিন ঘুমোচ্ছিল! না, বিএসএফের কর্তারা দেখেও কিছু দেখেননি। এখন রাজনৈতিক প্রভুদের অঙ্গুলিহেলনে হঠাৎ ব্যস্ততা। কে না জানে, ৭ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের অব্যবহিত পরই ভোটের দিনক্ষণও ঘোষণা করে দেবে কমিশন। এক্ষেত্রেও ভোট ঘোষণার অনেক আগে থেকেই কার্যত প্রশাসনিক কাজকর্মের একটা অংশ কমিশনের নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছে। এসআইআর পঙ্গু করে দিয়েছে স্কুলের পঠনপাঠন, সরকারি কাজকর্ম। এরপরও যে প্রশ্নটা থেকে যায় তা হচ্ছে, কমিশন কি বুক ঠুকে বলতে পারবে একজনও মৃত, জাল কিংবা বেআইনি অনুপ্রবেশকারী নতুন তালিকায় থাকবে না। একটাও জাল ভোট পড়বে না। একজনও হিন্দু উদ্বাস্তুর সঙ্গে অন্যায় হবে না। দিল্লি, মহারাষ্ট্র কিংবা হরিয়ানার ভোট নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে তা অস্বীকার করলেও কমিশন কিন্তু যে জবাব দিয়েছে, তা ধরি মাছ না ছুঁই পানির মতোই দায়সারা। ওই জবাবে তথ্যের চেয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্যকেই মান্যতা দেওয়ার সুস্পষ্ট প্রয়াসই প্রকট।
ঠিক ৯ বছর আগে নোট বাতিল করেও কালো টাকা খতম হয়নি। কিন্তু মাসের পর মাস তার ঠেলায় সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। স্রেফ ব্যাংকে নিজের টাকা তোলার লাইনে দাঁড়িয়ে কত
প্রবীণ মানুষ আতঙ্কে, উৎকণ্ঠায় প্রাণ হারিয়েছেন তার খোঁজ কেউ রাখেনি। তারপর ২০১৭ সালের ১ জুলাই এল জিএসটি। দেশের কর কাঠামো সরল করার ধাক্কায় ছোটো ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের কারবার লাটে ওঠার জোগাড়। আজও সেই অবস্থার বিশেষ বদল ঘটেনি। সোনার উপর ৩ শতাংশ জিএসটি আর প্রবীণ নাগরিকের স্বাস্থ্যবিমায় ১৮ শতাংশ কর চাপিয়ে যার যাত্রা শুরু তাকে জনমুখী বলা যায়? মাত্র দু’মাস আগে প্রবীণদের স্বাস্থ্যবিমা থেকে সেই কালা জিএসটি প্রত্যাহার করা হয়েছে, কিন্তু ঘায়ের দাগটা মেলায়নি। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে চাষিদের ‘স্বার্থে’ (পড়ুন কর্পোরেটদের খুশি করতে) কৃষিবিল পাশ করানো হয় কোনওরকম আলোচনা
ছাড়াই, গণতন্ত্রের উপর বুলডোজার চালিয়ে। এক বছরের বেশি সময় রাজপথে নেমে কৃষকদের সম্মিলিত প্রতিবাদ সেই আইন রুখে দিলেও ক্ষতটা কিন্তু আজও দগদগে। কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা প্রত্যাহারের পরও কি সেখানে মানুষ রঙিন
ফুলে ঘেরা বসন্তের স্বাদ পেয়েছে! পহেলগাঁওই প্রমাণ জঙ্গি দৌরাত্ম্য সেই একইভাবে চলছে।
হলফ করে বলতে পারি, এসআইআরেও অনুপ্রবেশকারীরা শায়েস্তা হবে না, মরবে শুধু নিরীহ সাধারণ মানুষ।
সামনেই পাঁচ রাজ্যে মিনি সাধারণ নির্বাচন। আগাম বলে দেওয়া যায় ওই চার রাজ্যের মধ্যে একমাত্র অসম ছাড়া গেরুয়া শিবিরের জয়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ। ফল হবে ৪-১। প্রশ্নটা সেটা নয়, এই প্রক্রিয়া তো উত্তরপ্রদেশের ভোটের আগেও হতে পারত। মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, ছত্তিশগড়েও
ভোটের আগে হতে পারত। না হয়নি। হয়নি অসমেও। এটা সত্যি বরাক উপত্যকায় এনআরসি হয়ে গিয়েছে আগেই। এত বড়ো একটা প্রক্রিয়া যাতে প্রত্যেক ভোটার কোনও না কোনওভাবে যুক্ত, জনমানসে তীব্র প্রভাব পড়তে বাধ্য। সেই ঝুঁকি
ডাবল ইঞ্জিন রাজ্যে নেওয়া হয়নি নির্বাচনের দোরগোড়ায়। তবে বঙ্গে এসআইআর শুরুর এক সপ্তাহ পর দেখা যাচ্ছে, বিজেপি নিজের জালেই জড়িয়ে যাচ্ছে। গত দু’বছর ধরে যেসব ইশ্যুতে সান দিয়ে গেরুয়া দলের ভিনরাজ্যের প্রভারী থেকে দিল্লির থিঙ্ক ট্যাঙ্করা বঙ্গ বিজয়ের কেতন ওড়ানোর পরিকল্পনা সাজাচ্ছিলেন, তারা এলোমেলো হয়ে পড়ছেন। বিজেপির টার্গেট ছিল সংখ্যালঘুদের টাইট দেওয়ার। বেআইনি অনুপ্রবেশকারীদের বিচ্ছিন্ন করার। স্বপ্ন দেখছিলেন তাদের রোহিঙ্গা বলে দাগিয়ে দেশছাড়া করতে পারলেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কারিকুরি শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু এসআইআরের প্রথম সপ্তাহেই আক্কেলগুড়ুম। রোহিঙ্গাদের শায়েস্তা করতে গিয়ে ঘায়েল হচ্ছে মতুয়ারা, রাজবংশীরা, আদিবাসীরা, সাধারণ ছিন্নমূল হিন্দুরা। কোথাও ৮০০,
কোথাও হাজার টাকায় নাগরিকত্ব বিক্রির দোকান খুলে, বনগাঁর ঠাকুর বাড়ির অদূরে মেলা বসে গিয়েছে। মতুয়া সমাজ আজ বিভ্রান্তিতে, অপমানে বহুধা বিভক্ত। অমিত শাহরা কিছু দেখেও দেখতে পারছেন না। এভাবে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কারও সিএএ ক্যাম্প খোলার অধিকার থাকতে পারে? বিগত কয়েকটা নির্বাচনে খুড়োর কল
ঝুলিয়ে মতুয়াদের এক অবর্ণনীয় দুর্দশার মুখে ফেলা হয়েছে। শুধুই ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হলে একরকম, আর যদি ধীরে ধীরে ডাউটফুল ভোটার থেকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে তাড়িয়ে দেওয়া হয় কিংবা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয় তার প্রভাব আর একরকম। যদি ভারতীয় নাগরিকই না হন, তাহলে এদেশে কাজ মিলবে? ভর্তুকির রেশন, হরেক কিসিমের সরকারি সুবিধা পাওয়া যাবে তো?
যিনি জনগণকে দেওয়া দুশো
প্রতিশ্রুতির মধ্যে ১৯৯টা পূরণ করতে না পেরেও আগামী দু’দশকে শ্রেষ্ঠ ভারত গড়ার ব্লুপ্রিন্ট রচনা করেন, তাঁকে লজ্জিত হতে দেখেছেন কখনও গত ১১ বছরে? কিংবা অস্বস্তিতে হাত দিয়ে মুখ ঢাকতে? রাজনীতিক, সংবাদমাধ্যম, ঝানু নেতা কেউ পারেনি। পেরেছে বিশ্বকাপ বিজয়ী ভারতীয় মহিলা দলের প্রতিনিধি হরিয়ানার ২৭ বছরের সন্তান হারলিন দেওল। প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেছিলেন, সর্বদাই আপনার ত্বক (পড়ুন চামড়া) এমন উজ্জ্বল দেখায় কেন? সর্বদা টেলিপ্রম্পটারের আড়াল থেকে বাক্যবাণ বর্ষণ করা বিশ্বগুরুকে এমন রাঙা হয়ে হাত দিয়ে মুখ ঢাকতে দেখেনি। এত না পাওয়া, প্রতিশ্রুতিভঙ্গের পরও যাঁর চোখেমুখে কখনও অস্বস্তি দেখা যায় না তাঁকে বেকায়দায় ফেলে হারলিন প্রমাণ করলেন জনগণ যা পারেনি, বিরোধীরা যে কাজে ব্যর্থ, কত সহজে তা করতে সফল তিনি। হারলিন হয়তো জানেন কিংবা জানেন না, নোট বাতিল থেকে এসআইআর, জুমলার একনায়ক কারবারিদের দেহে রক্তচলাচল খুব দ্রুত হয়। ত্বকের ঔজ্জ্বল্যও সেই কারণেই।