তন্ময় মল্লিক: ঘটনা এক: পহেলগাঁওয়ে জঙ্গিরা যখন ধর্মীয় পরিচয় জেনে একে একে পর্যটকদের খুন করছিল, তখন কলমা পড়েছিলেন অধ্যাপক দেবাশিস ভট্টাচার্য। অসম বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দু বাঙালি অধ্যাপক সেদিন কলমা পড়ে মুসলিম সেজেছিলেন। আর তাতেই তিনি রক্ষা পেয়েছিলেন জঙ্গিদের হাত থেকে। গোটা দেশ দেবাশিসবাবুর বুদ্ধির তারিফ করেছিল। মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল সাক্ষাৎ যমের হাত থেকে তাঁর বেঁচে ফেরার কাহিনি।
ঘটনা দুই: মুর্শিদাবাদের হরিহরপাড়ার দুই পরিযায়ী শ্রমিক শামিম খান, নাজিমুদ্দিন মণ্ডলরা মহারাষ্ট্র পুলিস ও বিএসএফের হাত থেকে বাঁচার জন্যও বুদ্ধি খাটিয়েছিলেন। আধার কার্ড, ভোটার কার্ড দেখিয়েও যখন মুক্তি পাচ্ছিলেন না তখন তাঁরা গেয়েছিলেন ভারতের জাতীয় সঙ্গীত। ভেবেছিলেন, গড়গড় করে জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে দিলেই মুক্তি পাবেন। কিন্তু, পাননি। উল্টে তাঁদের গায়ে ‘বাংলাদেশি’ তকমা সেঁটে দিয়ে পিটিয়ে ভারতছাড়া করা হয়েছিল। আবর্জনার মতোই তাঁদের ফেলে দিয়ে আসা হয়েছিল সীমানার ওপারে।
দু’টি ঘটনাতেই আক্রান্তদের ধর্মীয় পরিচয় একটা বড় ‘ফ্যাক্টর’ হিসেবে কাজ করেছে। তবুও এর মধ্যে মিল খুঁজতে যাওয়া উচিত হবে না। কারণ পাকিস্তানি জঙ্গিরা চোরের মতো এদেশে ঢুকে নিরীহ পর্যটকদের খুন করেই গা ঢাকা দিয়েছে। ভারতীয় সেনারা তাদের সন্ধান করছে। খোঁজ মিললে পেতে হবে চরম শাস্তি। তবে, কোনও দিন খুঁজে পাবে কি না জানা নেই। যদিও জঙ্গিরা পৃথিবীর যে প্রান্তেই লুকিয়ে থাকুক না কেন তাদের শাস্তি দেওয়ার শপথ নিয়েছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
এক্ষেত্রে মহারাষ্ট্র পুলিস ও বিএসএফ নিরীহ মানুষগুলোর প্রতি চরম অবিচার করলেও তাদের শাস্তির ভয় নেই। তারা বুক ফুলিয়ে ঘুরবে। কারণ আক্রান্তরা এদেশেরই পরিযায়ী শ্রমিক। এদের বাসস্থান ও কর্মস্থান ভিন্ন। তাই তাদের অবস্থা অনেকটা নিজভূমে পরবাসীর মতো। আর মহারাষ্ট্র পুলিস ও বিএসএফ হল পরিকল্পিত ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে’র কাণ্ডারী। তাই তাদের সাত খুন মাফ!
নিজামুদ্দিন, শামিমদের গুলি করে মারা হয়নি ঠিকই। কিন্তু তাঁদের উপর যে অত্যাচার হয়েছে তার আতঙ্ক মৃত্যুভয়কেও ছাপিয়ে গিয়েছে। নিজামুদ্দিনের কথায়, হরিহরপাড়ায় আমাদের বাপ-ঠাকুরদার জন্ম। ভারতীয় নাগরিকত্বের সমস্ত প্রমাণ আছে। তা দেখানোর পরেও ওরা আমাদের তিনদিন মুম্বই থানায় আটকে রাখল। সেখান থেকে ত্রিপুরা। তারপর ত্রিপুরা এয়ারপোর্ট থেকে রাতের অন্ধকারে গাড়িতে করে সীমান্তে নিয়ে গিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে বলল, ‘যে যেখানে পারিস চলে যা।’ কিন্তু যাব কোথায়? কিছুই তো চিনি না, জানি না। দু’দিন, দু’রাত জঙ্গলে কাটিয়েছি। তখন মনে হচ্ছিল, এর চেয়ে গুলি করে মেরে দিলেই ভালো হতো।
যদি প্রশ্ন করা হয়, করোনাকালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আচমকা লকডাউন ঘোষণায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন কারা? সবাই একবাক্যে বলবেন, পরিযায়ী শ্রমিকরা। আচমকা লকডাউনে বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৪০কোটি পরিযায়ী শ্রমিক আতান্তরে পড়েছিলেন। তাঁরা কী খাবেন, কী করে বাড়ি ফিরবেন, তা নিয়ে সরকারের কোনও মাথাব্যথাই ছিল না। পরিণতি হয়েছিল অতীব ভয়ঙ্কর। ফের পরিযায়ী শ্রমিকরা বিপাকে পড়েছেন। তবে, এবার দেশের সমস্ত পরিযায়ী শ্রমিক নয়, টার্গেট বাংলার শ্রমিক। বাংলায় কথা বললেই পিটিয়ে তক্তা নয়, বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে ‘বাংলাদেশি’।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের প্রভাব শুধু বাংলাদেশ লাগোয়া রাজ্যগুলিতেই নয়, দেশের প্রায় সর্বত্র পড়েছে। বিজেপি তার সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে ভিনরাজ্যে কাজ করতে যাওয়া লোকজনকে হেনস্তা করছে। তবে, প্রথমদিকে মূলত গ্রামে গ্রামে ফেরি করতে যাওয়া বাঙালি লোকজনের উপরেই হামলা শুরু হয়েছিল। বাংলায় কথা বললেই ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে পেটাচ্ছিল। কেড়ে নিচ্ছিল তাঁদের সঙ্গে থাকা টাকা ও মালপত্র। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিষয়টি নিয়ে হইচই করায় মাঝে কিছুটা থেমেছিল। কিন্তু আবার শুরু হয়েছে। আর এবার হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস।
বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকরা দেশের বিভিন্ন রাজ্যে রয়েছেন। এরাজ্যের শ্রমিক এবং শিল্পীরা ওড়িশা, উত্তরপ্রদেশ, গুজরাত, কেরল, মহারাষ্ট, দিল্লি, কর্ণাটক সহ গোটা দেশে ছড়িয়ে আছেন। তাঁদের কেউ জরিশিল্পী, কেউ সোনার কারিগর, কেউ যুক্ত বাড়ি তৈরির কাজে। একইভাবে গুজরাত, উত্তরপ্রদেশ, বিহার সহ প্রায় সমস্ত রাজ্যের মানুষ বাংলায় এসে কাজ করছেন। দক্ষতার প্রমাণ দিয়েই ভিনরাজ্যের শ্রমিক ও শিল্পীদের জায়গা করে নিতে হয়। কেউ দয়া করে না। যেমন বাংলার স্পঞ্জ আয়রন কারখানায় ঝাড়খণ্ড ও বিহারের শ্রমিকদের আধিক্য রয়েছে। কারণ এই সমস্ত কারখানার কাজে তাঁদের দক্ষতা বাঙালি শ্রমিকদের চেয়ে অনেক বেশি। আবার সোনা, রুপো, জরি শিল্পের সুক্ষ্ম কাজে বাঙালি শিল্পীদের কাজের কদর জগৎজোড়া। অথচ বিজেপি প্রচার করে, বাংলাতে কাজ নেই বলেই শ্রমিকরা ভিনরাজ্যে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। বিজেপি ক্ষমতায় এলে এরাজ্যেই কলকারখানা হবে। তখন আর কাউকে কাজের জন্য পরিবার ছেড়ে কোথাও যেতে হবে না।
কিন্তু সত্যিই কি তাই? বাংলায় ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকার প্রতিষ্ঠিত হলেই বেকারত্ব চলে যাবে? কাজের সুযোগ হু-হু করে বেড়ে যাবে? তাহলে দেখা যাক তথ্য কী বলছে। কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী শোভা করাণ্ডলাজের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা কমে ৩০ কোটির মতো হয়েছে। যদিও পর্যবেক্ষকরা পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা ৪০ কোটি থেকে কমে ৩০ কোটি হওয়ার দাবির সঙ্গে একমত নন। তাঁদের বক্তব্য, নরেন্দ্র মোদির আমলে বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পেয়েছে, কর্ম সংস্থানের সুযোগ কমেছে। তাহলে পরিযায়ী শ্রমিক কমবে কোন অঙ্কে?
তর্কের খাতিরে ধরেই নেওয়া গেল, নরেন্দ্র মোদি সরকারের সৌজন্যে পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা কমে ৩০ কোটির আশপাশে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্নটা হল, সবচেয়ে বেশি পরিযায়ী শ্রমিক রয়েছে কোন রাজ্যে? উত্তরটা হল, উত্তরপ্রদেশ। সংখ্যাটা কত? ৮কোটি ৩৭ লক্ষ ২৯ হাজার। দ্বিতীয় স্থানটিও ‘ডাবল ইঞ্জিন সরকার’ বিহারের দখলে। সংখ্যাটা ২ কোটি ৯৫ লক্ষ ৫২ হাজার। তৃতীয় স্থানে বাংলা। আগে ছিল পঞ্চম। মোদি সরকার ১০০ দিনের কাজ বন্ধ করে দেওয়ায় ভুগছে বাংলার গরিব খেটেখাওয়া মানুষ। তবে থার্ড হলেও সংখ্যার নিরিখে বিজেপির পোস্টার বয় যোগী আদিত্যনাথের এবং ‘পাল্টুরাম’ নীতীশ কুমারের রাজ্যের থেকে অনেকটাই পিছিয়ে বাংলা।
তাহলে বাস্তবটা হল, সমস্ত রাজ্যেই রয়েছে পরিযায়ী শ্রমিক। যেখানে কাজ করলে বেশি টাকা উপায় করতে পারেন তাঁরা সেখানেই যান। আমাদের রাজ্যেও উত্তরপ্রদেশ, গুজরাত, বিহার, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ডের প্রচুর মানুষ কাজ করতে আসে। অনেকেই আবার স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গিয়েছেন। বড়বাজার তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তবে, শুধু বড়বাজার বা কলকাতা নয়, আসানসোল, দুর্গাপুর, হলদিয়া, শিলিগুড়ি প্রভৃতি শহরে বাংলায় কথা বলা লোকজনের সংখ্যা হু-হু করে কমছে। কিন্তু তারজন্য বাঙালিরা অশান্তি পাকিয়েছে, এমন অভিযোগ কেউ তুলতে পারবে না। তাঁরা এ রাজ্যে বহাল তবিয়তে আছেন।
এপ্রসঙ্গে বিহারের মধুবনীর বিজেপি সাংসদ অশোককুমার যাদবের একটি বক্তব্য উল্লেখ করাটা বোধকরি অপ্রাসঙ্গিক হবে না। ‘বিহারের দু’কোটি লোক রোজগারের জন্য বাইরে থাকেন। বাংলার মাটি বিহারের মানুষকে রোজগার দিয়েছে। সম্মানের সঙ্গে বাঁচার অধিকার দিয়েছে। বাংলার মাটিকে প্রণাম।’ আসানসোলে ‘বিহার দিবস’ উদযাপন অনুষ্ঠানে বিজেপি বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পলকে পাশে বসিয়ে এই কথাগুলি বলেছিলেন অশোককুমার। তারিখটা ছিল ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ।
হ্যাঁ, এটাই রবীন্দ্র-নজরুলের বাংলা। এ রাজ্যের মানুষ কখনও বলেনি, বাংলা বাঙালিদের জন্য। তাহলে বাংলায় কথা বলা লোকজনের উপর কেন অন্য রাজ্যে হামলা হবে? কেন ভালোভাবে তথ্য যাচাই না করেই পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী নাগরিকদের বাংলাদেশে পাঠানো হল? তাৎপর্যপূর্ণ হল, সব ঘটনাই ঘটছে ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের রাজ্যে। তাই উঠছে পরিকল্পিত রাজনৈতিক চক্রান্তের অভিযোগ। বাংলাকে না পাওয়ার ক্ষোভ থেকেই কি বাঙালির উপর এত ক্রোধ! ছাব্বিশের পর তা হবে আরও তীব্র। তাহলে গেরুয়া রোষ থেকে বাঁচার উপায়? খোলা আছে একটাই পথ। আসুন আমরা সবাই ‘অবাঙালি’ হয়ে যাই।