নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া: শান্ত, নিরীহ মেয়েটি সবাইকে চমকে দিয়েছে। অপ্রত্যাশিত! তাঁর পরিবার, স্কুলের শিক্ষকরা, গ্রামবাসী কেউই আশা করেননি কবিতা মুর্মু উচ্চমাধ্যমিকে ৯৩.৮ শতাংশ নম্বর পেয়ে পাশ করবেন। কী করেই বা আশা করবেন। মানবাজার-২ ব্লকের ঝাড়খণ্ড সীমানা ঘেঁষা জাগদা গ্রাম, যেখানে কবিতাদের বাড়ি, সেই গ্রামে এখনও সেভাবে শিক্ষার আলো ঢোকেনি। কবিতার বাবা মনসারাম বছরের বেশিরভাগ সময়ে পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ করেন। বছরে দু’-এক মাস গ্রামে চাষাবাদের কাজ করেন। কবিতার মা সুমিতাদেবীও চাষের মরশুম বাদ দিলে বাকি সময়ে দিনমজুরি করেন। কিন্তু রুখাশুখা এলাকায় তেমন কাজ জোটে না। বাড়িতে অভাব অনটন লেগেই আছে। কবিতা কখনও জঙ্গল থেকে কাঠ কুড়িয়ে, কখনও ধান পুঁতে মাকে সাহায্য করেন। সেই মেয়ে উচ্চমাধ্যমিকে ৪৬৯ নম্বর পেয়ে সকলকে একেবারে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন।
বরাবাজারের জিলিং স্কুল থেকে এবারে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছিলেন কবিতা। গ্রাম থেকে স্কুলের দূরত্ব প্রায় আট কিলোমিটার। সাইকেলে ভাঙাচোরা পথ পেরিয়ে স্কুলে যেতে হতো তাঁকে। স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নির্মলকুমার হাঁসদা বললেন, কবিতা স্কুলে চুপচাপই থাকত। কারও সঙ্গে সেরকম মিশত না। ফলে, ও যে এরকম রেজাল্ট করবেআমরা ভাবতেই পারিনি। ওর এই সাফল্যে আমরা গর্বিত।কবিতা বাংলায় ৯৪, ইংরেজিতে ৯০, ভূগোলে ৯৪, সংস্কৃতে ৯২ এবং শারীর শিক্ষায় ৯৯ পেয়ে স্কুলের মুখ উজ্জ্বল করেছেন।তাঁর সংযোজন, অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে মেয়েটি পড়াশোনা করে সফল হয়েছে। তার এই চেষ্টাকে কুর্নিশ জানাই। আগামীদিনে পুরুলিয়া কিংবা বাঁকুড়ার কোনও কলেজ থেকে ইংরেজি অনার্স নিয়ে পড়তে চায় বলে জানিয়েছেনকবিতা।
সাত ফুট বাই চারফুটের ছোট্ট একটি মাটির ঘরে বসেই কবিতার স্বপ্ন বোনা।সেখানেই পড়াশোনার অবসরে ছবি আঁকেন, গান করেন। আদিবাসী আন্দোলন নিয়ে লেখা সাঁওতালি গান, রবি ঠাকুরের ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে’ কবিতার বড্ড প্রিয়। তিনি জানেন, এই লড়াইটা তাঁর একার। ওঁর মতো আদিবাসী পরিবারে জন্মানো, প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা একটি মেয়েকে প্রতিষ্ঠিত হতে গেলে দাঁতে দাঁত চেপে লড়তে হবে।সুমিতাদেবী বলছিলেন, ওর বাবা পরিযায়ী শ্রমিক। পড়াশোনার জন্য সেইভাবে ওকেসময় দিতে পারেনি। ও যে রেজাল্ট করেছে, সেটা একদম নিজের চেষ্টাতেই। তবে, মেয়ের ভালো রেজাল্ট সুমিতাদেবীর চিন্তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি বলছিলেন, সংসারে অভাব অনটন সত্ত্বেও মেয়ের পড়াশোনা কখনও বন্ধ হতে দিইনি। কিন্তু কলেজে পড়ার খরচা তো অনেক। কোনও সহৃদয় ব্যক্তি যদি এগিয়ে আসেন, তাহলে মেয়েটাপড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবে।