নিজস্ব প্রতিনিধি, আসানসোল: বাংলা-ঝাড়খণ্ড সীমানা বরাবর কয়লা পাচারের সিন্ডিকেট অতিসক্রিয় ছিল। কোনও রকম বৈধ কাগজ ছাড়াই ঝাড়খণ্ড থেকে বিপুল কয়লা বাংলায় এসেছে। কয়লা পাচার নিয়ে অভিযানের শেষে সেই অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে ইডি। অভিযান শেষে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তা জানিয়ে দিয়েছে কেন্দ্রীয় সংস্থা। নথি ছাড়া কয়লা পাচার হত কীভাবে? স্থানীয় ও তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে খবর, দু’ভাবে জালিয়াতি হত। ঝাড়খণ্ড থেকে কয়লা যদি আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেট এলাকার মধ্যে পাচার করতে হত, তাহলে ‘প্যাড’ থাকলেই যথেষ্ট। এর বাইরে চোরাই কয়লা পাচার করার জন্য নকল জিএসটি চালান বানানো হত। অন্য জেলার পুলিশ গাড়ির নথি দেখতে চাইলে সেটিই দেখান হত। এভাবে নকল জিএসটি চালানে সরকারের লক্ষ লক্ষ টাকা কর ফাঁকি দিয়ে ঝাড়খণ্ডের কয়লা পাচার হয়েছে।
নির্দিষ্ট টাকার বিনিময়ে প্যাড সংগ্রহ করতে হয়। এই সিন্ডিকেটে প্যাড ছিল ভার্চুয়াল। অর্থাৎ, ঝাড়খণ্ড থেকে এই সিন্ডিকেটের এজেন্ট গাড়ির নম্বর অন্য সদস্যদের মোবাইলে মেসেজ করে দিত। সেই মেসেজ চলে এলে চোরাই কয়লা অবাধে জাতীয় ও রাজ্য সড়ক দিয়ে ছুটত। ঝাড়খণ্ডের সেই ‘এজেন্টে’র বাড়িতে ইডি অভিযান চালিয়েছিল। তাঁর ফোনটি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এমনকি, কেন্দ্রীয় সংস্থার আধিকারিকরা তাঁকে বাড়ি থেকে নিজেদের সঙ্গে গাড়িতে চাপিয়ে নিয়ে যান। পরে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। চাঞ্চল্যকর বিষয় হল, সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত কারবারিদের নাম ইডি প্রেস রিলিজে উল্লেখ করেছে। কিন্তু ওই এজেন্টের নাম উল্লেখ করা হয়নি। তাঁকেই ‘রাজসাক্ষী’ করে কারবারের বড় মাথা ও প্রভাবশালীদের নাগাল পেতে চাইছে ইডি। সেই সম্ভাবনা যে অমূলক নয়, তা কুলটিতে কান পাতলেই শোনা যায়।
জানা গিয়েছে, এই কারবারের ক্ষেত্রে ওই এজেন্টের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঝাড়খণ্ড থেকে চোরাই কয়লা লরিতে লোড হলেই তাঁর কাছে খবর যেত। এরপর কোন লরিতে কয়লা আসছে, তা তিনি সিন্ডিকেটে মেসেজ করতেন। সেই লরি বাংলা-ঝাড়খণ্ড সীমান্তের ডুবুরডিহি চেকপোস্টে নির্দিষ্ট টাকা জমা করলেই তার জন্য শিল্পাঞ্চলের রাস্তা হয়ে যেত ‘গ্রিন করিডোর’। এই পুরো কাজটি তিনি দেখাশোনা করতেন। প্রভাবশালীদের সঙ্গে তাঁর নিত্য যোগাযোগ থাকত। তাঁর মোবাইল এই তদন্তে ‘আলাদিনের আশ্চর্য্য প্রদীপের’ ভূমিকা নিতে পারে। এখন দেখার, কেন্দ্রীয় সংস্থা সেই প্রদীপের আলো কতটা প্রকাশ্যে আনে। এই ঘটনা থেকে তাঁর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত প্রভাবশালীদের রক্তচাপ বেড়েছে। বিশেষ করে, ইডি উল্লেখ করেছে সংগঠিত কয়লা চক্রটি ‘লোকাল অথরিটির’ সাহায্যে চলত। এতে অনেকেই সিঁদুরে মেঘ দেখছেন।
পাশাপাশি, নকল চালানের বিষয়টিও স্পষ্ট হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে দাবি, বাংলা-ঝাড়খণ্ড সীমানার এই সিন্ডিকেট এবং খনি অঞ্চলের কয়লার ডিও’র সিন্ডিকেট হাত ধরাধরি করে চলত। বৈধ কয়লা কারবারিরা ডিও কয়লা নিজেদের ‘ট্রেডার্সের’ নামে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে জিএসটি দিয়ে বিভিন্ন কারখানায় পাঠায়। এই চক্র ‘ট্রেডার্সের’ নাম বদল করে অবিকল তেমনি চালান তৈরি করত। এই কাজেও বাংলা-ঝাড়খণ্ড সীমানা এলাকায় থাকা কারবারে সেই এজেন্টের বড় ভূমিকা থাকত।