পিনাকী ধোলে, পুরুলিয়া: এলাকার দাপুটে তৃণমূল নেতা থেকে শুরু করে সিভিক ভলান্টিয়ার-কার নেই অবৈধ ইট ভাটা? তৃণমূলের পঞ্চায়েত সদস্য, পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য থেকে শুরু করে দলের পদাধিকারী, সবাই যুক্ত অবৈধ ইটের কারবারের সঙ্গে। সরকারকে রাজস্ব না দিয়ে অবাধে কাটা হচ্ছে মাটি, অবৈধভাবে আসছে ট্রাক ভর্তি কয়লা, আর কৃষিজমিকে ধ্বংস করে গজিয়ে উঠছে একের পর এক অবৈধ বাংলা ইট ভাটা। সবটাই হচ্ছে একবারে পুলিস-প্রশাসনের নাকের ডগায়। আধিকারিকদেরও প্রচ্ছন্ন মদত রয়েছে বলে অভিযোগ ওয়াকিবহাল মহলের।
অবৈধ ইট ভাটা নিয়ে কথা হচ্ছিল ভূমি ও ভূমি রাজস্ব দপ্তরের এক অধিকারিকের সঙ্গে। নাম না প্রকাশের শর্তে ওই আধিকারিক বলছিলেন, ‘জেলাজুড়ে কয়েকশো বাংলা ভাটা রমরমিয়ে চলছে। ভাটাগুলির বৈধ কাগজপত্র নেই। পরিবেশ দপ্তরের ছাড়পত্র নেই। এমনকী ওইসব ভাটা থেকে সরকারি কোষাগারে রাজস্বও আসে না।’ তাহলে পদক্ষেপ করছেন না কেন? ওই আধিকারিকের জবাব, ‘কয়েকটি ভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু, প্রায় সমস্ত ভাটার পিছনেই প্রভাবশালী যোগ থাকায় আর বেশিদূর এগনো যায়নি। যেমন করবার চলার, তেমনই চলছে।’ অন্য এক আধিকারিক বলেন, ‘বেশি বিপ্লবী হতে গেলেই তো মুশকিল। তাই মুখ বুজে চুপ করে থাকাই শ্রেয়। কে আর চায় সুখের চাকরিতে ব্যাঘাত ঘটাতে!’
রঘুনাথপুরের বেরো পঞ্চায়েতের ফুলবেড়িয়া এলাকায় রমরমিয়ে চলছে দু’টি অবৈধ বাংলা ভাটা। তারমধ্যে একটি ওই এলাকারই এক সিভিক ভলান্টিয়ারের। পুলিসকে হাত করে বুক ফুলিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন অবৈধ ব্যবসা। খবর করতে গেলে মারধর করা হয় সাংবাদিককে। অন্য ভাটাটি এলাকারই এক বিক্ষুব্ধ তৃণমূল নেতার। পাড়া পঞ্চায়েত সমিতির এক কর্মাধ্যক্ষের রয়েছে অবৈধ ইট ভাটা। নিতুড়িয়ার এক ব্লকস্তরের তৃণমূল নেতা, কাশীপুরের কালিদহ অঞ্চলস্তরের এক নেতার রয়েছে অবৈধ ভাটা। মানবাজারের জিতুজুড়ি এলাকায় প্রাক্তন জেলা সভাপতির ঘনিষ্ঠ এক দাপুটে নেতার অবৈধ ইটভাটা রয়েছে। পুরুলিয়া-১, পুরুলিয়া-২, আড়ষা, বলরামপুরেরও বহু তৃণমূল নেতার ছত্রছায়ায় চলছে অবৈধ ইট ভাটা। রাস্তা দিয়ে গেলেই চোখে পড়ে সাধারণ মানুষের। শুধু চোখে পড়ে না পুলিস প্রশাসনের।
বিজেপির জেলা সহ সভাপতি গৌতম রায় বলেন, ‘তৃণমূলের জেলাস্তর থেকে শুরু করে বুথস্তর পর্যন্ত নেতাদের অবৈধ ইটভাটা রয়েছে। রাজ্যজুড়ে কয়লা, বালি, গোরু থেকে শুরু করে যত অবৈধ ব্যবসা রয়েছে, সবেতেই যুক্ত তৃণমূল নেতারা।’
সূত্রের খবর, এইসমস্ত ভাটায় যে কয়লায় ইট পড়ানো হয়, তাও সম্পূর্ণ অবৈধভাবেই আমদানি করা হয়। রঘুনাথপুর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে মালগাড়িতে করে যে কয়লা যায়, আজও একেবারে সিনেমার কায়দায় ট্রেন থেকে সেই কয়লা লুট হয় বলে অভিযোগ। তারপর সেই কয়লা পৌঁছে যায় এইসব ইটভাটায়। এছাড়াও ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্রাকে করে কয়লা নিয়ে আসা হয়। এভাবেই চলছে বছরের পর বছর ধরে।
এইসব অবৈধ ভাটা নিয়ে আদালতে মামলাও হয়েছে বহুবার। আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে, দূষণ ছড়ানো এইসব অবৈধ ভাটার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করতে হবে জেলা প্রশাসনকে। কিন্তু তারপরেও ‘নীরব’ প্রশাসন। কেন? তার উত্তর সবাই জানা! এনিয়ে অতিরিক্ত জেলাশাসক ভূমি ও ভূমি সংস্কার রাজেশ রাঠোর বলেন, পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখে পদক্ষেপ করা হবে।
তৃণমূলের জেলা সভাপতি সৌমেন বেলথরিয়া বলেন, জেলায় অবৈধ ইটভাটা রয়েছে। তবে, তার পিছনে তৃণমূল নেতারা যুক্ত আছে কি না আমার জানা নেই। প্রশাসন নিজেদের মতো কাজ করুক। অবৈধ ভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।