নিজস্ব প্রতিনিধি, কৃষ্ণগঞ্জ: এ দেশে শিশুশ্রম নাকি দণ্ডনীয় অপরাধ! সত্যি? কৃষ্ণগঞ্জ ব্লকের জয়ঘাটা যাওয়ার রাস্তার ধারেই পীরপুরে বিশাল ইটভাটা দেখলে বোঝা যায় কীভাবে সেখানে ‘শিশু ও কিশোরশ্রম (নিষিদ্ধকরণ ও নিয়ন্ত্রণ) আইন, ১৯৮৬’ প্রহসনে পরিণত। শীতের হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় ভাটায় কচি কচি হাতে কেউ ইট সাজিয়ে রাখছে, কেউ ইট রোদে দিচ্ছে। রানি, লক্ষ্মণ, অর্জুনরা পড়াশোনায় জলাঞ্জলি দিয়ে পাশের রাজ্য বিহার থেকে বাবা-মায়ের হাত ধরে চলে এসেছে। আগামী কয়েক মাস ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে এই ইটের পাঁজার মধ্যেই কাটবে ওদের। ওদের বাবা-মায়েরা ইট ভাটার মজুর। দিনে ৬০০ টাকা মজুরি। আর খুদেরা বাবা-মায়ের সাহায্যকারী।
এক খুদের মা ইট সাজাতে সাজাতে নিরাসক্ত মুখে বলছিলেন, আমরা বিহারের ভোটের সময়েই এখানে চলে এসেছিলাম। এখানেই ছ’ মাস থেকে কাজ করব। আমাদের গোটা পরিবারই এখানে চলে এসেছে। গাঁয়ে তো কেউ নেই, কার কাছে রেখে আসব ওদের। তাই এখানে কাজে চলে এলে ওদের আর পড়াশোনা হয় না। এখানেই আমাদের কাজে সাহায্য করে। এখন কাজের চাপও ভালোই।
কাজের চাপ থাকবেই। কারণ কয়েক মাস বাদেই বিধানসভা নির্বাচন। সরকারি উন্নয়নের জোয়ার ডাকবে। তাতে প্রয়োজন প্রচুর ইটের। বাংলার বাড়ির নির্মাণেও দরকার ইট। ফলে চাহিদা সামাল দিতে ভিন রাজ্য থেকে শ্রমিক আনতে হয়। আর চলতি নিয়ম অনুযায়ী ‘একটার সঙ্গে একটা ফ্রি’! বাবা-মা এলে খুদেগুলোও চলে আসে। হাত যত বাড়বে রোজগার তত বেশি। আগামী বছরের জন্য পুঁজি তৈরি করার সময় এখন। তাকে পুরোদমে কাজে লাগাতে হবে তো! তাই তো ঠান্ডায় হি হি করতে করতেও শৈশবকে বিসর্জন দিয়ে ‘ওরা কাজ করে’। ইট তৈরি এবং গাড়িতে ইট তুলতে বড়দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দিনভর ব্যস্ত খুদেরা। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে সাজানো ইট। তার ফাঁক দিয়েই মাথায় জলের বালতি নিয়ে হারিয়ে গেল বছর দশকের রানিকুমারি। সেখানে খোলা আকাশের নীচেই সংসার পেতেছে রানির পরিবার। বাড়ির ঠাকুরমা এক বছরের শিশুকে আগুন পোহাচ্ছে। কারণ শীতের সকালেও গরম জামাকাপড়ের অভাব। আর সেই ইটের পাঁজার ভিড়েই রয়েছে আরও পরিবার। যাঁরা পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে এসেছেন বিহার থেকে। মাস দুই আগেই বিহারের নির্বাচনের সময়েই সেই রাজ্য থেকে বাংলায় পাড়ি দিয়েছিলেন তাঁরা। আগামী বৈশাখ মাস পর্যন্ত সপরিবারে এখানেই থাকবেন। দিনভর ইট তৈরি, ইট রোদে শুকোনো, তারপর তার গাড়িতে তুলে দেওয়া, এইসবই কাজ তাঁদের। যদিও সেই কাজের ‘যোগ্য’ সহকর্মী হয়ে উঠেছে বছর দশকের খুদেরাও। বাবা-মায়ের সঙ্গেই মাটি ছাঁচে ফেলে খুব তাড়াতাড়ি ইট বানিয়ে ফেলছে রানি ও তাঁর দাদা অর্জুন।
আবার ভাঁটার অন্য প্রান্তে কোথাও দেখা যাচ্ছে, ইট নিয়ে যাওয়ার গাড়িতে থরে থরে ইট সাজিয়ে দিচ্ছে বছর সাতেকের লক্ষ্মণ। খেলার ছলে হলেও শিশুশ্রমের শিকার তাঁরাও। এদিকে, ভারতের সংবিধান অনুযায়ী, ১৪ বছরের নীচে কোনও শিশুকে কাজে নিয়োগ করা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। শিশুশ্রম আইন, ১৯৮৬ এবং তার সংশোধনী আইন ২০১৬–এর অনুযায়ী শিশুশ্রম দণ্ডনীয় অপরাধও। কিন্তু পেট বড় বালাই। পেটের টানে কত বড় বড় অপরাধ মানুষ করছে, আর এ তো তুচ্ছ শিশুশ্রম আইন ভঙ্গ। মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন বিহার থেকে আসা এক শ্রমিক। ইটভাটায় দিনভর বাবা-মায়ের সহকর্মী বিহারের খুদেরা। -নিজস্ব চিত্র