সংবাদদাতা, বহরমপুর: মাত্র চল্লিশ-পঞ্চাশ টাকায় চুরি হয়ে যাচ্ছে শৈশব। সামান্য টাকার বিনিময়ে স্কুল কামাই করে পাট শুকোনোর কাজ করছে সাইদুল, হিলাল, রোশনারারা ( নাম পরিবর্তিত)। ওদের কেউ ষষ্ঠ শ্রেণির, কেউ সপ্তম বা অষ্টম শ্রেণির পড়ুয়া। পাট ওঠার মরশুমে প্রায় রোজ ডাক পড়ছে এইসব স্কুল পড়ুয়াদের। ঘণ্টা তিনেকের পরিশ্রম। তার বিনিময়ে শিশু শ্রমিকদের উপার্জন বড়জোর চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ টাকা। কেউ উপার্জনের টাকা তুলে দিচ্ছে বাবা-মায়ের হাতে। কেউ বা এই টাকায় টিউশনের বেতন দেয় বলে জানিয়েছে। বহরমপুর-হরিহরপাড়া রাজ্য সড়কের দু’ পাশে রোজ পাট শুকোতে দেখা যায় পড়ুয়াদের। জমির মালিকদের দাবি, শিশুদের কাজে লাগিয়ে খরচ অনেকটা সাশ্রয় হয়।
মুর্শিদাবাদে পাট উঠতে শুরু করেছে। পাটের আঁশ ছাড়িয়ে শুকোতে দেওয়ার কাজও শুরু হয়ে গিয়েছে। বহরমপুর হরিহরপাড়া রাজ্য সড়কের পাশে বহরমপুর ব্লকের বোটাডাঙায় বাঁশের উপর পাট শুকোতে দিচ্ছিল কচিকাঁচার দল। নিজেদের মধ্যে যেন প্রতিযোগিতা চলছিল। কথা বলে জানা গেল, কেউ নিজের বাড়ির কাজ করছে না। স্কুল ছুটি নিয়ে সবাই এই কাজ করছে টাকার বিনিময়ে। কত টাকা পাও? একজন জানাল, এক বান্ডিল পাট রোদে দিতে পারলে পাঁচ টাকা পাব। প্রতি বান্ডিলে ৩৫-৪০ আঁটি পাট থাকে। কেউ আট বান্ডিল, কেউ দশ বান্ডিল রোদে দিতে পারে। কাজ শুরু হয় সকাল দশটা থেকে। কথা বলে আরও জানা গেল, দলের চার-পাঁচজন সকলেই গজধরপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী। কাজের জন্য আগের দিন রাতে বা সেইদিন ভোরে জমি মালিকরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়ুয়াদের বুকিং করে আসেন। মঞ্জু শেখ বলেন, একজন মুনিষ নিতে সাড়ে চারশো থেকে পাঁচশো টাকা লাগে। সেই কাজ ওদের দিয়ে অর্ধেকেরও কম টাকায় হয়। কিন্তু শিশুশ্রম বেআইনি। মঞ্জু শেখ জানান, সবাই দরিদ্র পরিবারের। ওরা স্বেচ্ছায় আসে। উপার্জনের টাকা পরিবারেই কাজে লাগে।
আইনের বেড়া ভেঙার এই চিত্র শুধু বোটাডাঙার নয়। বহরমপুর-হরিহরপাড়া রাজ্য সড়কের ২৫ কিমি রাস্তার দু’ পাশে এরকম শ’য়ে শ’য়ে ঘটনা নজরে আসবে। বিশেষ করে পাট ওঠার মরশুমে এলাকার অধিকাংশ স্কুলের বেঞ্চ খালিই পড়ে থাকে। বারুইপুর হাই স্কুলের এক শিক্ষক বলেন, এই সময়ে উপস্থিতি অর্ধেকের নীচে নেমে আসে। পড়ুয়াদের রোজ স্কুলে আসতে বলা হয়। কিন্তু অভিভাবকরা সচেতন না হলে শিক্ষকরা নিরুপায়। কীভাবে বন্ধ হবে শৈশব চুরি? এই প্রশ্ন তুলছেন বহু মানুষ। শিশু সুরক্ষা দপ্তরের এক আধিকারিক বলেন, দোকান, ইটভাটাগুলিতে শিশুশ্রম ঠেকাতে লাগাতার অভিযান চালানো হচ্ছে। সুফলও মিলেছে। আমরা অভিযানে শুরু করছি। - নিজস্ব চিত্র