Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

বাল্যবিবাহ মানে হাজারো দুর্গতি, সচেতনতা প্রচারে বহরমপুরের আদিবাসী কন্যা শঙ্করী

নাম তাঁর শঙ্করী। আদিবাসী নাবালিকা মেয়েদের কাছে তিনি ‘দুর্গতিনাশিনী’। নামের সঙ্গে তাঁর কর্মের বিস্তর মিল!

বাল্যবিবাহ মানে হাজারো দুর্গতি, সচেতনতা প্রচারে বহরমপুরের আদিবাসী কন্যা শঙ্করী
  • ৭ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

অভিষেক পাল, বহরমপুর: নাম তাঁর শঙ্করী। আদিবাসী নাবালিকা মেয়েদের কাছে তিনি ‘দুর্গতিনাশিনী’। নামের সঙ্গে তাঁর কর্মের বিস্তর মিল!

Advertisement

বাল্যবিবাহ মানেই হাজারও দুর্গতি। অল্প বয়সে মা। শরীরে নানা রোগের বাঁসা। এমনকী, অকালে ঝরে যাওয়ার সম্ভাবনাও। তা সত্ত্বেও কম বয়সে বিয়ের প্রবণতা বাড়ছেই। বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় ছোঁয়াচে রোগের মতো ছড়িয়ে পড়েছে বাল্যবিবাহ। আর সেটা বাড়ছে স্রেফ সচেতনতার অভাবেই। হাল ধরেছেন শঙ্করী কিস্কু। নিজেও একজন আদিবাসী কন্যা।  নিজের সমাজের নাবালিকাদের বিয়ে রুখতে শঙ্করী এখন সত্যিকারের ‘দুর্গতিনাশিনী’। আদিবাসীদের লৌকিক দুর্গা উৎসবের মধ্যেই নজির তৈরি করেছেন তিনি। তাঁর কাজের ভূয়সী প্রশংসা এখন সর্বত্র।   
একটি মেয়ে পরিপূর্ণ নারী হয়ে ওঠার আগে বিয়ে করলে কি কি সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে, তার আর্থিক, সামাজিক ও শারীরিক কি কি সমস্যা হতে পারে, তা নিয়ে প্রশাসনের প্রচার চলে জোরকদমে। কিন্তু, সেই প্রচার আদিবাসী সমাজের মনে খুব বেশি দাগ কাটতে পারে না। শঙ্করী সেই দাগ কাটাতেই বদ্ধপরিকর। আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রামে মাইক হাতে ঘুরে বেড়ান তিনি। সাঁওতালি ভাষায় প্রচার করেন বাল্য বিবাহের কুপ্রভাব সম্পর্কে। সঙ্গে বার্তাও দেন সচেতন হওয়ার। গ্রাম ছাড়িয়ে শঙ্করীর প্রচার ক্ষেত্র কখনও কখনও হয়ে ওঠে বিভিন্ন স্কুল প্রাঙ্গন কিংবা মাঠ-ময়দান। এবার পুজোয় সবাই যখন আনন্দ-উৎসবে মাতোয়ারা তখন শঙ্করী মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে বেড়িয়েছেন মাইক হাতে। 
বহরমপুরের হাতিনগরের চাদপুকুর গ্রামে বাড়ি শঙ্করীর। সেখানে কচিকাঁচাদের পাঠদানও করেন সে। রাস্তার ধারে ছোট্ট টালির ঘর। পাশে পাকা সরকারি ঘর হচ্ছে। বাবা-মা দুজনেই দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালান। শঙ্করী বহরমপুরে আইটিআই কলেজে পড়ছে। নিজের পায়ে প্রতিষ্ঠিত হতে চায় সে। তবে, শুধুমাত্র নিজের প্রতিষ্ঠার মধ্যে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য খোঁজে না এই আদিবাসী কন্যা। বরং তার জীবনদর্শন একটু অন্যরকম। শঙ্করী চায়, আশপাশের সবাই ভালো থাকলে তবেই নিজের সুখ ভোগ সম্ভব। সেই কারণেই আদিবাসী সমাজে বাল্যবিবাহ রুখতে মরণপণ করেছেন শঙ্করী। তিনি এখন আদিবাসী সমাজের অন্যতম মুখ। তাঁকে কুর্নিশ জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। শঙ্করীদের মতো মেয়েদের সামনে এনে বাল্যবিবাহ রোখার অভিযানে গতি বাড়ানো হয়েছে। ফলে, গত ছ’মাসে মুর্শিদাবাদ জেলার বাল্যবিবাহের হার বেশ কিছুটা নেমে এসেছে। সম্প্রতি প্রশাসনের তরফে একটি অনুষ্ঠান করে শঙ্করীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়েছে।  
শঙ্করী বলছিলেন, ‘প্রশাসনের বিভিন্ন মিটিংয়ে অংশ নিয়ে বুঝেছি বাল্যবিবাহ রুখতে সচেতনতা ভীষণভাবে দরকার। বিশেষ করে সাঁওতালরা নিজেদের ভাষায় বললে বেশি বুঝতে পারেন। ওদেরকে বোঝানোর জন্য আমি সাঁওতাল ভাষায় প্রচার করি। তবে, কাজটা খুব সহজ ছিল না। বাড়িতে মা-বাবা ও দুই ভাই। বাবা-মা মাঠে চাষ বাস করে। সামান্য রোজগার। তারপরও সাহস নিয়ে এগিয়ে আসতে পেরেছি। বাবা মা সবসময় সাপোর্ট করেছে।’ স্থানীয় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্ণধার জয়ন্ত চৌধুরী বলছিলেন, ‘আমরা গোটা জেলাজুড়ে  লার্নিং সেন্টার চালু করি। কমিউনিটি লেভেলে গ্রুপ তৈরি করি। সেখানে এই মেয়েটি ছিল। তখন নবম শ্রেণিতে পড়ত। সেই থেকেই ও দারুণ কাজ করছে। ওর জন্য আমাদের গর্ব হয়।’ 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ