পিনাকী ধোলে, সিউড়ি: নুন আনতে পান্তা ফুরানোর সংসার। বাবা প্রতিবন্ধী, শরীর চলে না ঠিকমতো। তাও পেটের তাগিদে ইটভাটায় কয়লা ভাঙেন। প্রয়োজন পড়লে মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে কোনোরকমে দু’মুঠো অন্নের সংস্থান করেন। দুবরাজপুর ব্লকের লক্ষ্মীনারায়ণপুর পঞ্চায়েতের বৈদ্যনাথপুর গ্রামের এই অভাবী সংসারেই বাস সমাপ্তি মণ্ডলের। বয়স মাত্র ১৭। অভাবের তাড়নায় কয়েক মাস আগেই সমাপ্তির শৈশব বিসর্জন দেওয়ার ছক কষেছিলেন পরিজনরা। কিন্তু, বিয়ের মালা গলায় পরার আগেই গর্জে উঠেছিল কিশোরী। সরাসরি বিডিওকে ফোন করে নিজের বিয়ে রুখে দিয়েছিল সমাপ্তি নিজেই। জেলা প্রশাসনের হাত ধরে অভাবের অন্ধকার সরিয়ে সে আজ আলোর পথে পা বাড়িয়েছে। তার সঙ্গী খোদ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী।
গত নভেম্বর মাসে সমাপ্তির কানে এসেছিল তার বিয়ের খবর। যে বয়সে কাঁধে বইয়ের ব্যাগ থাকার কথা, সেই বয়সেই তাকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছিল সাংসারিক যূপকাষ্ঠে। বাল্যবিবাহের অভিশাপ যে একটি মেয়ের শিক্ষা ও ভবিষ্যতের চিরস্থায়ী মৃত্যু, তা বুঝতে ভুল করেনি একাদশ শ্রেণির এই ছাত্রী। রাজনগর মুক্তিপুর আশুতোষ বিদ্যাপীঠের এই অদম্য ছাত্রী বিষয়টি জানায় স্কুলেরই শিক্ষককে। শিক্ষকের থেকে নম্বর নিয়ে সরাসরি বিডিও-কে ফোন করে নিজের বিয়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। সমাপ্তির সেই একটা ফোন শুধু তার বিয়েই ভাঙেনি। তাকে স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
পরেরদিনই দুবরাজপুর ব্লক প্রশাসনের তৎপরতায় সমাপ্তির বিয়ে বন্ধ হয়। প্রশাসনের আধিকারিকরা তার বাবা-মাকে বোঝান যে, কম বয়সে বিয়ে দিলে কী কী সমস্যা হতে পারে। সমাপ্তির এই অসামান্য সাহসিকতার খবর পৌঁছায় জেলাশাসক ধবল জৈনের কানে। তিনি নিজেই এই লড়াকু মানসিকতাকে কুর্নিশ জানাতে পৌঁছে গিয়েছিলেন সমাপ্তির বাড়িতে। সেই কিশোরীর চোখে তখন আগামীর স্বপ্ন। সে জেলাশাসককে জানায়, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়। সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়ে সমাজের জন্য কাজ করতে চায়। পাশাপাশি জানায়, তার কম্পিউটার শেখার তীব্র শখের কথা। জেলাশাসক পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তার শখ পূরণের।
জেলাশাসকের মাধ্যমেই সমাপ্তির এই লড়াইয়ের কথা পৌঁছে যায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কানেও। সমাপ্তির কম্পিউটার শেখার শখের কথা জানতে পেরে মুখ্যমন্ত্রী নিজেই তার ব্যবস্থা করে দেন। সোমবার প্রশাসনের কর্তারা সমাপ্তির হাতে তুলে দেন সেই কম্পিউটার। নিজের পড়ার ঘরে কম্পিউটার পেয়ে খুশিতে ডগমগ সমাপ্তি আজ বড় হওয়ার সংকল্পে আরও দৃঢ়। জেলাশাসক বলেন, সমাপ্তি কেবল বীরভূমের নয়, গোটা রাজ্যের মেয়েদের জন্য উদাহরণ। আমরা ওর পাশে আছি।
সমাপ্তির বাবা ধরম মণ্ডল, মা মাজবা মণ্ডল অবশ্য আজ বুঝতে পেরেছেন, মেয়েকে পরের ঘরে পাঠিয়ে দায়মুক্ত হওয়ার চেয়ে তাকে শিক্ষিত করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করাই আসল কাজ। সমাপ্তি নিজেও চায় তার জীবনের সাফল্যের মধ্য দিয়ে বাবা-মাকে এটা বুঝিয়ে দিতে যে, সেদিন বিয়ের পিঁড়ি ছেড়ে প্রতিবাদ করে সে কোনও ভুল করেনি। -নিজস্ব চিত্র