‘আপনারা চন্দ্রতাল গিয়েছিলেন? তাও নিজে ড্রাইভ করে! একেবারে বেঙ্গল থেকেই গাড়ি চালিয়ে এই সুদূর ও দুর্গম পথে এসেছেন?’ স্পিতি থেকে নামার সময় রাস্তায় গাড়ির ওয়ার্ক শপ-এর মেকানিকটির চোখে মুখে অপার বিস্ময়। ততক্ষণে আমরা ফেরার পথ ধরেছি। টানা পাহাড়ি পথের ধকল সইতে সইতে আমাদের গাড়িটিও সামান্য ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল তাই তারই চেকআপের জন্য হিমাচলের প্রান্তে এসে মুহূর্তের বিরতি নিয়েছিলাম।
চন্দ্রতাল। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মোটামুটি ১৪,১০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই প্রাকৃতিক হ্রদটিতে পৌঁছনোর জন্য মাত্র কয়েক বছর আগে পর্যন্তও শেষ খানিকটা পথ পায়ে হেঁটে যেতে হত। এখন এ পথে পুরোটাই গাড়ি যাচ্ছে বটে, তবে রাস্তা খুবই খারাপ। কিন্তু যে কোনও দুর্গম পাহাড়ি পথে যাঁরা গিয়েছেন তাঁরা জানেন এ পথের এক অদ্ভুত নেশা রয়েছে। এ পথে ফিরে ফিরে আসতে চায় মন। তখন মনে হয়, ‘জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য/ চিত্ত ভাবনাহীন।’
এবছর দুর্গা সপ্তমীতে ভোরের আলো ফোটা মাত্র মানালির হোটেল থেকে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য অটল টানেল পেরিয়ে চন্দ্রতাল। এই হ্রদ সম্পর্কে নানা সময় বিভিন্ন ভ্রমণ বর্ণনা পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। শুনেছিলাম নির্মেঘ আকাশের ছায়া হ্রদের জলে পড়লে নাকি রূপকথার সৃষ্টি হয়। চাঁদনি রাতে এখানে পরীর দেখা পাওয়া যায়। যা দেখলাম তা সব বর্ণনাকে ছাপিয়ে গেল। প্রথম দর্শনেই মুগ্ধ হলাম।
পাকা রাস্তা পেরিয়ে যখনই গাড়ি পাথুরে রাস্তায় পড়ল তখন থেকেই চারপাশের প্রকৃতি সম্পূর্ণ বদলে গেল। সরু ফিতের মতো রাস্তাটা খাড়া উঠে গিয়েছে রুক্ষ পাহাড়ের গা বেয়ে। উঁচুনিচু রাস্তায় টালমাটাল চাকায় চলছে গাড়ি। আর প্রকৃতির টানে বিভোর হয়ে রয়েছি আমরা তিনজন আরোহী। আমার স্বামীর হাতে স্টিয়ারিং, তাঁর পাশে আমি পথপ্রদর্শক আর পিছনের সিটে আমাদের কন্যা, সফরের ফুড ম্যানেজার।
পাহাড়ের রং ক্ষণিকে বদল হচ্ছে। এই দেখলাম বাদামি পাহাড়ের গায়ে রোদের ঝিলিক খেলছে। নিমেষে তা বদলে গিয়ে জাম রঙের হয়ে উঠল। খানিক দূর এগিয়ে দেখি জাম পাহাড়ের গায়ে হলুদের রাশি। ওগুলো বুনো ফার্ন গাছ। শীতের শুরুতেই গাছের পাতা হলুদ রঙে রঙিন। গোটা পথে কখনও শ্যাওলা সবুজ, কখনও খয়েরি, কখনও ধূসর আবার
কখনও বা মেটে রং ধরছে পাহাড়ে।
রুক্ষ পাহাড়ের গা বেয়ে নেমেছে অজস্র ঝর্ণা। রাস্তায় উপর দিয়ে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে স্পিতি নদীতে মিশেছে তারা। তৈরি হচ্ছে খরস্রোতা নদী। আঞ্চলিক ভাষায় যার নাম নালা। গোটা পথে এমন নালার সংখ্যা মোটামুটি চল্লিশের কাছাকাছি। কারও স্রোত বেশি, কেউ বা চলেছে তিরতির ছন্দে। গাড়ির চাকার স্পর্শে ঝংকার উঠছে তাদের গায়ে।
চন্দ্রতালের পথে চেকপোস্ট কোকসার। এ পথে ওটাই শেষ গ্রাম। তারপর আর বিশেষ জনপদ নেই। একে একে পেরিয়ে গেলাম ছত্রু, বাতাল। বাতাল থেকে চন্দ্রতাল ১৬ কিলোমিটার পথ। রাস্তা খুবই খারাপ। এইটুকু পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে ঘণ্টা দেড়েক। পথেই স্পিতি নদী পেরিয়ে চন্দ্রা নদীর দেখা মিলল। আমরা উঠে চলেছি চন্দ্রা নদীর অববাহিকা ধরে, তারই উৎস সন্ধানে। সেখানেই চন্দ্রতাল। একসময় হ্রদের গেট চোখে পড়ল। আর মাত্র দেড় থেকে দু’কিলোমিটার পথ বাকি। তারপরেই পার্কিং। সেখান থেকে আড়াই কিলোমিটার হাঁটলেই সব কল্পনার অবসান ঘটিয়ে চোখের সামনে ধরা দেবে চন্দ্রতাল। পৃথিবীর বুকে এই নাকি এক টুকরো স্বর্গ! সেই স্বর্গের কাছাকাছি আমরা। উত্তেজনায় গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। কিন্তু তার আগেই ভয়ঙ্কর একটি নালা পার হতে হবে। লোকমুখে তা পাগলা নালা হিসেবে পরিচিত। তোড়ে বয়ে যাচ্ছে জল, সেই জল পেরিয়ে যেতে হবে ওপারে। মাঝে চাকা ফেঁসে গেলেই বিপদ। সামনের চোদ্দো সিটের টেম্পো ট্রাভেলারটা মাঝপথে আটকে গেল। আরোহীরা নেমে পড়ছেন একে একে, পায়ে হেঁটেই পাড়ি দেবেন বাকি পথ। আমাদের গাড়িটা ঠিক তার পিছনে। এবার টেম্পো ট্রাভেলারকে কাটিয়ে পাশ দিয়ে সঙ্কীর্ণ পথে চালাতে হবে গাড়ি। পাগলা নালা পেরতে হবে একটানে। মাঝে ব্রেকে যেন পা না পড়ে, গিয়ার যেন বদল না হয়। বাইক চালক, অন্যান্য গাড়ির ড্রাইভার সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ। পারবে তো ‘বাঙ্গাল’-এর গাড়িটা একটানে পাগলা নালা পেরিয়ে যেতে! সে যেন এক রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনার মুহূর্ত। আমার স্বামীর দৃষ্টি সোজা সামনের দিকে। দুরন্ত মনঃসংযোগ সেই দৃষ্টিতে। পাশে বসে আমি বাকরুদ্ধ, রোমাঞ্চে ছটফট করছে আমাদের অষ্টাদশী কন্যা। একটু দম নিয়ে এগিয়ে গেল আমাদের এক্স ইউ ভি ৭০০, একবারেই পেরিয়ে গেলাম পাগলা নালা। অন্য ড্রাইভারদের হাততালি আর ব্রাভো, শাবাশ ইত্যাদিতে চাপা পড়ল নালার জলের প্রবল গর্জন। এগিয়ে চললাম আমরা। গাড়ি থামবে পার্কিংয়ে গিয়ে।
হ্রদের সামনে পৌঁছতে দুপুর হল। নীল আকাশে রোদের ঝিলিমিলি, আর সাদা মেঘের ভেসে চলা। আলো-ছায়া খেলছে হ্রদের জলে। সেই আলোয় ক্রমশ বদলে যাচ্ছে জলের রং। ঘন নীল থেকে পান্না সবুজ সবই আলো ছায়ার কারসাজি। হ্রদের সেই রূপ থেকে চোখ ফেরানো দায়। উচ্চতা, রুক্ষ মরু প্রকৃতি, বাতাসে অক্সিজেনের অভাব কিছুই আর গায়ে লাগছে না। যত দেখছি ততই অসম্ভব মুগ্ধতায় ভরে যাচ্ছে মন। হ্রদ ঘিরে রেখেছে উঁচু পাহাড়শৃঙ্গ। জলের অতন্দ্র প্রহরী। ঋতুবদলের বার্তা নিয়ে দূর পাহাড়ের শিখরগুলো বরফের মুকুট পরতে শুরু করেছে ইতিমধ্যেই। আর হয়তো কয়েকদিনের মধ্যেই এপথও ঢেকে যাবে সাদা বরফের চাদরে। কিন্তু তার আগে আলো-ছায়ার হাতছানি, হ্রদের জলের রং বদল আর তার গায়ে রোদের ঝিলিক প্রাণ ছুঁয়ে গেল। চন্দ্রতালের মাথায় উড়ছে রং-বেরঙের প্রার্থনা পতাকা। পৃথিবীর বুকে এই একটুকরো স্বর্গের পায়ে নিজেদের সুপ্ত সাধ ব্যক্ত করেছে মানুষ।
হ্রদের পাড়ে বসি খানিকক্ষণ। ব্যাকুল মন গুনগুন করে ওঠে, ‘কোন সাগরের পাড় হতে আনে কোন সুদূরের ধন/ভেসে যেতে চায় মন,/ফেলে যেতে চায় এই কিনারায় সব চাওয়া সব পাওয়া।’
কমলিনী চক্রবর্তী