প্রদীপ্ত দত্ত, ঝাড়গ্রাম: বিনপুর-১ ব্লকের ছোট্ট গ্ৰাম পলাশী। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট গোটা দেশের সঙ্গে এখানেও পালিত হয়েছিল স্বাধীনতা দিবস। ‘কংসাবতী নদীর বালির চর ধরে গ্ৰামের আট থেকে আশি তেরঙ্গা পতাকা নিয়ে হেঁটে গিয়েছিল। সে এক চোখ জুড়ানো দৃশ্য। যা দেখে মনে একরাশ শান্তি পেয়েছিলাম।’—সেদিনের স্মৃতিচারণে গড় গড় করে এই কয়েকটা কথা বলে শ্বাস নিলেন শতবর্ষে পা রাখা চন্দ্রশেখর আচার্য। তারপর দেশে জরুরি অবস্থা, বাংলার বাম শাসনে জঙ্গলমহলে সিপিএমের হার্মাদ বাহিনীর অত্যাচার। মাওবাদীদের গণ আদালত বসানো। রক্তঝরা, ক্ষতবিক্ষিত দিন। শতায়ু বৃদ্ধের স্মৃতির মণিকোঠায় আজও সব টাটকা। পাশে বসলে মনে হবে যেন চলমান ‘ইতিহাস’। শরীর ঠিকঠাক থাকলে ছাব্বিশেও তিনি কেন্দ্রে গিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করবেন।
তবে, ক’দিন হল বৃদ্ধ চন্দ্রশেখরের মনটা ভালো নেই। লোকমুখে শুনেছেন, দেশের নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধনের কাজ শুরু করেছে। যাকে বলা হচ্ছে এসআইআর। বৃদ্ধ এসব শুনে বেশ বিচলিত। তিনি বলেছিলেন, ‘অনেক তাজা রক্তের বিনিময়ে আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছে। কোনও প্রকৃত ভারতবাসীর নাম যেন তালিকা থেকে বাদ না পড়ে।’
ঝাড়গ্রাম শহরের ২ নম্বর ওয়ার্ডে বাড়ি চন্দ্রশেখর আচার্যের। ১৯৪৭ সালে তিনি ছিলেন বাইশ বছরের তরতাজা যুবক। শৈশব থেকেই দেখেছেন ব্রিটিশদের শোষণ, অত্যাচার, নির্যাতন। একের পর এক জঙ্গলের মূল্যবান গাছ লুট। সেই ব্রিটিশদের দেশছাড়া করতে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আত্মত্যাগ। সবই দেখেছেন তিনি। আবার, বিপ্লবীদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতাও করতে দেখেছেন অনেকেই। তারপর যখন স্বাধীনতা এল তখন যুবক চন্দ্রশেখরও যেন মুক্ত বিহঙ্গ। তাঁর মতো অনেকেই মুক্তির আস্বাদে বিহ্বল। সেদিনের স্মৃতি খুঁড়তে গিয়ে আজকের বৃদ্ধ চন্দ্রশেখর বলছিলেন, ‘ঝাড়গ্রাম শহর ঘন জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি এলাকায় কিছু জনবসতি ছিল। যানবাহন বলতে ছিল গোরুর গাড়ি। যুবকদের মধ্যে খদ্দেরের ধুতি, পাঞ্জাবি, গান্ধী টুপি পরা বেশ জনপ্রিয় ছিল। সবার মধ্যেই ছিল একটা ভদ্রভাব। বড়দের সম্মান করা। এখনকার যুব সমাজকে দেখলে মনটা কেমন করে!’
দেশনায়ক সুভাষচন্দ্র বসু একবার ঝাড়গ্রামে এসেছিলেন। সময়টা ১৯৪০ সালের ১২ মে। ঝাড়গ্রাম শহরের লালগড় মাঠে জনসভায় অংশ নিয়েছিলেন তিনি। ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন এই সভা থেকে। তাঁর কথা শুনেই শহরের বাসিন্দাদের আলোড়ন পড়ে গিয়েছিল। বৃদ্ধ বলছিলেন, ‘সুভাষচন্দ্র তৎকালীন যুব সমাজের শিরা-উপশিরায় মুক্তির রক্তস্রোত বইয়ে দিয়েছিলেন। তারপর দেশ স্বাধীন হল। অনেক স্বপ্ন নিয়ে জেলার তরুণ প্রজন্ম দেশ গড়ার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল।’
স্মৃতিতে টোকা মেরে বলে চলেছেন বৃদ্ধ চন্দ্রশেখর। ‘এমার্জেন্সি পিরিয়ডের পর থেকেই স্বাধীনতা অর্জনের ভাবাবেগে ভাঁটা পড়তে থাকে। হাল আমলে নিজের চোখের সামনে দেখলাম রাজনীতির অধঃপতন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন লোধাশুলির জঙ্গলে ব্রিটিশদের সেনা নিবাস ছিল। এখনও সেই ছবি স্পষ্ট মনে পড়ে।’ একটু থেমেই ফের শুরু করলেন তিনি। বলছিলেন ‘১৯৭১ সালে বেতকুন্ডীর ময়দানে জনসভা করতে এসেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। দূর থেকে তাঁকে দেখেছিলাম। জরুরি অবস্থার পর থেকে ভারতে রাজনীতির ধারা বদলে যেতে শুরু করে। বাম শাসনের সময় লালগড়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্য খুনোখুনি দেখলাম। যা মেনে নিতে পারিনি।’
শতায়ুর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বড় ছেলে ষাটোর্ধ্ব প্রদীপ আচার্য। তিনি বলছিলেন, ‘দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের গল্প বাবা এখনও করেন। বঙ্কিম , শরৎচন্দ্রের লেখা পড়েন। রেডিও শোনেন। স্মৃতিশক্তি একটু কমে গিয়েছে। দেশের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এখনও অটুট। ঝাড়গ্রাম জেলা তৃণমূলের সভাপতি দুলাল মুর্মুর কথায়, ‘চন্দ্রশেখরবাবুর কাছে আমাদের অনেক শেখার রয়েছে।’ নিজস্ব চিত্র