Bartaman Logo
৩ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

খড়ির গণ্ডি

খড়ির গণ্ডি
  • ৬ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০

পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়

Advertisement

স্যান্ডউইচ বানিয়েছিলেন। এক পাউন্ড পাউরুটি, সব তো লাগেনি। ক’পিস রেখেছিলেন ফ্রিজের ওপরে। সকালবেলা স্কুলে যাবার মুখে ইমন তা লক্ষ করেছে। বিকেলে স্কুল থেকে ফেরার পর জল খেতে রান্নাঘরে ঢুকতে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যায় তার। হাজার হাজার পিঁপড়ে। নিরীহ কালো পিঁপড়ে নয়, লালরঙা ছোট ছোট পিঁপড়ে। যতই ছোট হোক না কেন, কামড়ালে আর দেখতে হবে না। কী জ্বলুনি! কামড়ালেই খুব জ্বালা করবে, ফুলে যাবে। 
ইমন স্তব্ধ হয়ে দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়ায়। দাঁড়ানোর আগে ভালো করে দেখে নেয়, বেপথ হওয়া কোনও পিঁপড়ে, লাইন থেকে বেরিয়ে তার পায়ের কাছে চলে এসেছে কি না, চলে এলে তো আর রক্ষে নেই। পিঁপড়ের কামড় খেয়ে যদি ‘মা মা’ করে আর্তনাদ করে ওঠে বা তিড়িংবিড়িং লাফায়, তাহলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। 
ক’দিন বেজায় রকম গরম পড়েছে। খালি মনে হচ্ছে জল খাই। পাড়ার মোড়ে কেক-পেস্ট্রির দোকান। সেখানে আইসক্রিমও পাওয়া যায়। ইমনের মনে হচ্ছিল, বাসকাকুকে বলে ওখানেই নেমে পড়বে, আইসক্রিম কিনবে। এমন ভাবনা মাথায় এলেও বাস থামাতে বলতে পারেনি। বাসকাকু যে বাস থামাবে না, বকা দেবে, এসব ইমনের অজানা নয়।
বাড়িতে ঢোকার পর ইমনের জল-তৃষ্ণা তীব্র হয়েছে। বইয়ের বোঝা নামিয়ে, দ্রুত পায়ে পড়িমরি রান্নাঘরের দিকে ছুট দিয়েছে। ঠিক করে নিয়েছে, যতই টনসিল থাকুক, ফ্রিজের ঠান্ডা জলই খাবে। রান্নাঘরে ঢুকতে গিয়ে পিঁপড়ে-মিছিল দেখে ইমন থমকে দাঁড়ায়। মেঝের দিকে তাকাতেই পিঁপড়ে-মিছিল, ফ্রিজের ওপরে রাখা পাউরুটির প্যাকেটটায় পিঁপড়ে ছেয়ে গিয়েছে, থিকথিকে লাল।
মেঝের দিকে তাকিয়ে অবাক-বিস্ময়ে ইমন দেখতে থাকে, এই প্রথম যে পিঁপড়ে-মিছিল দেখছে, তা নয়। আগেও অনেক অনেকবার দেখেছে। পিঁপড়ের হাত থেকে এটা-সেটা বাঁচানোর জন্য মা কী কাণ্ডই না করেন! নিত্যনতুন বুদ্ধি বের করেন। ছোট ফ্রিজ, তাতে তো আর সবকিছু রাখা যায় না। বড়জোর মিষ্টির প্যাকেটটা ফ্রিজে রাখলেন। চিনির শিশি কি ফ্রিজে রাখা যায়! শুধু চিনিতে নয়, বিস্কুটে, চানাচুরে, এমনকী ডাইনিং টেবিলে রাখা আম-কলাতেও পিঁপড়ে ধরে। সেদিন দেখে তো ইমন রীতিমতো অবাক হয়েছিল, পোস্তোর কৌটোতেও লাল পিঁপড়ে গিজগিজ করছে। চিনির শিশিতে পিঁপড়ে ধরলে যতই তাড়ানো হোক না কেন, দু-চারটে রয়ে যায়। চায়ের কাপেও ভাসতে থাকে। চায়ের কাপে পিঁপড়ে পেলে বাবার মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে যায়। বাবা যতই রাগুন না কেন, মায়ের মুখে সারাক্ষণই হাসি খেলে যায়। মাকে হাসতে দেখলে বাবার রাগ আরও বেড়ে যায়। 
এমন কত কিছুই ইমনের মনে পড়ে যায়। ছবির পর ছবি। চোখের সামনে সেসব ভাসতে থাকে। হঠাৎই ইমন একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল। আবার চোখ যায় মেঝের দিকে। মনে হয়, পিঁপড়েদের এই লাইন করে যাওয়ার মধ্যে কেমন একটা ডিসিপ্লিন আছে। স্কুলে লাইন দিয়ে প্রেয়ারে যাওয়ার সময়, ফেরার সময়, ছুটির সময় হামেশাই তারা ডিসিপ্লিন ব্রেক করে। স্যার বা ম্যাডামের চোখে ধুলো দিয়ে আগে যাওয়ার চেষ্টা করে, বন্ধুর সঙ্গে ফিসফিসিয়ে কথা বলে। লাইন প্রায়শই সোজা থাকে না। এঁকেবেঁকে ‘আমাদের ছোটনদী’ হয়ে যায়।
    লাইনে কত কিছুই তো করা বারণ। করলে বকাঝকা বরাদ্দ। তবু করে। বকা খায়। কখনও মৃদু মারও। বিশেষ করে দীপঙ্করবাবু, সারাক্ষণই তাঁর হাতে লিকলিকে এক বেত। রোগাভোগা ওই বেতে নাকি সর্ষের তেলও মাখান, নিজেই সেসব বলেছেন। সজোরে না হোক, হালকা চালে ওই বেতের সপাংসপাং ইমনের পিঠেও পড়েছে। 
     সারিবদ্ধ, সুশৃঙ্খল পিঁপড়েদের হেঁটে যাওয়া দেখতে দেখতে ইমনের এসব মনে হয়। নিজেকে নিজেই তিরস্কার করে। মনে হয়, হোক না পুঁচকে এতটুকুন, পিঁপড়েদের কাছেও আমাদের শেখার আছে। এই তো দিন কয়েক আগে, ঘুম থেকে উঠে ইমন সবে দাঁত ব্রাশ করছিল। পায়ে পায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল ব্যালকনিতে, রোজই এ সময় দাঁড়ায়। হাইরাইজের দশতলা থেকে যতদূর চোখ যায়, শুধুই বড় বড় ফ্ল্যাটবাড়ি। বাবা বলেন, কংক্রিটের জঙ্গল। সেই জঙ্গলের ফাঁকফোকরে একটুআধটু সবুজ। দু-চারটে গাছপালা। ব্যালকনির ঠিক নিচেই সুইমিং পুল। এই সাতসকালেই দু-চারজন লাফায়,ঝাঁপায়। সুইমিং পুলের ধারে মস্ত এক জামগাছ। গাছে পাখির মেলা। সকাল-বিকেল জলসা বসে যেন। পাখিদের বিচিত্র ডাকাডাকি শুনবে বলে প্রতিদিনই ইমন দাঁত মাজতে মাজতে ব্যালকনিতে এসে দু’দণ্ড দাঁড়ায়। সকালের ফুরফুরে হাওয়ায় বেশ লাগে। হঠাৎই সেদিন নজরে পড়েছিল, লাল পিঁপড়ে নয়, ডেঁয়োপিঁপড়েও নয়, গুঁড়ি গুঁড়ি কালো পিঁপড়ের মহামিছিল। অনেকগুলো পিঁপড়ে মিলে একটা মরা ডেঁয়োপিঁপড়েকে নিয়ে কোথাও চলেছে। 
     কোথায় চলেছে, কেন চলেছে কিছুই জানে না ইমন। গুঁড়ি গুঁড়ি পিঁপড়ে সংখ্যায় কতজনই না মিলে বড়সড় পিঁপড়েটাকে   নিয়ে যাচ্ছে। সকলেই একেবারে ছোট, মস্ত এক পিঁপড়েকে নিয়ে যেতে কষ্ট হলেও হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয় তারা। পেছনে লম্বা সারি, তারাও দলছুট না হয়ে এগিয়ে চলেছে। 
     আজ ডেঁয়োপিঁপড়ের জন্য জমায়েত হয়নি। লক্ষ ওই পাউরুটি, হয়তো খিদে পেয়েছে, তাই পাউরুটির প্যাকেটে ভিড় করেছে। লাইন দিয়ে যারা আসছে, তারাও ওই পাউরুটির প্যাকেটে পৌঁছতে চাইছে। পৌঁছনোর জন্য কোনও তাড়াহুড়ো নেই। বাড়তি ব্যস্ততা নেই। একজনকে পাশ কাটিয়ে, আরেকজনকে ঠেলে, গুঁতিয়ে, তেমন হলে ধরাশায়ী করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা নেই। নিশ্চিত খিদে পেয়েছে, খাবারের সন্ধানেই চলেছে, অথচ কী ডিসিপ্লিন্ড! ইমনের মনে হয়, ওদের থেকে এসবও আমাদের শেখার আছে।
     রান্নাঘরে ঢোকার আগে ডাইনিংয়ে খাওয়ার টেবিল ঘেঁষে যে চেয়ার চারটে রয়েছে, তার একটাতে ইমন ততক্ষণে বসে পড়েছে। বসে বসেই দেখছিল। দেখতে দেখতে ভাবছিল। পিঁপড়েদের মতিগতি তার অজানা নয়, আজ অবশ্য খুঁটিয়ে দেখতে, নিজের মতো করে ভাবতে ভালো লাগছে। ভাবনার সাগরেই সে ডুব দিয়েছে। মা কখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, খেয়ালই করেনি ইমন। মা’র হাতে জলের বোতল। ভেতরের ঘরে খানকয়েক জলের বোতল সবসময়ই রাখা থাকে। একটা বোতল ওখান থেকেই নিয়ে এসেছেন।
      বোতলের দিকে চোখ পড়তেই ইমন প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে ঢকঢক করে খানিক জল খেয়ে নেয়। লম্বা এক ঢেকুর তুলে মা’র মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারে, কিছু একটা ঘটেছে, মাকে বেশ খুশি-খুশি দেখাচ্ছে। কীসের খুশি, জানা গেল। ব্যান্ডেল থেকে মামা আজ আসবেন। ইমন স্কুলে চলে যাওয়ার পর ফোন এসেছিল। ঘনঘন না হলেও মাঝে মধ্যেই তিনি এটা-সেটা নিয়ে আসেন। 
      ব্যান্ডেল স্টেশনে নেমে দেবানন্দপুরে যাওয়ার রাস্তায় ইমনের মামার বাড়ি। বেশ খোলামেলা। পাখপাখালি, গাছগাছালি। বাড়ির লাগোয়া বাগান। বাগানে একটি নয়, তিন-তিনটি আমগাছ। প্রতিবারই মামা গাছপাকা হিমসাগর নিয়ে আসেন। আজ সেই দিন, একটু পরেই মামা আসবেন, খুশিতে ইমনের মন ভরে ওঠে। 
    চোখের সামনে ব্যান্ডেলের মামার বাড়ি, ফলে ফলে ভরে ওঠা আমগাছ, দাদুন-দিদান — এমন কত কিছুই ইমনের মনে পড়ে যায়। একবার গরমের ছুটিতে মা’র সঙ্গে সেও ব্যান্ডেলে ছিল। একদিন সকালে হুলুস্থুল কাণ্ড। কোথা থেকে তিন-তিনটে হনুমান এসে হাজির। দুটি বেশ বড়োসড়ো। তৃতীয়টি খুবই ছোট। ছোট্ট, এতটুকুন। সবে লাফঝাঁপ দিতে শিখেছে। পুঁচকেটাকে দেখে মায়ের সে কী উচ্ছ্বাস! ‘সো কিউট’ বলে যেভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন, তা এখনও ইমনের মনে আছে। দিদান ঝুলঝাড়ন নিয়ে হইহই করতে করতে তেড়ে গিয়েছিলেন। হনুমান তাড়ানোর সে চেষ্টা অবশ্য রুখে দিয়েছিলেন দাদুন। বলেছিলেন, খাক না, ক-টা আর খাবে!
      ইমন তখন মনে মনে মামার বাড়িতেই পৌঁছে গিয়েছিল। ঘোর কাটল মায়ের কথায়। রাশি রাশি পিঁপড়ে নজর এড়িয়ে যায়নি। বেশ উত্তেজিত তিনি। এক ঝটকায় পিঁপড়েতে ভরে ওঠা পাউরুটির প্যাকেটটা সরাতে চেষ্টা করলেন। প্যাকেটটা গিয়ে পড়ল মেঝেতে। চারদিকে হাজার হাজার পিঁপড়ে। এত পিঁপড়ে তো বাইরে থেকেই এসেছে, ফ্ল্যাটে তো আর থাকা সম্ভব নয়। হঠাৎ-হঠাৎ করে চলে আসে। কোথা থেকে খবর পায়, কীভাবে এই দশতলায় উঠে আসে, ইমন ছড়িয়ে পড়া পিঁপড়েগুলোর দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্তের জন্য হলেও ভাবে। এ ভাবনার কোনও উত্তর নেই। নির্ঘাত মোবাইলে খবর পায়। ইচ্ছে করেই ইমন এমন ভেবে নেয়, সশব্দে হেসে ওঠে। 
      ততক্ষণে পিঁপড়েদের সেই সারিবদ্ধ লাইন ভেঙে গেছে। এদিক-ওদিক এলোমেলোভাবে পালানোর চেষ্টা করছে। মা কোথা থেকে ব্ল্যাকবোর্ডে লেখার চকের মতো দেখতে, অথচ বেশ বড়সড়, কী যেন এক নিয়ে আসেন। ও-ঘর থেকে আনতে আনতে বলতে থাকেন, এবার জব্দ হবে। মোছার সময় বিমলা ফিনাইলটিনাইল দেয় বটে, ওসবে এখন আর কিচ্ছু কাজ হয় না। চকের ছোঁয়া পেলেই ছটফটিয়ে মরবে।
       কিছু বোঝার আগেই মা খড়ির খণ্ডি টানতে মেঝেতে ঝপাং করে বসেও পড়েন। একটুখানি আঁচড় দিয়েছেন সবে, সেই খড়ি-আঁচড়ের ওপর দিয়ে যেতে গিয়ে বেশ কিছু পিঁপড়ে মুহূর্তেই মরে যায়। ব্যাপারটা বুঝতে পেরেই ইমন দিশেহারা হয়ে পড়ে। কী করবে, কী তার করা উচিত, মায়ের হাত থেকে ওই মারণ-চক কেড়ে নেবে কি! 
    ঠিক তখনই কলিং বেল। ডিংডং বেল নয়, পাখির কলতান। যেভাবে দ্রুত উঠে মা দরজা খুলতে গেলেন, কে বলবে, হাঁটুতে এখন তাঁর ব্যথা করে, ডাক্তারকাকু ব্যায়াম করতে বলেছেন।
     দরজা খুলতেই মামা, মুখে হাসি উপচে পড়ছে। মা ভেতরে ঢুকতে বলার আগেই মামা ফ্ল্যাটের ভেতরে ঢুকে পড়েন। হাতের ব্যাগ মাটিতে রেখে পাখার তলায় এসে দাঁড়ান। এরই মধ্যে পাকা আমের গন্ধ গোটা ঘরে ম-ম করছে। ওই ব্যাগটায় যে আম আছে, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না ইমনের।
      মামাকে বসার জন্য চেয়ার এগিয়ে দিয়ে মা বলেন, একটু দাঁড়া, লাইনার দিয়ে পিঁপড়েগুলোকে আগে শেষ করি। দু মিনিট লাগবে। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। কোথায় কী খাবার আছে, ঠিক খুঁজে বের করে ফেলবে।
     মামা এতক্ষণ খেয়াল করেনি। খেয়াল করতেই ব্যাপারটা তাঁর কাছেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যে কথাটা ইমন বলতে চাইছিল, সেটা মামাই বলে দেন। বলেন, এভাবে মেরো না। ওদেরও তো প্রাণ । খিদে আছে। খিদের জন্যই দেয়াল বেয়ে বেয়ে এই দশতলাতেও উঠে এসেছে। ওদের কষ্টটা একটু বোঝো। 
     মামার কথার মা বিরোধিতা করলেন না। মেঝেতে বসতে গিয়েও আর বসলেন না। চকখড়ি মেঝেতেই পড়ে রইল। যেটুকু দাগ কেটেছিলেন, তা যে পা দিয়ে ইমন মুছে ফেলেছে, তাও তাঁর নজর এড়িয়ে গেল না। তবুও তিনি কিছু বললেন না। 
     মামা কী খাবেন, সেটাই এখন জিজ্ঞাস্য। মাটন রাঁধা আছে, লুচি করে দেবেন, নাকি অনলাইনে কিছু আনবেন।
     মামার কানে মায়ের কথা ঢুকেছে কি না ইমন অন্তত বুঝতে পারল না। ইমনের মুখের দিকে তাকিয়ে মামা শুধুই হাসছেন। হাহা-হিহি-হোহো হাসি নয়, কেমন মিষ্টি-স্নিগ্ধ এক হাসি। ইমনও চেষ্টা করল এমনভাবে হাসতে।

সম্পর্কিত সংবাদ