সংবাদদাতা, কাটোয়া: কাটোয়ার বহু স্কুলে এখন পরীক্ষা চলছে। ক্লাস নেওয়ার সুযোগ এই মুহূর্তে নেই। কিন্তু নিত্যদিন যে শিক্ষকের সঙ্গে ক্লাসে পড়ুয়াদের মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তা কি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের এক আঁচড়ে ভুলে যাওয়া যায়! পরীক্ষা শেষে অনেকেই স্কুলের প্রধান শিক্ষককে জিজ্ঞাসা করছে— স্যারেরা আর কি স্কুলে কোনওদিন আসবেন না? পড়ুয়াদের এমন প্রশ্নে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে কাটোয়ার বহু স্কুলের প্রধান শিক্ষককে। রামকৃষ্ণ বিদ্যাপীঠে ৩ জন শিক্ষক ও ৩ জন চতুর্থ শ্রেণির কর্মী চাকরি খুইয়েছেন। স্কুলের প্রধান শিক্ষক সুবীর মণ্ডল বলেন, পড়ুয়ারা জিজ্ঞাসা করছে, স্যারেরা আর কি স্কুলে আসবেন না? কী উত্তর দেব, ভেবে পাচ্ছি না। ওইটুকু কিশোর মনেও প্রভাব পড়ছে। আচমকা আদালতের রায়ে শিক্ষা ব্যবস্থার এমন হাল হবে ভাবতেই পারছি না।
কাটোয়ার পানুহাট রাজমহিষীদেবী স্কুলে ৪ জন শিক্ষক ও একজন করণিকের চাকরি গিয়েছে। তারমধ্যে স্কুলের ইংরেজি শিক্ষক মহম্মদ ইজাজউদ্দিন আহমেদের মা ক্যান্সার আক্রান্ত। ইজাজউদ্দিন জানিয়েছেন, মাকে আমার চাকরি যাওয়ার খবর দিইনি। এখন কী করব! মাকে কী বলব, এখনও ভেবে উঠতে পারিনি। মায়ের চিকিৎসার খরচ কীভাবে জোগাড় হবে, তাও বুঝতে পারছি না। আমরা পুরোপুরি রাজনীতির শিকার হয়ে গেলাম।
কাটোয়ার মেঝিয়ারি স্কুলেও বেশ কয়েকজন শিক্ষকের চাকরি গিয়েছে। ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক বলছেন, ছাত্ররা আমাদের থেকেও বেশি জানে। ওরা টিভি, মোবাইলে দেখছে। তারপর আমাদের নানা প্রশ্ন করছে। কিন্তু সব উত্তর আমাদের জানা নেই। কাটোয়ার বহু স্কুলে এমন অবস্থা হয়েছে যে, চতুর্থ শ্রেণির, করণিকের কাজ স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের করতে হচ্ছে। বহু স্কুলের শিক্ষক সংখ্যা এতটাই কমেছে যে, ক্লাস নেওয়াই যাচ্ছে না। পানুহাট রাজমহিষীদেবী স্কুলে ১৮০০ পড়ুয়া রয়েছে। এখন মাত্র ১৬ জন শিক্ষক রয়েছেন। একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগ কার্যত শূন্য হয়ে গিয়েছে। ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক কমলাকান্ত চক্রবর্তী বলেন, এখন পরীক্ষার্থীদের খাতা মূল্যায়ণ করা বাকি রয়েছে। কীভাবে তা সম্ভব হবে, বুঝতে পারছি না। পূর্বস্থলীর মাজিদা এলাকায় সদ্য চাকরি হারানো এক অশিক্ষক কর্মী এদিন বলেন, আমি সংস্কৃতে এম এ পড়েছি। আগে একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বিএড বিভাগে পড়াতাম। স্কুলে চতুর্থ শ্রেণির চাকরি পেয়ে ভাঙা বাড়িটা সারাব ভেবেছিলাম। আদালতের রায়ে সব শেষ হয়ে গেল। এখন সংসার চালানোই দায় হয়ে যাবে।
বেশ কয়েকজন প্রধান শিক্ষক বলছেন, পড়ুয়াদের সামলাব কীভাবে, সেটা বুঝতে পারছি না। খুবই দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতির শিকার সকলে।