সুখেন্দু পাল, জামালপুর: ‘ভীষণ ভয় করতাছে।’ কিন্তু কিসের ভয়?
সুখেন্দু পাল, জামালপুর: ‘ভীষণ ভয় করতাছে।’ কিন্তু কিসের ভয়?
বুধবারের দুপুর। হেমন্তের রোদ ঝলমলে আকাশ। বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে প্রথমা (নাম পরিবর্তিত) রায়। চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ। পরণে আটপৌরে তাঁতের শাড়ি। বছর খানেক বিয়ে করে জামালপুরের ঝাপানডাঙায় এসেছেন। বাপের বাড়ি বাংলাদেশের রাজশাহীতে। ঘরে স্বামী-শ্বশুর কেউ নেই। যে যাঁর মতো কাজে বেরিয়েছেন। দুপুরে অখণ্ড অবসর কাটে প্রথমার। কখনও ঘুমিয়ে কাটান। আবার কখনও টিভির পর্দায় চোখ রেখে। কিন্তু, গত ক’দিন প্রথমার চোখে ঘুম নেই। সিরিয়াল দেখার ইচ্ছেও নেই। একটু সময় পেলে শুধু বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলে। এদিন দুপুরেও ফোনে কথা বলছিলেন। ওপারে সম্ভবত প্রথমার মা। খাওয়া-দাওয়া হয়েছে কি না জানতে চেয়েই বললেন—‘মা, খুব ভয় করতাছে।’
ঝাপানডাঙা গ্রামে প্রথমা উহাহরণ মাত্র। স্টেশন লাগোয়া এই গ্রামে কমবেশি ২০০টি পরিবারের বাস। অধিকাংশ বাড়ির বধূর পৈত্রিক ভিটে বাংলাদেশে। গ্রামের যুবকদের ভালোবেসে বিয়ে করে এসেছেন। কেউ প্রথমার মতো এক-দেড় বছর আগে বিয়ে করেছেন। কেউ আবার তিন-চারবছর আগে। আবারও অনেকে এমন আছেন, যাঁরা ২০-২৫ বছর আগে বিয়ে করে গ্রামে এসেছিলেন। তাঁদের আধার থেকে ভোটার—সবই রয়েছে। বাংলার আবাস থেকে শুরু করে নানা সরকারি প্রকল্পের সুযোগ সুবিধাও পাচ্ছেন। কিন্তু, সিংহভাগেরই এসআইআরের ভিত্তিবর্ষ ২০০২ সালের তালিকায় নাম নেই। প্রথমারা তো এখনও ভোটারই হননি। ফলে, এইসব নববধূদের মধ্যে এখন সংসার ভাঙার আশঙ্কা। কেননা, ২০০২ সালে তাঁদের রক্তের সম্পর্কের কেউ পূর্ব বর্ধমানে অথবা পশ্চিমবঙ্গের ভোটার ছিলেন না।
তাই, প্রথমাদের ভীষণ ভয় করতাছে। বাড়িতে অপরিচিত কেউ গেলেই আঁতকে উঠে বলছেন—‘আপনারা কি এসআইআর করাইতে আইছেন? বাসায় কেউ নাই।’ আগুন্তুকের পরিচয় জেনে বুকে খানিক হয়তো বল পেলেন প্রথমা। সেই কারণে দাবির সুরে বললেন, ‘শ্বশুরই আমাগো বাবা। তাঁর ভরসাতেই এখানে আছি। ভোটার তালিকায় আমাগো নাম ওঠানো হোক।’ কিন্তু প্রথমার এই দাবিকে কি মান্যতা দেবে ভারতের জাতীয় নির্বাচন কমিশন। প্রশাসনের আধিকারিকরা অবশ্য এ নিয়ে এখনই কোনও মন্তব্য করতে নারাজ।
পূর্ব বর্ধমান জেলার জামালপুর ছাড়াও পূর্বস্থলী, মেমারি এলাকার বহু যুবকের বিয়ে হয়েছে বাংলাদেশের মেয়ের সঙ্গে। সবারই অবস্থা প্রথমার মতোই—‘ভয় করতাছে।’ অথচ, এমন পরিস্থিতি মাসখানেক আগেও ছিল না। ঝাপানডাঙা ঢোকার মুখেই পড়ে বিশাল একটা আমগাছ। তার তলায় দাঁড়িয়ে মাঝবয়সী বধূ বলছিলেন, ‘এমন ঝামেলা হবে জানলে কেউ কি আর বাংলাদেশে বিয়ে করত! আগে সবকিছু কত ভালো ছিল। যখন মন চাইত ওপার বাংলায় বাপের চলে যেতাম। ক’দিন কাটিয়ে চলে আসতাম। ২০ বছর আগে জামালপুরে আত্মীয়ের বাড়িতে এসেছিলাম। আমার যিনি স্বামী তাঁর সঙ্গে আলাপ সেখানেই। দু’জনে প্রেম করে বিয়ে করি। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ থেকে আত্মীয়-স্বজনরা এসেছিলেন। কোনও অসুবিধা হয়নি। এখন বলছে কাগজ চাই। তা হলে আমার মতো যাঁরা এতদিন ধরে সংসার করছেন, তাঁরা এবার কি করবেন? সত্যিই ভীষণ ভয় করতাছে।’ পাশের দোকানে চানাচুরের প্যাকেট কিনছিলেন এক বৃদ্ধা। তিনি বলছিলেন, ‘আমার বাড়ি লাগোয়া এক যুবক সম্প্রতি বাংলাদেশে বিয়ে করেছেন। এখন ওঁরা খুব আতঙ্কে রয়েছে। ওঁদের সংসার ভেঙে যাওয়ার উপক্রম।’ সবমিলিয়ে, প্রথমাদের মুখে এখন হাসি নেই। বাংলাদেশি বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলে প্রাণজুড়োনোর বালাই নেই। রয়েছে শুধু এসআইআর নামক আতঙ্ক—খুব ভয় করতাছে। ফাইল চিত্র