সংবাদদাতা, রঘুনাথপুর: এখনও সমাজ থেকে যে কুসংস্কার ঘোচেনি, আবারও তার প্রমাণ মিলল। এবার পুরুলিয়ার পাড়া থানা এলাকায় নিজের পরিবারের সদস্যরাই ডাইনি অপবাদ দিয়ে এক গৃহবধূকে পিটিয়ে খুন করেছে বলে অভিযোগ। সোমবার কালীপুজোর রাতে পাড়া থানার চাপুড়ি গ্রামের ওই ঘটনায় ব্যাপক শোরগোল পড়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, মৃতার নাম পদবী টুডু(৩৬)। ঘটনার পর থেকেই গ্রামের পরিবেশ থমথমে। এলাকায় যাতে কোনও উত্তেজনা না ছড়ায়, তার জন্য পুলিশ পিকেট বসেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, মৃতার বাপের বাড়ির তরফে রাতেই পাড়া থানায় মোট আটজনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জানানো হয়। তার ভিত্তিতে তদন্তে নেমে ছ’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ধৃতরা হল হিতলাল টুডু ও তার স্ত্রী জলেশ্বরী টুডু, শুকলাল টুডু, বাবলু টুডু, রাজেশ টুডু ও তার স্ত্রী মদনি টুডু। প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ভারতীয় আইনে ভীতি প্রদর্শন অস্ত্র নিয়ে হামলা সহ খুনের মতো একাধিক ধারায় মামলা রুজু হয়েছে। মঙ্গলবার ধৃতদের রঘুনাথপুর মহকুমা আদালতে তোলা হলে বিচারক হিতলাল ও তার স্ত্রী জলেশ্বরীকে সাতদিনের পুলিশ হেপাজতের নির্দেশ দেন। বাকিদের জেল হেপাজতে পাঠানো হয়। পুরুলিয়ার পুলিশ সুপার অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘মামলা রুজু করা হয়েছে। পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।’ স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, জমি সংক্রান্ত বিবাদের জেরে পদবীদেবীদের পরিবারে অশান্তি চলছিল। অভিযোগ, চার ভাইয়ের সঙ্গে পদবীদেবীর স্বামীর অশান্তি লেগেই ছিল। পদবীদেবীকে ডাইনি অপবাদ দিয়ে চালানো হতো অত্যাচার। বহুবার সেই ঝামেলা মেটান স্থানীয়রা। ওইদিন রাতে ফের ডাইনি অপবাদ দিয়ে পদবীদেবীকে বাড়ির বাইরে নিয়ে গিয়ে জা ও দেওর-ভাশুররা মারধর করে। শাবল দিয়ে আঘাত করে তাঁকে খুন করা হয় বলে অভিযোগ।
অভিযোগকারী তথা মৃতার ভাই কাশীপুরের বাসিন্দা বাবুনাথ মুর্মু বলেন, ‘কালীপুজো উপলক্ষ্যে বোনের বাড়ি এসেছিলাম। রাত সাড়ে ৭টা নাগাদ দেখি, ঝামেলা চলছে। বোনকে ওর শ্বশুরবাড়ির লোকজন টেনে বাড়ির বাইরে নিয়ে যায়। ডাইনি অপবাদ দিয়ে ওকে মারধর করা হয়। আমি ও আমার স্ত্রী বাধা দিতে গেলে আমাদের মারধর করে একটি জায়গায় আটকে রাখা হয়। পরে ছাড়া পেয়ে বাইরে বেরিয়ে বোনের খোঁজ করতে থাকি। গোঙানির আওয়াজ পেয়ে বোনের কাছে গিয়ে দেখি, সারা শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছে। দেহের বিভিন্ন অংশে আঘাত করে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে।’
খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে গুরুতর জখম পদবীদেবীকে পাড়া ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যায়। সেখানেই চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। মঙ্গলবার দেহ পুরুলিয়ায় ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। মৃতার স্বামী সুভাষ টুডু বলেন, ‘কালীপুজোর জন্য আনাড়ায় বাজার করতে গিয়েছিলাম। খবর পেয়ে বাড়ি আসি। আগেও আমার স্ত্রীকে একাধিকবার ডাইনি অপবাদ দেওয়া হয়েছিল। গ্রামবাসীরা একাধিকবার বোঝালেও কথা শোনেনি। স্ত্রীর হত্যাকারীদের কঠোর শাস্তি চাই।’ পুরুলিয়ার বিজ্ঞান মঞ্চের জেলা সম্পাদক নয়ন মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘জেলায় দীর্ঘদিন এমন ঘটনা ঘটেনি। ঘটনাটি অত্যন্ত লজ্জাজনক ও নিন্দনীয়। আমরা মৃতার পরিবারের পাশে রয়েছি। পরিবারটিকে আইনি বিষয়ে আমরা সমস্তরকম সহায়তা করব।’