সুমন তেওয়ারি, আসানসোল: মাদকের নেশায় বহু সম্ভ্রান্ত ঘরের ছেলেদের এখন ঠাঁই হচ্ছে নেশামুক্তি কেন্দ্রে। অভিভাবকরা আশা করেন, অর্থের বিনিময়ে এইসব কেন্দ্রে রেখে নেশামুক্ত হবে বিপথগামী সন্তানরা। অথচ, নেশামুক্তি কেন্দ্রগুলি নিজেরাই ‘অসুস্থ’। ফলে, কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। কয়েক মাস কেন্দ্রে রেখেই বাড়ি নিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। হতাশ হচ্ছেন অধ্যাপক থেকে চিকিৎসক সহ বহু অভিজাত পরিবার। কীভাবে নেশার গ্রাস থেকে সন্তানকে বাঁচাবেন, তা নিয়ে চিন্তার শেষ নেই তাঁদের। কিন্তু কেন? উত্তর খুঁজতে গিয়ে স্বাস্থ্যদপ্তর নড়েচড়ে বসতেই পর্দাফাঁস। উঠে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। বহু ক্ষেত্রেই নেশা ছাড়াতে কাউন্সেলিং প্রয়োজন। এরজন্য যোগ্য কাউন্সেলর নিয়োগ করতে হয়। অথচ, দেখা যাচ্ছে বহু কেন্দ্রে কাউন্সেলরের বদলে রাখা হচ্ছে পেশিবহুল একদল যুবক। যাদের বলা হয় ‘বাউন্সার’। তারা নেশাগ্রস্তদের নানাভাবে ধমক দিচ্ছে। কোথাও কোথাও আবার মারধরও করা হচ্ছে। মাদক ছাড়ানোর জন্য বিশেষ ওষুধ রয়েছে। সেগুলি ব্যবহার করতে হলে নাকরোটিক্স ড্রাগ অ্যাক্ট অনুযায়ী কেন্দ্রের বিশেষ অনুমতি প্রয়োজন। প্রায় কোনো কেন্দ্রের কাছেই সেই অনুমতি নেই। তাই প্রয়োজনীয় ওষুধ পাচ্ছেন না রোগীরা।
দীর্ঘদিন এই অব্যবস্থা চললেও স্বাস্থ্যদপ্তর এনিয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। নেশামুক্তি কেন্দ্রগুলিতে সেভাবে পরিদর্শনও হতো না। আসানসোল দুর্গাপুর সহ শিল্পাঞ্চলে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা লাফিয়ে বাড়ছে। অনেকেই সেই কেন্দ্রগুলিতে প্রিয়জনদের রেখে যেতেন ভালো ফল লাভের আশায়। বহু ক্ষেত্রে উল্টো ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ। এবার বিষয়টি নিয়ে কড়া নজরদারির নির্দেশ দিয়েছে ডিরেক্টর অফ হেলথ সার্ভিসেস। ডিস্ট্রিক্ট মেন্টাল হেলথ রিভিউ বোর্ড গঠিত হয়েছে। তারা বিভিন্ন নেশামুক্তি কেন্দ্র পরিদর্শন শুরু করেছে। সরকারি উদ্যোগে এই ধরনের রোগীদের রাখার জন্য ডি-অ্যাডিকশন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার গড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যাতে প্রকৃত চিকিৎসা পান মাদকাসক্ত রোগীরা।
স্বাস্থ্যদপ্তরের এক কর্তা জানিয়েছেন, ক্লিনিক্যাল এস্টাব্লিসমেন্ট অ্যাক্ট অনুযায়ী যে কোনো স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানকে নজরদারি করে স্বাস্থ্যদপ্তর। কিন্তু, এই নেশামুক্ত কেন্দ্রগুলি মেন্টাল হেলথ অ্যাক্ট অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত। নেশামুক্ত ভারত অভিযানের মাধ্যমে অনেক সময়ে বিভিন্ন নেশামুক্তি কেন্দ্রগুলি আর্থিক সহায়তাও পেয়েছে। তাতে লাভ কিছু হয়নি। দেড় বছর আগে প্রথম স্বাস্থ্যদপ্তর নেশামুক্তি কেন্দ্রগুলিকে স্বাস্থ্যদপ্তরের লাইসেন্স নেওয়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু, নজরদারি নিয়ে কোনো ভাবনা ছিল না। এবার বাড়তি জোর দেওয়া হয়েছে। শুধু স্বাস্থ্যদপ্তর নয়, বিচার বিভাগের প্রতিনিধিরাও রয়েছেন মেন্টাল হেলথ রিভিউ বোর্ডে। সেখানে থেকেই সুপারিশ করা হয়েছে, সরকারি উদ্যোগে একটি আদর্শ সেন্টার খুলতে। যেখানে রোগীদের নেশামুক্ত করার জন্য প্রকৃত চিকিৎসা হবে। জানা গিয়েছে, জেলায় ২৪ টি নেশামুক্তি কেন্দ্র রয়েছে।