নিজস্ব প্রতিনিধি, বোলপুর: বিশ্বভারতীর ঐতিহ্য ও রবিঠাকুরের স্মৃতিধন্য শান্তিনিকেতন আজ কি অপরাধের স্বর্গরাজ্য? প্রান্তিক স্টেশন সংলগ্ন একটি হোটেলে পুলিশের সাম্প্রতিক অভিযানে যে মধুচক্রের পর্দাফাঁস হয়েছে, তার পরতে পরতে এখন জড়িয়ে শাসকদলের প্রভাবশালীদের নাম। উদ্ধার হওয়া আট মহিলা এবং ধৃত চার জনের গ্রেফতারির পর সামনে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য, যা বীরভূম জুড়ে রাজনৈতিক শোরগোল ফেলে দিয়েছে। এই ঘটনায় অস্বস্তিতে শাসকদল। শান্তিনিকেতনের মতো একটি শিক্ষা ও সংস্কৃতির পীঠস্থানে এমন নক্কারজনক ঘটনায় সাধারণ মানুষ স্তম্ভিত।
বুধবারের অভিযানে ওই হোটেল থেকে পুলিশ আট মহিলাকে উদ্ধার করে। গ্রেপ্তার করে চারজনকে। ধৃতদের মধ্যে রয়েছে শান্তিনিকেতনেরই বাসিন্দা নুর তাজিম মল্লিক ওরফে রাজু, লগন খান, শেখ নাবিউল্লা ও নীলোৎপল ঘোষ। ধৃতদের বৃহস্পতিবার বোলপুর আদালতে তোলা হয়। পুলিশ ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিজেদের হেপাজতে চেয়ে আবেদন করেছে। পাশাপাশি উদ্ধার হওয়া মহিলাদের গোপন জবানবন্দি রেকর্ড করা হচ্ছে। পুলিশের এক কর্তা বলেন, বাইরে থেকে মহিলাদের এনে তাদের দেহব্যবসার কাজে লাগানো হত। ঘটনায় ধৃতদের নিজেদের হেপাজতে নিয়ে জেরা করা হবে। এই ঘটনার সঙ্গে আর কারা, কারা যুক্ত, সেটা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ সূত্রের খবর, এই অবৈধ কারবারের মূল পান্ডা হিসেবে উঠে আসছে রাজুর নাম। এলাকায় দাপিয়ে বেড়ানো এই রাজু এর আগেও আগ্নেয়াস্ত্র হাতে ভিডিও ভাইরাল করে সংবাদ শিরোনামে এসেছিল। তাছাড়া, রাজুকে মধুচক্র চালানোর অপরাধে আগেও গ্রেপ্তার করে শান্তিনিকেতন থানার পুলিশ। সে জেলও খেটেছে। প্রশ্ন উঠেছে, জেল থেকে বেরোনোর পরও কার মদতে রাজু পুনরায় এই নিষিদ্ধ কারবার চালানোর দুঃসাহস পেল? এনিয়ে বোলপুরের অলিতে-গলিতে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে শাসকদলের এক দাপুটে নেতার নাম। অভিযোগ, ওই দাপুটে নেতার আশীর্বাদধন্য রাজু। দাপুটে ওই নেতা আবার বোলপুর পুরসভার এক জনপ্রতিনিধির আত্মীয় এবং জেলার এক প্রভাবশালী বিধায়কের ছত্রছায়ায় পুষ্ট।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, যে হোটেলে মধুচক্র চালানো হচ্ছিল, সেই হোটেলটি সিল করেছে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, লাভপুরের এক ব্যবসায়ীর হোটেলটি লিজ নিয়ে চালাচ্ছিলেন। ওই ব্যবসায়ীর যোগসাজসেই হোটেলে মধুচক্র চালাত রাজু। শুধু ওই হোটেলেই নয়, অভিযোগ, জেলার প্রভাবশালী নেতাদের হাত ধরে শান্তিনিকেতন, তালতোর, প্রান্তিক এবং কোপাই নদীর তীরের একাধিক রিসর্ট ও হোটেলে রমরমিয়ে চলছে মধুচক্র। পুলিশের এক কর্তার অবশ্য দাবি, আমরা নিয়মিত হোটেলগুলো চেক করি। কোথাও কোনো অভিযোগ পেলেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হয়। তবে, এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই সমাজমাধ্যমে বেশ কিছু ছবি ভাইরাল হয়েছে। ভাইরাল হওয়া একাধিক ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ধৃত রাজু ও তার সঙ্গীরা শাসকদলের প্রথম সারির নেতাদের সঙ্গে একই মঞ্চে কিংবা ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দাঁড়িয়ে। এমনকী, ওই প্রভাবশালী বিধায়কের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের লোকেদের সঙ্গেও তাদের ছবি সামনে চলে এসেছে। এনিয়ে রীতিমতো অস্বস্তিতে তৃণমূল নেতৃত্ব।
বিরোধীরা ভাইরাল ছবিগুলিকে ঢাল করে তৃণমূলের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণে নেমেছে। বিজেপির জেলা সভাপতি শ্যামাপদ মণ্ডল বলেন, পুলিশ কেবল ‘চুনোপুঁটি’ ধরে দায় সারছে, কিন্তু রাঘব বোয়ালদের ছোঁয়া হচ্ছে না। তৃণমূলের মুখপাত্র জামশেদ আলি খান বলেন, শান্তিনিকেতনের মতো জায়গায় এই ধরণের ঘটনা মানতে পারছি না। যে বা যারা যুক্ত আছে পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নিক।