সমৃদ্ধ দত্ত, নয়াদিল্লি: শেখ হাসিনা আপাতত ভারতের কাছে অতীত। তিনি দিল্লিতে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। ইতিহাসগতভাবে আওয়ামি লিগের সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্কের কথা সুবিদিত। কিন্তু বাংলাদেশে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত যে-কোনো বৈধ সরকারের সঙ্গেই ভারত কূটনৈতিক ‘বন্ধুত্ব’ রাখবে—সেই বার্তা স্পষ্ট করে দেওয়া হল শুক্রবার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শুক্রবার সাতসকালেই ঘোষণা করেন, আগামী দিনে বিএনপি পরিচালিত বাংলাদেশের নতুন সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মযজ্ঞে ভারত সম্পূর্ণ সাহায্য করতে প্রস্তুত। সেই বিবৃতিতেই সমাপ্তি নয় ভারতের বন্ধুত্বের বার্তা। দুপুরে মোদি সরাসরি কথা বলেন বিএনপি চেয়ারম্যান এবং সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে। পরে তাঁর উষ্ণ বার্তা, ‘তারেক রহমানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে আনন্দিত হলাম। উল্লেখযোগ্য এই জয়ের জন্য তাঁকে অভিনন্দন জানালাম। বাংলাদেশের উচ্চাশাপূরণের জন্য তাঁকে শুভকামনা জানিয়েছি। ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে আমরা দুই প্রতিবেশী দেশ। তাই দুই দেশের জনগণের শান্তি ও অগ্রগতির জন্য ভারত যে বদ্ধপরিকর, সেকথা আবার জানাতে চাই।’
সরকারি সূত্রের খবর, তারেক রহমানের আনুষ্ঠানিক শপথগ্রহণের পরই নবনির্বাচিত সরকারের সঙ্গে যাবতীয় কূটনৈতিক আলোচনা ও সম্পর্ক পুনরায় স্থাপন করা হবে। সবথেকে তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তি। চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে সমাপ্ত হবে ১৯৯৬ সালে ৩০ বছরের জন্য করা সেই চুক্তির মেয়াদ। জানুয়ারি মাসে ভারতের সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশনের প্রতিনিধি দল গিয়েছিল বাংলাদেশে। সেদেশে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সম্প্রতি তারেক রহমানের বৈঠকও হয়েছে। যদিও ঠিক কী কথা হয়েছে, সেটা কোনো পক্ষই জানায়নি। আবার আলোচনা শুরু হবে। নতুন কিছু শর্ত অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে স্থির হয়েছে। এদিন লোকসভায় এই সংক্রান্ত প্রশ্নও উত্থাপিত হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের এমপি মালা রায় প্রশ্ন করেন, ভারত কি গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তি পুনর্নবীককরণ প্রক্রিয়া শুরু করেছে? ভারত সরকারের এই নিয়ে অবস্থান কী? পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেই কি এব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে কেন্দ্র? জবাবে বিদেশ মন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং বলেছেন, ‘ইতিমধ্যেই এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে গত বছরেও এই নিয়ে আলোচনা হয়েছে। রাজ্য সরকার তাদের অভিমত জানিয়েছে।’ সরকারি সূত্রের খবর, এপ্রিল মাসের পরই এই চুক্তিসহ নানাবিধ বিষয়ে বিএনপি সরকারের সঙ্গে আলোচনা শুরু করবে ভারত।
এই পরিস্থিতিতে অন্যতম প্রধান প্রশ্ন হল, শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ কী হতে চলেছে? বিএনপি সরকারকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে জবাব দিতেই হবে যে, ভারত কেন তাঁকে আশ্রয় দিয়ে রেখেছে? তারেক রহমান যদি হাসিনাকে ঢাকায় পাঠানোর দাবি করেন, তাহলে ভারত কী করবে? এবং ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক তখন কোন খাতে বইবে? ইতিমধ্যে জয় নিশ্চিত হতেই বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবিতে সরব হয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ। ঢাকায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন, ‘আইন মেনে হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর পক্ষে সওয়াল করা হবে। এটা দুই দেশের বিদেশ মন্ত্রকের বিষয়। আমরা ভারত সরকারকে অনুরোধ করব বিচারের মুখোমুখি হওয়ার জন্য হাসিনাকে ফেরত পাঠানো হোক।’ যদিও ভারত আপাতত স্বস্তিতে। কারণ, জামাত জোট ক্ষমতাসীন হলে ভারত বিরোধিতাকেই একমাত্র সরকারি নীতি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করত। সেই সম্ভাবনা নির্মূল হল। রাজনৈতিকভাবে হাসিনা প্রতিপক্ষ হলেও তারেক রহমানের বিএনপি অগণতান্ত্রিক কোনো পদক্ষেপ নেবে না বলে ভারতের বিশ্বাস।