তন্ময় মল্লিক: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বারকয়েক বাংলা ভ্রমণ হয়ে গিয়েছে। ঘুরে গেলেন ‘বিজেপির চাণক্য’ অমিত শাহও। ফের আসছেন প্রধানমন্ত্রী। দিল্লির বিজেপি নেতাদের ঘনঘন বাংলা সফর বুঝিয়ে দিচ্ছে, দুয়ারে নির্বাচন। তাই বাড়ছে হিন্দি বলয়ের নেতাদের দাপাদাপি। ভিনরাজ্যের বিজেপির নেতা-মন্ত্রীদের করা হচ্ছে বিধানসভা কেন্দ্রের ‘বিশেষ পর্যবেক্ষক’। সেই টিমে বাঙালি পেটানোয় এবং খুনে নামডাক হয়েছে, এমন সব রাজ্যের নেতাদের রাখা হচ্ছে। ফলে ‘বাঙালি-ঘাতক’দের হাতেই তৈরি হচ্ছে বাংলা দখলের ব্লু-প্রিন্ট।
গোটা দেশে যে বিপুল সংখ্যক পরিযায়ী শ্রমিক কাজ করেন, সেটা টের পাওয়া গিয়েছিল করোনাকালে। আচমকা লকডাউন ঘোষণায় বিভিন্ন রাজ্যে আটকে পড়া শ্রমিকদের বাড়ি ফেরাতে স্পেশাল ট্রেন দেওয়া হয়েছিল। ২০২০ সালের ২৭মে রেলমন্ত্রক বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছিল, ২৬দিনে ৩৫৪০টি স্পেশাল ট্রেনে করে ৪৮ লক্ষেরও বেশি পরিযায়ী শ্রমিককে তাঁদের রাজ্যে পাঠানো হয়েছে। তারমধ্যে উত্তরপ্রদেশে ১৩৯২টি, বিহারে ১১২৩টি, ঝাড়খণ্ডে ১৫৬টি, মধ্যপ্রদেশে ১১৯টি, ওড়িশায় ১২৩টি ট্রেন গিয়েছে। সেই সময় বাংলা থেকে কম ট্রেন চাওয়া হয়েছে অভিযোগ তুলে বিজেপি ব্যাপক আক্রমণ শানিয়েছিল।
এই পরিসংখ্যানে স্পষ্ট, লক্ষ-লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক দেশজুড়ে কাজ করেন। তাহলে বেছে বেছে বাঙালিদের পেটানো হচ্ছে কেন? বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাংলায় কথা বললেই ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে পিটিয়ে রাজ্যছাড়া করা হচ্ছে। খুন করতেও হাত কাঁপছে না। সম্প্রতি মুর্শিদাবাদের সূতির যুবক জুয়েল রানাকে পিটিয়ে মেরেছে। ওড়িশায় রাজমিস্ত্রির কাজ করছিলেন একুশ বছরের জুয়েল। আধারকার্ড, ভোটার কার্ড দেখিয়েও প্রাণ বাঁচাতে পারেননি তিনি।
বিজেপি শাসিত রাজ্যে একের পর এক বাঙালিকে পিটিয়ে খুন করার পরেও ডবল ইঞ্জিনের সরকার নির্বিকার। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, কেন্দ্রীয় সরকার একটা ধমক দিলেই সব বন্ধ হয়ে যেত। কিন্তু সেটা করছে না। উলটে ইস্যু জিইয়ে রাখছে। আক্রমণ উত্তরোত্তর বাড়ছে। বাঙালি পিটিয়ে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে হিন্দুভোট এককাট্টা করতে চাইছে। তাই জাতপাত ও বিভাজনের রাজনীতিতে ‘ডক্টরেট’ করা লোকজনকেই এরাজ্যের বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে পাঠাচ্ছে।
বিজেপির ‘বহিরাগত’ নেতাদের মাথার উপর বসিয়ে দেওয়ায় এরাজ্যের দলীয় নেতা-কর্মীদের ক্ষোভ রয়েছে যথেষ্ট। মাঝেমধ্যেই তা ফুটে বেরচ্ছে। তবে, বোমাটি ফাটিয়েছেন বিজেপি সাংসদ অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁর সাফ কথা, হিন্দি বলয় থেকে নেতা নিয়ে এসে এখানে ভোট করালে সাফল্য পাওয়া যাবে না। কারণ পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মন, মেজাজ, অভিমান ভিন্ন। উত্তর ভারতের নেতা এনে এখানে ভোট করিয়ে বেরিয়ে যাব, এটা অবাস্তব চিন্তাভাবনা।
বিজেপি নেতা-কর্মীদের প্রশ্ন, একুশের ভোটে যে কৌশল ব্যুমেরাং হয়েছিল এবারও তাকেই আঁকড়ে ধরা হচ্ছে কেন? এর সহজ উত্তরটা হল, বঙ্গ বিজেপির উপর দিল্লি নেতৃত্ব ভরসা রাখতে পারছে না। এরাজ্যে দলীয় সংগঠনের যে হাঁড়ির হাল, সেটা দিল্লির নেতারা খুব ভালোই জানেন। বঙ্গ বিজেপির উপর সবটা ছেড়ে দিলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হারতে হবে। তাই নির্বাচন করিয়ে নেওয়ায় দক্ষ বিভিন্ন রাজ্যের নেতা-মন্ত্রীদের নিয়ে আসছে। তাঁদের জামাইআদর করে রাখছে।
অবশ্য এছাড়া আরও একটা কারণ আছে বলে অনেকে মনে করছেন। তাঁদের মতে, অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে হিন্দিবলয়ের নেতাদের ‘ট্রেনার’ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। ট্রেনারের নির্দেশ যেভাবে ‘পোষ্য’ মেনে চলে, ঠিক সেভাবেই বাংলার বিজেপি নেতাদের ‘ট্রেনার’দের কথায় ওঠবস করাতে চাইছে। ভারতীয়দের একাংশকে কাজে লাগিয়ে ইংরেজরা আমাদের দেশে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। সেই কায়দাতেই এরাজ্যের কিছু নেতাকে সামনে রেখে তারা বাংলার দখল নিতে চাইছে। উদ্দেশ্য সফল হলে বাংলার বিজেপি নেতারা হবেন ‘কাঠের পুতুল’। সুতোটা থাকবে হিন্দি বলয়ের নেতাদের হাতে। নাচন-কোদন, হাত-পা ছোড়া, কথা বলা সবই হবে তাঁদেরই নির্দেশমতো।
তবে, শুধু অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ই নন, হিন্দি বলয়ের নেতাদের বাংলায় খবরদারির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি তথাগত রায়ও। তিনি কৈলাস বিজয়বর্গীয়ের প্রসঙ্গ টেনে এনে বলেছেন, তাঁর জন্যই একুশের নির্বাচনে বিজেপি পরাজিত হয়েছে। জাতপাত বিচার করে বিহার, উত্তরপ্রদেশে ভোট হয়, বাংলায় নয়। তবে এবার তথাগতবাবু কামিনী-কাঞ্চন যোগ নিয়ে কিছু বলেননি। সেটা হয়তো নির্বাচনের ফল বেরনোর জন্য তুলে রেখেছেন।
বঙ্গ বিজেপির চলন পদ্ধতি দলের আদি কর্মীদের, বিশেষ করে আরএসএস ঘনিষ্ঠদের নাপসন্দ। আদিরা গুরুত্ব পাচ্ছেন না। ছড়ি ঘোরাচ্ছেন দলবদলুরা। এনিয়ে মুখ খুলেছেন পুরুলিয়ার বিজেপির প্রাক্তন জেলা সহ সভাপতি শঙ্কর কুমার। তাঁর কথায়, ১৪ বছর বয়সে আরএসএসে যুক্ত হই। পরে সংঘের নির্দেশে বিজেপির হয়ে কাজ শুরু করি। সেই সময় পুরুলিয়া জেলায় হাতে গোনা যে কয়েকজন বিজেপি করতাম, তাঁদের এখন দলে কোনও গুরুত্ব নেই। লড়াই করে আমরা যাঁদের সাংসদ, বিধায়ক করেছি, তাঁরাই আমাদের গুরুত্বহীন করে দিচ্ছেন। যে মই বেয়ে উপরে উঠেছেন, সেটাই কেটে ফেলতে চাইছেন।
আদি-নব্যের দ্বন্দ্ব মেটানোর উদ্দেশ্যেই আরএসএস ঘনিষ্ঠ শমীক ভট্টাচার্যকে বিজেপির রাজ্য সভাপতি করা হয়েছিল। সভাপতি হওয়ার পর থেকেই শমীকবাবু রাজ্যস্তরের নিষ্ক্রিয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তাঁদের ফের সক্রিয় হওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। কিন্তু, বসে যাওয়া নেতারা সাফ জানিয়ে দেন, ‘দলে গুরুত্ব না পেলে সক্রিয় হওয়া সম্ভব নয়।’ সূত্রের খবর, রাজ্য কমিটিতে দলবদলুরা নাকি আদিরা, কাদের প্রাধান্য বেশি দেওয়া হবে, সেই নিয়ে জোর লড়াই হয়। তারজন্যই রাজ্য কমিটি ঘোষণা করতে এত দেরি হল। তালিকায় কিছু পুরানো বিজেপি নেতা জায়গা পেয়েছেন ঠিকই। কিন্তু তাঁরা গুরুত্ব পাবেন কি না, সেটা সময় বলবে। তবে এখনই যেটা চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়া যায়, দলবদলুরা বিষয়টি ভালোভাবে নেবে না।
বাংলার নির্বাচন দরজায় কড়া নাড়লেও বঙ্গ বিজেপির দ্বন্দ্ব মিটছে না। উলটে বেড়েই চলেছে। এই মুহূর্তে তৃণমূলের মোকাবিলার চেয়েও আদি-নব্যের দ্বন্দ্ব মেটানোই বিজেপির আসল চ্যালেঞ্জ। দ্বন্দ্ব মেটাতে না পারলে পরিণতি যে ভয়াবহ হবে, সেটা দিল্লির নেতারাও জানেন। তিনদিনের বাংলা সফরে এসে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সেই কোন্দল মেটানোরই চেষ্টা করেছেন। প্রায় আট মাস দলের সঙ্গে দিলীপ ঘোষের সেই অর্থে কোনও সম্পর্ক ছিল না। কোনও গুরুত্বপূর্ণ মিটিং তো দূরের কথা, অটলবিহারী বাজপেয়ির জন্মশতবর্ষ পালনের অনুষ্ঠানেও আমন্ত্রণ পাননি। এহেন দিলীপবাবুর আচমকা গুরুত্ব বৃদ্ধিতে অনেকেই বিস্মিত। তবে অনেকে বলছেন, এটা ‘বিজেপির চাণক্যে’র রাজনৈতিক কৌশল। চার ‘মাথা’কে নিয়ে বৈঠক করে তিনি ঐক্যের বার্তা দিতে চেয়েছেন। কিন্তু, মাটি একবার পুড়লে কি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায়? মেদিনীপুর থেকে বর্ধমানে পাঠিয়ে হারানোর জ্বালা তিনি যে ভোলেননি, সেটা তাঁর মুচকি হাসিতেই পরিষ্কার।
বিজেপি বাংলায় প্রধান বিরোধী দল। কিন্তু দু’তিনটি জেলা বাদ দিলে সংগঠনের ছিটেফোঁটা নেই। তা সত্ত্বেও বিজেপি এরাজ্যে ৩৮-৪০ শতাংশ পর্যন্ত ভোট পেয়েছে। তার অন্যতম কারণ আরএসএস। তাদের ‘ফোর জি’ নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে বিজেপি গ্রাহক সংখ্যা বাড়িয়েছে। কিন্তু, বিভিন্ন ইস্যুতে আরএসএসের সঙ্গে বিজেপির দূরত্ব বাড়ছে। হিন্দুত্বের বিকাশ ঘটানোই আরএসএসের লক্ষ্য। তারা মনে করছিল, হিন্দুত্বের বিকাশের পথে বিজেপি সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু বিজেপির লক্ষ্য যেনতেনপ্রকারে ক্ষমতা দখল। তারা হিন্দুত্বকে ক্ষমতা দখলের ‘হাতিয়ার’ বানাতে চাইছে। ফলে বহুক্ষেত্রে হিন্দু ধর্মের গরিমা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে ভোপালের সভায় মোহন ভাগবতের বক্তব্য ভীষণ তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর সাফ কথা, ‘বিজেপিকে দেখে আরএসএসকে বিচার করলে ভুল হবে।’ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, অনেক চিন্তাভাবনা করে মোহন ভাগবত একথা বলেছেন। কারণ তিনি খুব ভালো করেই জানেন, রাজনৈতিক দলের উত্থান যেমন আছে, তেমনি পতনও অনিবার্য। কালের নিয়মে বিজেপি একদিন ক্ষমতাচ্যুত হবে। কিন্তু, হিন্দুত্ব প্রবহমান নদীর মতো। আরএসএস সেই প্রবহমানতাকে বজায় রাখতে চায়। বিজেপির জয়-পরাজয়ের সঙ্গে হিন্দুত্বের বিকাশের সম্পর্ক নেই। সেটা স্পষ্ট করার জন্যই সংঘপ্রধান বিজেপি এবং আরএসএসের মধ্যে একটা অদৃশ্য লাইন টানতে চেয়েছেন। এবারের নির্বাচনে সংগঠনহীন বঙ্গ বিজেপির জন্য এই অদৃশ্য লাইনটাই হবে ‘চীনের প্রাচীর’।