অশোক মজুমদার: ‘সকালে ফুলের বনে যে আলো আসে তাতে বিস্ময় নেই, কিন্তু পাকা দেয়ালের ফাটল দিয়ে যে আলো আসে সে আর-এক কথা।’... ‘রক্তকরবী’ নাটকে অধ্যাপকের এই সংলাপ যুগ-কাল ছাপিয়ে সর্বকালীন এক ভাবনা। উন্মুক্ত পৃথিবীর বুকে আলোর বিচ্ছুরণ নিত্যদিনের ঘটনা। কিন্তু অবরুদ্ধ নিকষ কালো অন্ধকারে এক চিলতে আলো যে আশার সঞ্চার করে, তা শক্তিশেল হয়ে উঠে ভেঙে দিতে পারে কারাগারের শিকল, অসাম্যের বাঁধন।
১৯২৩ সালের মে মাসে শিলংয়ে এই নাটক লেখার শুরু। দেড় বছর পর সেটির দশম খসড়া প্রকাশিত হয়েছিল রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের ‘প্রবাসী’ পত্রিকায়। সময়টা ১৩৩১ বঙ্গাব্দের আশ্বিন, অর্থাৎ ১৯২৪ সাল। কবিগুরু সেই কালজয়ী সৃষ্টির নাম প্রথমে দিয়েছিলেন ‘যক্ষপুরী’, তারপর ‘নন্দিনী’ অবশেষে ‘রক্তকরবী’... সেদিনের পর কেটে গিয়েছে একশো বছর। সময়ের পরতে পরতে জমেছে সভ্যতার কত পলি। ‘রক্তকরবী’র বার্তা কিন্তু এখনও প্রবলভাবে প্রাসঙ্গিক! মনুষ্যসমাজের কুয়াশা ঘেরা জীবনে তা আলোর ছটা হয়ে ছড়িয়ে পড়ে দিকে দিকে।
‘রক্তকরবী’তে একদিকে আছে একদল মানুষের সর্বগ্রাসী রাক্ষুসে লালসা আর অন্যদিকে জীবনের স্বাভাবিক বহমানতা, যার মধ্যে নেই কোনও দখলদারি। নেই কোনও প্রতিযোগিতাও। শুধু বাঁচার আনন্দে তারা আত্মহারা। এই দু’দিকের লড়াই সর্বজনীন। এই লড়াই যন্ত্রের সঙ্গে মনুষ্যত্বের। সেই দ্বন্দ্বের ভিতরেই নাটকটির সময়োত্তীর্ণতা। ‘রক্তকরবী’র মূল দ্বন্দ্বে তাই একশো বছর পেরিয়েও মরচে পড়েনি। কারণ, এ লড়াই চলছে সভ্যতার জন্মলগ্ন থেকে।
১৯৫৪ সালে বহুরূপীর ‘রক্তকরবী’ রূপকথার ঘেরাটোপ সরিয়ে সমকালীন করে তুলেছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই নাটককে। সেই প্রয়োজনা ঘিরে বিশ্বভারতী ও তৎকালীন পত্রপত্রিকার প্রতিরোধের কাহিনি অনেকেরই মনে রয়েছে। ২০১৬ সালে যখন প্রথম ‘রক্তকরবী’তে অভিনয় করি, তখন নাটকটিকে যেভাবে দেখতাম তার সঙ্গে আজকের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য অনেক। সেসময় প্রায় জোর করেই আমায় অধ্যাপকের চরিত্রে বেছে নেন প্রখ্যাত নাট্য ও চলচ্চিত্র পরিচালক গৌতম হালদার। এমনিতে পড়াশোনার প্রতি ছোটো থেকেই আমার তেমন আগ্রহ নেই। গল্প-উপন্যাস যে খুব পড়েছি, এমনটা মোটেও নয়। ‘রক্তকরবী’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত নাটক জানতাম। কিন্তু পড়ে দেখিনি। ফলে ‘রক্তকরবী’তে অভিনয় করার প্রস্তাবে আমার তো ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ দশা!
তার চেয়েও বড়ো কথা, আমি নাট্যজগতের মানুষ নই। শখের বশে স্কুল-কলেজে একটুআধটু থিয়েটার করতাম। নিত্যদিন খুন, জখম, মারপিট, দুর্ঘটনার মতো কঠিন বিষয়ের চিত্র সাংবাদিকতা করা আমার কাছে ‘রক্তকরবী’ নাটকের আত্মাকে বোঝা ভীষণই কঠিন ছিল। কিন্তু গৌতমদা আমাকে প্রায় বর্ণপরিচয় শেখানোর মতো বুঝিয়েছিলেন। নাটক সম্মন্ধে ওঁর প্রাজ্ঞতা আমাকে ধীরে ধীরে অধ্যাপক চরিত্রটি করার সাহস জুগিয়েছে।
‘রক্তকরবী’র সঙ্গে পথচলা শুরু করার পর নাটকটি নিয়ে বাংলার শিল্প-সাহিত্য জগতের দিকপাল ব্যক্তিত্বদের নানা মতামত পড়ি। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে সমৃদ্ধ করেছে নাটকটি বুঝতে। কয়েকজনের কথা না বললেই নয়... শঙ্খ ঘোষ বলেছিলেন, ‘নাটকের সংলাপে আছে ‘দেখছ না, এখানে সবাই যেন কেমন রেগে আছে, কিম্বা সন্দেহ করছে, কিম্বা ভয় পাচ্ছে’, যেখানে শুধু ‘খুনোখুনি কাড়াকাড়ির অভিসম্পাত’, তার চেয়ে নিকট নাটক আর কী-ই বা হতে পারে আমাদের।’
স্বয়ং শম্ভু মিত্র বলেছিলেন, ‘আমরা মনে করেছিলাম যে রবীন্দ্রনাথের ক্ষমতা সমুদ্রের মতো বিরাট, তাতে আপামর জনসাধারণের চিত্ত আলোড়িত হ’তে বাধ্য। তাই আমরা সেই ভালো লাগানোর চেষ্টা করেছি, যতটা পেরেছি। আবার প্রত্যেকবারই মনে হয়েছে যে আমরা পারব না। আমাদের পক্ষে একাজ অত্যন্ত কঠিন।’ আবার নন্দলালবাবু (মাস্টার মশায়) বলেছিলেন, ‘আরে না না, এ তো সে রাজা নয়! একবার যদি বোঝা যায় যে যক্ষপুরীর আজকের এই ঐশ্বর্য, এই প্রতাপ সম্ভব হয়েছে সেই রাজার দ্বারা, তাই তো পৃথিবীর বুক চিরে এখানে খনিজ সোনা আনা হয় না। আনা হয় ফসিল ফুয়েল। পৃথিবী যাকে অনেকদিন ধরে কবর দিয়ে রেখেছে। প্রাকৃতিক সম্পত্তির এই অপরিণামদর্শী ব্যবহার তো এই যন্ত্রযুগের একটা প্রধান লক্ষণ।’ আর নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেনের কথা, ‘বস্তুত পৃথিবীর অধিকাংশ সংঘর্ষ ও বর্বরতাকে বাঁচিয়ে রেখেছে একটি অনন্য, অবিকল্প পরিচয় ... মায়া বা বিভ্রম। এর থেকে ভেঙে বেরনোর পথ জটিল। কাফকা? সে তো খুবই কঠিন চিন্তা। আরও সহজ করে ভাবা যাক না কেন - রবীন্দ্রনাথের ‘মুক্তধারা’। এবং, হ্যাঁ, ‘রক্তকরবী’।’
শংকরলাল ভট্টাচার্য লিখেছিলেন, ‘সেই শম্ভু মিত্রের আমল থেকেই নাটকটি বারবার দেখেও নিস্তার নেই, সেই কিশোর বয়স থেকে বারবার পড়েও মুক্তি নেই। পাতালে খনিজ ধন খোঁজা আর মাটির উপরিতলে রূপের নৃত্য, প্রেমের লীলা দর্শন আজও জারি রইল।’ আর নাট্যকার ব্রাত্য বসু... ‘রবীন্দ্রনাথের টেক্সটের মধ্যেই হয়তো সেই অনন্ত অপার সম্ভাবনা আছে যা বৎসরান্তে একজন সৃজনশীল নির্দেশককে নতুন ভাবে প্রাণীত করতে সাহায্য করে।’
শম্ভু মিত্রের পর যাঁর হাত ধরে ‘রক্তকরবী’ জনপ্রিয়তার শীর্ষে বিচরণ করেছিল, সেই গৌতম হালদারের নিজের ভাবনায়, ‘রবীন্দ্রনাথ ‘রক্তকরবী’ লিখেছিলেন ১৯২৩-এ। তখন থেকে আজ পর্যন্ত শুধু নয়, সভ্যতার সংকট যতদিন থাকবে ‘রক্তকরবী’ রয়ে যাবে আমাদের একান্ত সমকালীন হয়ে। শুধু আমাদের দেশেই নয়, বিশ্বের যেখানেই রাষ্ট্রনিষ্পেষণ, যন্ত্রের অমানবিকতা, যেখানে এর থেকে মানুষ মুক্তির পথ খোঁজে - এ নাটক অব্যর্থ হয়ে ওঠে সেখানেই। রক্তকরবীর চেয়ে সাম্প্রতিক, তাৎপর্যপূর্ণ, গভীর আপন নাটক এই সময়ে আর কীই বা হতে পারে?’
এইসব বিদগ্ধজনের কথা পড়েও কিন্তু প্রথমবার ‘রক্তকরবী’ করার সময় স্টেজ পারফরমেন্সে যতটা গুরুত্ব দিয়েছি, ঠিক ততটা অনুধাবন করিনি নাটকের গভীর ভাবনা। তখন শুধু খুব ভালো লাগত এটা ভেবে যে, এত সুন্দর একটি পরিবেশনার সঙ্গে আমি যুক্ত হতে পেরেছি! ধীরে ধীরে সম্পৃক্ত হয়েছি ‘রক্তকরবী’র সঙ্গে। ২০১৬ সালে যেবার শান্তিনিকেতনের গৌর প্রাঙ্গণে ভিড়ে ঠাসা দর্শকের সামনে ‘রক্তকরবী’ করেছিলাম, বারবার শুধু তার স্রষ্টার অস্তিত্ব অনুভব করেছি। যাঁর কালজয়ী সৃষ্টির একটা চরিত্র হয়ে তাঁরই আশ্রমে এসেছি। আমার সামান্য জীবনে এ গর্ব বড়ো সযত্নে আগলে রেখেছি।
বলতে কোনও দ্বিধা নেই যে, গৌতমদার অকস্মাৎ প্রয়াণের পর ‘রক্তকরবী’কে ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। এমনিই একদিন কথায় কথায় চৈতিকে বললাম, ‘সেই তৃপ্তিদির (তৃপ্তি মিত্র) সময় থেকে তুই রক্তকরবী করছিস। দেখতে গেলে রক্তকরবীর সঙ্গে তোর একটা আত্মার সম্পর্ক। দেখনা নিজেই করতে পারিস কি না? দীর্ঘদিন নন্দিনীর ভূমিকায় অভিনয়ের একটা অভিজ্ঞতা তো আছে!!
যক্ষপুরীর অচলায়তন ভাঙার মতো নন্দিনী অর্থাৎ চৈতিই নানান বাধা-বিপত্তি, চিন্তার মৌনতা ভেঙে নতুন আঙ্গিকে ‘রক্তকরবী’ শুরু করল। চৈতির নির্দেশনাতেও সব শো ‘হাউসফুল’ থাকে। কিন্তু আজও প্রতিটি শোয়ের আগে অস্থির লাগে এই ভেবে যে, ‘রক্তকরবী’ রবীন্দ্রনাথের যুগ-কাল ছাপানো একটি নাটক। যক্ষপুরীর বন্দিশালার গভীরতায় ডুব না দিলে এই নাটকের চিরকালীনতা বোঝা সম্ভব নয়। ওই ডুব দেওয়াতেই তো মুক্তির আকাঙ্ক্ষা আসবে! আমি দর্শককে সেই বাঁধ ভাঙার আনন্দকে অনুভব করাতে পারব তো? এই প্রসঙ্গে আমার স্ত্রী নিবেদিতার একটা কথা মনে পড়লে খুবই হাসি পায়। একবার ‘রক্তকরবী’র কোনও একটি শো শেষে ব্রাত্য বসু ও অন্যান্য অনেকেই আমার অভিনয়ের খুব প্রশংসা করছিলেন। তাঁদের থামিয়ে নিবেদিতা বলে ওঠে, ‘বাস্তবে তো লেখাপড়ার ধার দিয়ে যায়নি। এখন বুড়ো বয়সে অধ্যাপক সেজে মঞ্চে দাপাদাপি করছে।’
বাঙালি হয়ে ‘রক্তকরবী’র মতো এক গৌরবময় সংস্কৃতির চিন্তনধারার সঙ্গে যুক্ত থাকার সৌভাগ্যে আমি নবজীবন লাভ করেছি। সময়ের পরতে পরতে আমাদের রোজনামচায় মরচে ধরা ক্ষয় আসতে দেয়নি এই নাটক। এখানেই ‘রক্তকরবী’র সার্থকতা, যার আলো একশো বছর আগে রবি ঠাকুর জ্বেলেছিলেন। এর চেয়ে সাম্প্রতিক, তাৎপর্যপূর্ণ, গভীর আপন নাটক এই সময়ে আর কীই বা হতে পারে?
শতবর্ষ পেরিয়েও এই কারণেই ‘রক্তকরবী’ সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। এই নাটক আমাদের সুন্দর করে বাঁচার স্বপ্ন দেখায়। রাজা যখন বলে ওঠেন, ‘ঠকিয়েছে। আমাকে ঠকিয়েছে এরা। সর্বনাশ! আমার নিজের যন্ত্র আমাকে মানছে না।’ নিজের তৈরি যান্ত্রিক সভ্যতার বাঁধন ছিঁড়ে, ধ্বজা-দণ্ড-কেতন ভেঙে মাটির নীচের সম্পদ কুক্ষিগত করার মারণখেলার জাল কেটে প্রকৃতি অর্থাৎ নন্দিনীর কাছে, মরা পাঁজরের ভিতরে চরম প্রাণের সন্ধান পান। আজ মনে হয়, জীবনও তো এমনই। ছবির মতো। বারবার দৃশ্যপট বদলে যায়। এক জীবনে কত ছবির সমাহার। ‘রক্তকরবী’র সঙ্গে আমার পথচলাও তো তেমনই। সময়ের হাতে ক্যামেরা থাকে না, কিন্তু স্মৃতির অ্যালবামে অভিজ্ঞতার ঝোলা পূর্ণ হয়।
যাই হোক, জীবনের নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে আজ যখন ‘রক্তকরবী’ হাতে পাঠ মুখস্থ করি... মনে হয় কবিরা কি জাদু জানেন? নাহলে কেমন করে মানুষের মনের দ্বন্দ্ব, দ্বিধাকে কলমের আঁচড় কেটে এমন নৈপুণ্যে লিখে ফেলেন! আমি নিজেই কতবার অন্ধকারে তলিয়ে যেতে যেতে সামান্য আলোর দিশায় খুঁজেছি নিজেকে। এভাবেই সকলের জীবনের অন্ধকার ঘুচে যাক আলোর সরণি বেয়ে। অসহায়তার জাল ছিঁড়ে মানুষ জয়গান গেয়ে উঠুক প্রাণের মনের আনন্দের।
• গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
• সহযোগিতায় : বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী