নিজস্ব প্রতিনিধি, কৃষ্ণনগর: ইউরিয়া সারের কালোবাজারি করতেই ‘ম্যানমেড ক্রাইসিস’ তৈরি করা হচ্ছে। উদ্দেশ্য, চাষিদের ভর্তুকিহীন ইউরিয়া সার চড়া দামে খোলা বাজারে বিক্রি করা। তার জন্য ভর্তুকিযুক্ত ইউরিয়া সারকে ভর্তুকিহীন ইউরিয়া সারের বস্তায় ভরে বিক্রি করা হচ্ছে। এর পিছনে নদীয়া-মুর্শিদাবাদ জেলার অসাধু চক্র জড়িত আছে। সম্প্রতি কৃষিদপ্তর করিমপুর-২ ব্লকের রহমতপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে গোডাউন ভর্তি ইউরিয়া সার বাজেয়াপ্ত করে। সেখানেও চাষিদের ইউরিয়া সারকে বাণিজ্যিক মোড়কে রূপান্তরিত করা হচ্ছিল। সেই ঘটনায় ইতিমধ্যেই দু’জনকে গ্রেপ্তার করেছে কৃষ্ণনগর পুলিশ জেলার ডিস্ট্রিক্ট এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চ। ধৃতদের নাম বিকাশ মণ্ডল এবং তপন প্রামাণিক। রবিবার ধৃতদের কৃষ্ণনগর আদালতে তোলা হলে বিচারক তিনদিনের পুলিশি হেপাজতের নির্দেশ দেন। এই চক্র ‘ডোমকলের সিন্ডিকেট’ দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে বলে প্রাথমিকভাবে কৃষিদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে।
নদীয়া জেলার কৃষিদপ্তরের উপ কৃষি অধিকর্তা জয়দীপ মুখোপাধ্যায় বলেন, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইউরিয়া ব্যবহারের ছবিটা আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়। এবিষয়ে আমরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল অফিসারের সঙ্গে কথা বলেছি। তদন্তের স্বার্থে আমরা চাকদহের একটি ফ্যাক্টারিতে যাই। কিন্তু সেখানে এই ইউরিয়া ব্যবহার করা হয় না। ম্যাজিস্ট্রেট খতিয়ে দেখছেন। উল্লেখ্য, কয়েকদিন আগে করিমপুর-২ ব্লকের রহমতপুর বেলতলা এলাকায় কৃষিদপ্তরের আধিকারিকরা হানা দেন। সেখানে একটি অস্থায়ী গোডাউন থেকে বিপুল পরিমাণ ইউরিয়া সার বাজেয়াপ্ত হয়। অভিযানের সময় দু’টি ট্রাক থেকে ভর্তুকিযুক্ত ইউরিয়া সার নামানো হচ্ছিল। কৃষিদপ্তর গোডাউন থেকে ৪৭৮টি, দু’টি ট্রাক থেকে ১৩৭টি ও ৪৯টি ভর্তুকিযুক্ত ইউরিয়া সারের বস্তা উদ্ধার করে। এই অভিযানকে করিমপুর-২ ব্লকের কৃষিদপ্তরের বড়সড় সাফল্য বলে মনে করছে প্রশাসনের নানা মহল। অভিযান চলাকালীন গোডাউন থেকে বস্তা সিল করার একটি মেশিন উদ্ধার হয়। অর্থাৎ, গোডাউনে ভর্তুকিযুক্ত ইউরিয়া সারকে বাণিজ্যিক ইউরিয়া সারের বস্তায় ভরা হত। সেইমতো বাণিজ্যিক ইউরিয়া সারের বহু খোলা বস্তাও মিলেছে গোডাউনের ভিতর থেকে। এমনকি, বেশকিছু বাণিজ্যিক ইউরিয়া সারের বস্তায় ভর্তুকিযুক্ত ইউরিয়া সার মিলেছে। এই ঘটনায় ডোমকলের যোগ রয়েছে বলে কৃষিদপ্তর প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছে। কারণ, সেগুলি মুর্শিদাবাদের দিক থেকে আনা হয়েছিল। সেই সঙ্গে এই বিপুল পরিমাণ ভর্তুকিযুক্ত ইউরিয়া সার কোন ডিলারের মাধ্যমে করিমপুরের ওই গোডাউনে পৌঁছালো, সেই নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
সারের চড়া দাম নিয়ে মাঝেমধ্যেই সরব হন চাষিরা। যার মধ্যে অন্যতম হল এই ইউরিয়া সার। খোলা বাজারেও অনেক সময় এই সারের ঘাটতি দেখা যায়। সেই ঘাটতি অসাধু চক্রই তৈরি করে। জানা গিয়েছে, চাষিরা ৪৫ কেজি প্রতি বস্তা সারে ১৬০০ টাকা ভর্তুকি পান। অথচ ভর্তুকিযুক্ত সেই ইউরিয়া সারের প্রতি বস্তা ডিলারদের থেকে অসাধু ব্যবসায়ীরা ২৬৬ টাকায় কিনে নিচ্ছে। অসাধু চক্র এই বিপুল পরিমাণ সার কিনে নেওয়ার ফলে খোলা বাজারে তা ক্রমশ অপ্রতুল হয়ে পড়ে। সারের চাহিদা থাকলেও চাষিদের তা দেওয়া সম্ভব হয় না। তখন চাষিদের তা ৩০০-৩৫০ টাকায় কিনতে হয়। অল ইন্ডিয়া কিষাণ খেত মজুর সংগঠনের সম্পাদক কামালউদ্দিন শেখ বলেন, সারের কালোবাজারি নিয়ে আমরা বহুবার বিভিন্ন জায়গায় ডেপুটেশন দিয়েছি। কিন্তু জানিয়েও কোনো সুরাহা হচ্ছে না। অনেক জায়গায় ইউরিয়া সার ৪০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। নিজস্ব চিত্র।