শ্রীকান্ত পড়্যা, তমলুক: সিপিএমের ঘরের ভোট ঘরে ফিরলেই ধরাশায়ী বিজেপি। হাতে গরম প্রমাণ নন্দীগ্রামের সমবায় ভোট। ‘আগে রাম, পরে বাম’ তত্ত্ব আউড়ে সুকৌশলে বামেদের ভোট ব্যাঙ্কের ফাটল ধরিয়ে বলিয়ান হয়েছিল গেরুয়া শিবির। কোনও কোনও এলাকাকে গেরুয়া গড় বলেও দাবি করেছিলেন বিজেপি নেতারা। এবার এমনই একটা ‘গড়’ নন্দীগ্রামে মুখ থুবড়ে পড়ল বিজেপি। বামেদের নিজস্ব ভোট ব্যাঙ্ক ফের ঘরে ফিরলে কিংবা ‘নিউট্রাল’ হয়ে গেলেই তাদের যে কপাল চাপড়াতে হবে, তার অন্তত ইঙ্গিত দিয়ে রাখল নন্দীগ্রাম। ওই সমবায়ে ১২টি আসনের মধ্যে ১২টিতে সিপিএম প্রার্থী দিতেই বিজেপি ‘মহাশূন্য’।
বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে, রবিবার নন্দীগ্রামের আমদাবাদ সমবায় কৃষি উন্নয়ন সমিতির নির্বাচন ছিল। সেই নির্বাচনের ফলাফল ১২-০। অর্থাৎ, ১২টি আসনের মধ্যে ১২টিতেই তৃণমূল জয়লাভ করেছে। ফলাফল পর্যালোচনা করে রাজনীতির কারবারিদের দাবি, আগের রাম-এর তত্ত্ব ধীরে ধীরে খারিজ করছে বামেরা। এতে প্রাথমিকভাবে তৃণমূলের কিছুটা সুবিধা হলেও সুদূরপ্রসারীতে সিপিএম অনেক বেশি লাভবান হবে। কারণ, বাংলার কৃষ্টি-সংস্কৃতির সঙ্গে বিজেপির আদর্শ, দর্শন ঠিক খাপ খায় না বলে নানা মহলে জল্পনা চলছে। সেদিক দিয়ে বরং বামেরা বাংলার আবেগ সুরক্ষায় অনেক বেশি নির্ভরশীল বলেই মনে করা হয়।
২০১৯-২০২৪ সাল পর্যন্ত বামেদের রক্তক্ষরণ যতবেশি বেড়েছে, ততবেশি শক্তিধর হয়েছে গেরুয়া বাহিনী। বাম কর্মীদের মুখে মুখেই ঘুরছিল একটাই কথা—‘আগে রাম, পরে বাম।’ যে কারণে সমবায় নির্বাচন থেকে শুরু করে পঞ্চায়েত নির্বাচনে কোথাও কোথাও রাম-বাম জোটও হয়। পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দকুমারে সম্ভবত প্রথম জোট শুরু হয়। বাংলার রাজনীতিতে তকমা পায় ‘নন্দকুমার মডেল’। সাফল্যও মেলে। নন্দকুমারের শীতলপুর পশ্চিম সহ বেশকিছু গ্রাম পঞ্চায়েতেও বোর্ড দখল করেছে রাম-বাম জোট। রাজনীতির লোকেরা মনে করেন, এটা ছিল বামেদের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
বিধানসভা ভোটের প্রাক্কালে নন্দীগ্রাম আরও একটি মডেলের জন্ম দিল। বিজেপি ও তৃণমূলের সঙ্গে সেয়ানে সেয়ানে ফাইট দিলে গেরুয়া শিবিরের কপালে যথেষ্ট দুঃখ রয়েছে। এক্ষেত্রে তৃণমূল সাময়িক সুবিধা পেলেও সেটা চিরস্থায়ী হবে না বলেই মত রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের। নন্দীগ্রাম-২ ব্লক বিজেপির খাসতালুক হিসেবে পরিচিত। সেখানে সিপিএম ১২টি আসনেই প্রার্থী দিতেই গো-হারা বিজেপি।
ওই সমবায় সমিতির মোট ভোটার ৯৯০ জন। ভোট দিয়েছেন ৮০৬ জন। সিপিএমের প্রার্থী প্রদীপ বেরা দলীয় প্রার্থীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৬১টি ভোট পেয়েছেন। আর, রাধারানি মণ্ডল সর্বনিম্ন ৪০টি ভোট পেয়েছেন। অর্থাৎ, সিপিএম প্রার্থীরা ৪০ থেকে ৬০-এর মধ্যে ভোট পেতেই বিজেপির সব হিসেব ওলটপালট করে দিয়েছে।
সিপিএমের আমদাবাদ এরিয়া কমিটির সম্পাদক জন্মেজয় ভুঁইয়া বলেন, ‘আমদাবাদ একদা বামেদের দুর্গ ছিল। সমবায় ভোটে ১২টি আসনের মধ্যে প্রতিটিতে প্রার্থী দিতে পেরেছি। ৯৯০ জন ভোটারের মধ্যে আমরা প্রায় সাতশো ভোটারের কাছে পৌঁছেছিলাম। তাঁরা পরিবর্তেনের পক্ষে সওয়াল করেছিলেন। যদিও বোর্ডে কোনও পরিবর্তন হল না। আসলে, বিজেপি ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে যে ভূমিকা নিচ্ছে, তা দেখে এখানকার মানুষ তৃণমূলকে মিত্র হিসেবে মেনে নিয়েছেন। বিজেপি আমাদের বিরুদ্ধে নানা কুৎসা করেছিল। ভোটারদের বিভ্রান্ত করেছিল। সেই লক্ষ্যে সফল হয়নি। এই লড়াইয়ে আমরা হারলেও কর্মীদের একক লড়াইয়ে মনোবল বাড়বে।’
তৃণমূলের জেলা সাধারণ সম্পাদক অরুনাভ ভুঁইয়া বলেন, ‘সমবায়ে ত্রিমুখী লড়াই ছিল। বামেরা সাধ্যমতো নিজেদের ভোট ধরে রেখেছে।’ বিজেপির স্থানীয় জেলা পরিষদ সদস্য তথা জেলা কমিটির মেম্বার অরূপ জানার সাফাই ‘সিপিএমের প্রার্থীরা ভোটের আগের দিন বাড়ি বাড়ি গিয়ে তৃণমূল প্রার্থীদের ভোট ট্রান্সফার করার কথা বলেছিলেন। ওদের গোপন আঁতাত হয়েছিল।’