Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

প্রতিটি বুথে ধর্মীয় মেরুকরণ চায় বিজেপি

সালটা ১৮৯৩। ১৫ সেপ্টেম্বর। সেদিন স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগো ধর্ম মহাসভায় দুই ব্যাঙের গল্প বলেছিলেন

প্রতিটি বুথে ধর্মীয় মেরুকরণ চায় বিজেপি
  • ২২ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

মৃণালকান্তি দাস: সালটা ১৮৯৩। ১৫ সেপ্টেম্বর। সেদিন স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগো ধর্ম মহাসভায় দুই ব্যাঙের গল্প বলেছিলেন। কুয়োর ব্যাঙ আর সমুদ্রের ব্যাঙের এক উপকথা। সমুদ্রের ব্যাঙ কুয়োয় এসে পড়েছে। কুয়োর ব্যাঙ তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘কোথা থেকে আসছ হে?’ ‘সমুদ্র থেকে।’ এ কথা শুনে কূপমণ্ডূক বললে, ‘কত বড়ো তোমার সমুদ্র? আমার কুয়োর মতো বুঝি?’ সমুদ্র থেকে আসা ব্যাঙ তো অবাক। বললে, ‘ভাই রে, সমুদ্রের সঙ্গে কি কুয়োর তুলনা চলে?’ কুয়োর ব্যাঙ অবশ্য এ কথা বিশ্বাস করল না, রেগে গেল। শেষে বলল, ‘যাও যাও। আমার কুয়োর থেকে কোনো কিছুই বড় হতে পারে না। মিথ্যেবাদী তুমি। যাও বেরিয়ে যাও।’ গল্পটা শুনিয়ে বিবেকানন্দ বলেছিলেন, ‘এই হল সব সমস্যার মূল। আমি হিন্দু। আমার নিজের ছোট্ট কুয়োয় বসে ভাবি গোটা পৃথিবীই বুঝি আমার কুয়োর মতো ছোট।’ আজ বিজেপির ভাবনাও সেই কুয়োর ব্যাঙের মতো। তারা চায় বাংলাকে সেই ছোট্ট কুয়োয় আটকে ফেলতে!

Advertisement

তাদের অস্ত্র একটাই—মেরুকরণের তাস! তাতেই ভরসা রেখে পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে যেতে চাইছে বিজেপি শিবির। সেই মেরুকরণ পোক্ত করতে গত কয়েক বছর ধরে আসরে নামিয়েছে সাধুসন্তদের বড় অংশও। যাঁদের উদ্যোগে গত ডিসেম্বরে ব্রিগেডে গীতাপাঠের আয়োজনও করা হয়েছিল। সেই ‘অরাজনৈতিক’ জমায়েতে ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ ধ্বনি শোনা গিয়েছে ঋতম্ভরা-ধীরেন্দ্রদের মুখে। সেদিন ঋতম্ভরা বলেছিলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের মাটি জেগে ওঠো, পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু জেগে ওঠো। দুষ্টের দমন করো।’ বিজেপির আশা, এই ভাবে হিন্দুত্ববাদের চাষ করে ভোটে ধর্মীয় মেরুকরণের সুফল পাওয়া যাবে। রাজনৈতিক লাভের অঙ্ক কষেই তারা এ রাজ্যে ধর্মীয় উৎসবের মাত্রা বাড়িয়েছে। একইসঙ্গে সংখ্যালঘু বিদ্বেষ। এ রাজ্যে বিজেপি প্রতিটি পাড়ায়, প্রতিটি বুথে ধর্মীয় মেরুকরণ চায়।

আর তাই ব্রিগেড ময়দানে গীতাপাঠের আসরে চিকেন প্যাটি বিক্রি করার ‘অপরাধ’-এ হিন্দুবীরদের একাংশের হাতে দুই সংখ্যালঘু হকারকে হেনস্তা হতে হয়। এই কুনাট্যের সাক্ষী বঙ্গীয় রাজনীতির পরিসর। গত দশ বছরে ভারত যে পথে হেঁটেছে, তাতে মাংস বিক্রির অভিযোগে কোনো সংখ্যালঘু ব্যক্তিকে হেনস্তা করার ঘটনায় অবাক হওয়ার বিন্দুমাত্র কারণ নেই— এমনটা তো হয়েই থাকে। কিন্তু, পশ্চিমবঙ্গের পরিপ্রেক্ষিতে এই ঘটনা আশঙ্কাজনক। সাম্প্রতিককালে এ রাজ্যে দৃশ্যত হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রসার ঘটেছে, বিভিন্ন হিন্দু পার্বণ উপলক্ষ্যে বাজারে মাছ-মাংস বিক্রি বন্ধ করা নিয়ে ইতস্তত দাবিও শোনা গিয়েছে। কিন্তু, মাংস বিক্রি করছেন বলে কাউকে প্রহার করার ঘটনা সম্ভবত এই প্রথম। এ রাজ্যের গুটিকয় হিন্দুত্ববাদী খুশি হতেই পারেন, শেষপর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গও বুঝি ‘ভারত’ হয়ে উঠল।

এ কথা ঠিক, সাংস্কৃতিক বহুত্বের বিরুদ্ধে যারা খড়্গহস্ত, তাদের কাছে ব্যক্তিগত রুচির অধিকারের কথা বলে লাভ নেই। কিন্তু তাদের জানা উচিত, বঙ্গীয় রাজনীতির পরিসর আজও বহুত্ববাদকেই প্রাধান্য দেয়। চরম হিন্দুত্ববাদীদের বাইরে রয়েছে বিরাট অংশ, যাঁরা অসহিষ্ণু সংখ্যাগরিষ্ঠবাদী ভারতের অংশ হতে ইচ্ছুক নন। তাঁরা পথ খোঁজেন বাঙালি মননে, স্বামীজির বাণীতে, রবীন্দ্র ভাবনায়। গেরুয়া শিবিরের তা চর্চার সময় কোথায়? যে বঙ্গসন্তানরা আজ হিন্দুরাষ্ট্রের খোয়াবে মশগুল, তাঁরা ভেবে দেখতে পারেন, ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’কে সেই হিন্দুরাষ্ট্র তার প্রথম শ্রেণির নাগরিক হিসাবে গণ্য করবে কি?

পশ্চিমবঙ্গের চিরাচরিত রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্যের ভিত্তিতে ভোটের অঙ্কের বদলে বিজেপি ধর্মের ভিত্তিতে ভোটের অঙ্ক কষছে। বিজেপি ধর্মীয় পরিচিতির ভিত্তিতে ভোট করাতে চায়। বিজেপির এই রণকৌশল ২০১৬ এবং ২০২১-এর নির্বাচনে ব্যর্থ হয়েছে। ২০২১-এর ভোটে ভরাডুবির পর বাংলার ভোটের কান্ডারি কৈলাস বিজয়বর্গীও বলেছিলেন, ‘হারতে হারতেই একদিন আমরা জিতে যাব। বাংলায় এবার জিততে পারিনি ঠিকই, কিন্তু হিন্দুত্ব হাতছাড়া করলে কোথাও জিততে পারব না।’ ফলে বাংলার তিরিশ শতাংশ সংখ্যালঘুর ভোট পেতে বিজেপি আগ্রহী নয়। তাই এসআইআরে সংখ্যালঘু ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে বিজেপি। যতটা সম্ভব! শুধুমাত্র হিন্দু ধর্ম নয়, বিজেপির টার্গেট হিন্দুত্বের বিভাজন ঘটিয়ে এই বাংলায় উত্তর ভারতের ধর্মীয় সংস্কৃতি ও আচার-আচরণ কায়েম করা। যার মূল উদ্দেশ্য, সমস্ত পুজো ও ধর্মীয় আচরণেই আমিষ বর্জন করা, যা বাঙালির সংস্কৃতির সম্পূর্ণ বিরোধী।

অথচ, গেরুয়া শিবিরের নেতারা একবারও ভাবে না, বাঙালি সমাজ কোন ভিতের উপর দাঁড়িয়ে। কোন মতাদর্শকে বাঙালিরা পুজো করে। বিবেকানন্দ লিখেছেন, ‘যাঁর উদ্দেশ্য কেবল মাত্র ধর্মজীবন, তাঁর পক্ষে নিরামিষ, আর যাকে খেটে খুটে... জীবনতরি চালাতে হবে তাকে মাংস খেতে হবে বৈ কি।’ বিবেকানন্দ তাই অনায়াসে কবুল করেন ‘ঠাকুর রাম বা কৃষ্ণের মদ মাংস খাওয়ার কথা রামায়ণ মহাভারতে রয়েছে, সীতাদেবী গঙ্গাকে মাংস, ভাত আর হাজার কলসী মদ মানছেন!’ তবে বিবেকানন্দ সেকুলার ছিলেন না। তাঁর সেকুলার হওয়ার ইচ্ছে ছিল না। আবার সেকেলে সংকীর্ণ হিন্দুত্ববাদীদের মতো ওলবাটা-খাওয়া মুখ করে বসে থাকার মানুষও ছিলেন না। লোক ঠকিয়ে ব্যবসা জমানো অপবিজ্ঞানী ভট্টাচার্য পণ্ডিতের বর্ণনা দিতে গিয়ে বিবেকানন্দ লিখেছিলেন, ‘গুড়গুড়ে কৃষ্ণব্যাল ভট্টাচার্য মহাপণ্ডিত... বিশেষ টিকি হতে আরম্ভ করে নবদ্বার পর্যন্ত বিদ্যুৎপ্রবাহ ও চৌম্বুকশক্তির গতাগতি বিষয়ে তিনি সর্বজ্ঞ।’ হিন্দুমন্দিরের বর্ণনা দেন তিনি, ‘সনাতন হিন্দুধর্মের গগনস্পর্শী মন্দির— সে মন্দিরে নিয়ে যাবার রাস্তাই বা কত! আর সেথা নাই বা কি? বেদান্তীর নির্গুণ হতে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, শক্তি, সূর্যিমামা, ইঁদুরচড়া গণেশ, আর কুচ দেবতা ষষ্ঠী, মাকাল প্রভৃতি— নাই কি?’ বিবেকানন্দের হিন্দুরা মোটেই মোদি-শাহ ব্র্যান্ড নন। বিবেকানন্দ অতীত ভারতে মুসলিমদের অবদান ভুলে যাননি। ইসলামের ঐতিহ্য নিয়ে নানা ইতিবাচক কথা বলেছেন। বাঙালি মননে তাঁর উপস্থিতি সর্বত্র।

আর হিন্দুত্ববাদীদের কাছে রবীন্দ্রনাথের ‘দোষ’, তিনি সকলকে নিয়ে ‘ভারততীর্থ’ তৈরির কথা বলেছিলেন। ধর্মের দোহাই পেড়ে ভারতবাসীর মধ্যে ভেদাভেদ করার বিরোধী ছিলেন। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মে তাঁর মতি বা গতি ছিল না। মানবিক কল্যাণে মনঃসংযোগই ছিল তাঁর ধর্মাচরণের পথ। ঠিক এই কারণেই আজকের ভারতে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতাবাদীদের তাঁর প্রতি চরম বিদ্বেষ। বাঙালি সমাজকে দ্বিধাবিভক্ত করে তাঁকে দুর্বল করার প্রচেষ্টা, প্রধানত বাংলার বাইরের হিন্দুত্ব-নেতৃত্বের উদ্যমে। অথচ, এই হিন্দুত্বের রাজনীতিতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উন্নয়নের কথা বরাবরই ধামাচাপা পড়ে যায়। বিজেপির প্রচারে হিন্দু ভোটকে এককাট্টা করার কথা থাকে। কিন্তু বিজেপি ক্ষমতায় এলে রাজ্যে কীভাবে শিল্পায়ন হবে, তার কোনও দিশা মেলে না। বিজেপি তৃণমূলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলে। কিন্তু তৃণমূলে থাকতে সিবিআই-ইডির খাতায় নাম উঠে যাওয়া নেতারা বিজেপিতে গেলে কীভাবে তাঁদের বিরুদ্ধে সমস্ত তদন্ত বন্ধ হয়ে যায়, তা রহস্যই থেকে যায়।

ধর্মীয় মেরুকরণের চেষ্টা বিজেপি ২০২১-এও করেছিল। অমিত শাহ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, বিজেপি দু’শোর বেশি আসনে জিতে সরকার গড়বে। দু’শো দূর অস্ত, একশোও টপকাতে পারেনি। আজও বুথ স্তরের সংগঠন গড়ে ভোট যুদ্ধে তৃণমূলকে পরাস্ত করা বিজেপির পক্ষে অনেকটাই কঠিন। বিজেপি নেতারাও চান, সংগঠনে মন দেওয়ার বদলে যূথমানসের দিকেই বেশি মন দিতে। তাঁরা বুঝে গিয়েছেন, ধর্মীয় আবেগের কাছে মতাদর্শগত লড়াই দুর্বল হয়ে জনগণের ভরসার জায়গাটা কমে আসে। এতেই শক্তিবৃদ্ধি, সমর্থনবৃদ্ধি। তাই, যে বাংলায় কোনও দিন রামনবমী নামে উৎসবটির চল ছিল না, আজ রাতারাতি তা পালনার্থে তরবারিসজ্জিত গেরুয়া শিবির হইহই রবে মাতে। যে সময়টি বাংলার উৎসব তালিকায় কমনীয় বাসন্তী পূজার জন্য পরিচিত, সেই সময় রাম-স্লোগানে উজ্জীবন দেখা যায়। যে পুজোর সঙ্গে মিছিল কোনো অনুষঙ্গে জড়িত নয়, তাতে সশস্ত্র শৌর্যপ্রদর্শন হয়। ‘ধর্মোৎসব’ নামে বিজ্ঞাপিত এই ঘটনার মধ্যে ধর্ম-সংস্কৃতি খুঁজে পাওয়া একেবারে অসম্ভব। এতে প্রকট শুধু রাজনীতি-সংস্কৃতি। অন্তত পশ্চিমবাংলায় রামনবমী একটি রাজনৈতিক উৎসব হিসাবেই আত্মপ্রকাশ করেছে। যেখানে ধর্ম থেকেছে অবহেলিত, উপেক্ষিত, উৎপীড়িত, অসম্মানিত।

এই বিপজ্জনক সমাজ-বিভাজিকা ধর্ম-রাজনীতির মধ্যে যে ধর্মের থেকে কৌশল বেশি, হিন্দুত্ব-গোষ্ঠীগুলিও তা একবাক্যে স্বীকার করবে। ক্ষমতা কুক্ষিগত করবার জন্যই কৌশল জরুরি। প্রশ্ন হল, বাংলার হিন্দু সমাজ এই ধর্মরাজনীতিকে ধর্ম ভেবে তাতে যোগদান করবেন? এখনও পর্যন্ত রাজ্যের প্রশাসন ও বিরোধী দলগুলির ভূমিকার প্রশংসা করতে হয়। মুখ্যমন্ত্রী ও বিরোধী নেতারা ধর্মের নামে এই রাজনীতি-কৌশলের তীব্র সমালোচনা করছেন। হিন্দুধর্মের প্রথা ও সহনশীল ঐতিহ্যকে বাদ দেওয়া সশস্ত্র পরধর্মবিরোধিতা রোপণের বিপদ নিয়ে সরব হয়েছেন। বাংলার সংস্কৃতি কিংবা ধর্মসমাজের সঙ্গে যে এই অর্বাচীন সংখ্যালঘু বিদ্বেষের সম্পর্ক নেই, মুখ্যমন্ত্রী তা বারবার স্পষ্ট করে দিয়েছেন। এটাই আশার আলো।

হিন্দুত্বের ধারণা এবং কার্যক্রমগুলিকে বিজেপি দীর্ঘ দিন ধরে রাজনৈতিক অভিযানের কাজে লাগিয়ে এসেছে, সেই অভিযানের মধ্য দিয়েই সেগুলিকে ক্রমশ জোরদার করে তুলেছে এবং তার ভিত্তিতে সংখ্যাগুরু আধিপত্য নির্মাণ করেছে। আজ বাঙালিকেই ঠিক করতে হবে, তারা গেরুয়া শিবিরের ওই সংখ্যাগুরুতন্ত্রের কাছে নিজেদের বিকিয়ে দিতে চায়, নাকি যথার্থ উদার, ধর্মনিরপেক্ষ ও বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক আদর্শের পথে থাকতে চায়। ঠিক করতে হবে, বঙ্গের রাজনীতি মেরুকরণের কানাগলিতে ঢুকবে, না উন্নয়নের রাজপথে চলবে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ