Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

শর্তের নামে ‘ফাঁদ’ পেতেছে বিজেপি

শেক্সপিয়র বলেছিলেন, নামে কী এসে যায়! কিন্তু আমাদের প্রধানমন্ত্রীর কাছে নামই সব। জীবিত অবস্থায় নিজের নামে করিয়ে নিয়েছেন স্টেডিয়াম।

শর্তের নামে ‘ফাঁদ’ পেতেছে বিজেপি
  • ১৩ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

তন্ময় মল্লিক: শেক্সপিয়র বলেছিলেন, নামে কী এসে যায়! কিন্তু আমাদের প্রধানমন্ত্রীর কাছে নামই সব। জীবিত অবস্থায় নিজের নামে করিয়ে নিয়েছেন স্টেডিয়াম। কংগ্রেসের চালু করা ইন্দিরা আবাস সহ বহু প্রকল্পের নাম বদলে দিয়েছেন। বেশিরভাগের সঙ্গেই যোগ হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শব্দটি। সঙ্গে থাকছে ছবিও। নির্দেশ না মানলেই বন্ধ করে দেয় টাকা। এবার মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা প্রকল্পের নাম বদলে করা হল ‘পূজ্য বাবু গ্রামীণ রোজগার যোজনা’। বাপুজিকে ছেঁটে ফেলার সাহস না পেলেও প্রকল্পের সঙ্গে জুড়ে গেল নরেন্দ্র মোদির নাম। সবাই বলবে, ‘পূজ্য বাবু’ প্রকল্প চালু করেছেন মোদি। খাতায় কলমে বাড়িয়েছেন কাজের দিন। কিন্তু বেল পাকলে কাকের কী? প্রকল্পের নাম বদলালেও বাংলার গরিব মানুষের ভাগ্য বদলাবে না। কারণ বাংলায় কাজ চালুর জন্য নির্দেশিকার নামে যেভাবে প্যাঁচ কষা হয়েছে তাতে কাজ দেওয়ার চেয়ে আটকানোর অভিপ্রায় স্পষ্ট।

Advertisement

২০০৫ সালে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার মনরেগা প্রকল্প চালু করেছিল। উদ্দেশ্য, বছরে অন্তত ১০০ দিন গ্রামীণ মানুষের কাজ সুনিশ্চিত করা। আইনে বলা আছে, আবেদনের ১৫ দিনের মধ্যে জবকার্ডধারীকে কাজ দিতে হবে। কাজের ব্যবস্থা করতে না পারলে দিতে হবে ‘বেকার ভাতা’। কিন্তু একুশে বাংলা দখলের স্বপ্ন চুরমার হতেই মোদি সরকার দুর্নীতির অজুহাতে সেবছর ডিসেম্বরেই বন্ধ করে দেয় প্রকল্প। অথচ এই বিজেপি সরকারই তার আগের বছর পর্যন্ত বাংলাকে এই প্রকল্পে দেশের সেরার স্বীকৃতি দিয়েছে। একবার নয়, দু’বার নয়, টানা চার বছর। তাই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, দেশের সেরা বাছাইয়ে গলদ ছিল, নাকি কর্মসংস্থান ও সম্পদ সৃষ্টিতে ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারগুলিকে বারবার টেক্কা দিচ্ছিল বলেই বাংলাকে দেখানো হল ‘লালকার্ড’?
দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর কলকাতা হাইকোর্ট এবছর ১ আগস্ট থেকে বাংলায় ১০০ দিনের কাজ শুরুর নির্দেশ দিয়েছিল। কেন্দ্রীয় সরকার তার বিরুদ্ধে  গিয়েছিল সুপ্রিম কোর্টে। সেখানেও ধাক্কা খায়। ৭ নভেম্বর দেশের শীর্ষ আদালত জানিয়ে দেয়, অবিলম্বে কাজ চালু করতে হবে। তখন অনেকে ভেবেছিলেন, সামনেই বাংলা দখলের ভোট। তাই আদালতের রায় মেনে কেন্দ্রীয় সরকার বন্ধ রাখা কাজ চালু করবে। কিন্তু তাঁরা যে বিজেপিকে চিনতে ভুল করেছেন, সেটা মোদি সরকার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। কেন্দ্রীয় সরকার কাজ চালুর ব্যাপারে এমন নির্দেশিকা পাঠাল যাকে ‘শর্ত’ না বলে ‘ফাঁদ’ বলাই ভালো। 
কেন্দ্র বলেছে, জবকার্ডধারীদের ১০০ শতাংশ কেওয়াইসি বাধ্যতামূলক। ভালো কথা। দুর্নীতি আটকাতে এই নির্দেশ সরকার দিতেই পারে। ভুয়ো জবকার্ড ঠেকানোর জন্য এই নির্দেশ জরুরি। কিন্তু, সেটা কেবল বাংলার জন্য কেন? বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশ, গুজরাত, মধ্যপ্রদেশ কেন বাদ যাবে? ভুয়ো জবকার্ডের তালিকার শীর্ষে তো যোগীজির রাজ্য। ২০২২-’২৩ অর্থবর্ষে দেশে ভুয়ো জবকার্ড ধরা পড়েছিল ৭লক্ষ ৫৯ হাজার। তার মধ্যে ২লক্ষ ৯৯ হাজারই উত্তরপ্রদেশের। বাংলার ছিল ৫২৬৩টি। পরের বছর উত্তরপ্রদেশে আরও বাতিল হয়। সেখানে বাংলায় ৭১৯টি। ২০২৪-’২৫ অর্থবর্ষে উত্তরপ্রদেশে ৩৪২১টি, আর বাংলায় মাত্র দু’টি। তাহলে ওই রাজ্যে কাজ বন্ধ হবে না কেন? কেন বাংলার জন্য দেওয়া হবে বিশেষ নির্দেশিকা? এটাই কি প্রধানমন্ত্রীর বাংলাপ্রীতির নমুনা?
নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ২০ লক্ষ টাকার বেশি কোনও কাজ অনুমোদন করা যাবে না। সেক্ষেত্রে বড়ো কোনও রাস্তা নির্মাণ বা খাল, বাঁধ সংস্কারের কাজ এই প্রকল্পে করা যাবে না। ২০ লক্ষ টাকা ফুরিয়ে গেলেই মাঝপথে কাজ বন্ধ করে দিতে হবে। সেক্ষেত্রে বহু কাজ অর্ধসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে থাকবে। তাতে সরকারি টাকা জলে যাবে। মানুষের কাজে আসবে না।
একুশের নির্বাচনে বিজেপি দুরমুশ হওয়ার পরই দুর্নীতির অজুহাতে বাংলায় ১০০ দিনের কাজ বন্ধ করে দিয়েছে মোদি সরকার। দুর্নীতি ইশ্যুতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিলে গোটা দেশ তাকে সমর্থন করবে। কিন্তু সেটা করলে তো উত্তরপ্রদেশের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর নিজের রাজ্য গুজরাতেও ১০০ দিনের কাজ বন্ধ করে দিতে হয়। বাংলায় দুর্নীতির অভিযোগ কিছু পঞ্চায়েত প্রধান, কর্মী ও অফিসারের বিরুদ্ধে। কিন্তু গুজরাতে? সেখানে অভিযোগ উঠেছে খোদ পঞ্চায়েত রাষ্ট্রমন্ত্রী বচুভাই খাবড়ের দুই ছেলের বিরুদ্ধে। ২০২১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তাঁর দুই ছেলে ৭১ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। সেই অভিযোগে মন্ত্রীর দুই ছেলে জেলে। কারণ তাঁদের গায়ে লেগে যাওয়া দুর্নীতির পিচ এমনভাবে লেপ্টে আছে যে বিজেপির ‘ওয়াশিং মেশিনে’ও তা ধোয়া সম্ভব হয়নি।
এরপরেও বিজেপির কেউ বলতে পারেন, ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়ে চলে বলেই দলের মন্ত্রীপুত্রদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দুর্নীতি করলে কাউকে ছাড়া হয় না। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, গুজরাতে কেন ১০০ দিনের কাজ বন্ধ হবে না? সেখানেও তো দুর্নীতি ধরা পড়েছে। সেই পরিমাণটা বাংলার থেকে কোনও অংশে কম নয়, বরং বেশিই। 
রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী প্রদীপ মজুমদারের কথায়, ‘দু’শো আসনের স্বপ্ন চূর্ণ হওয়ায় বিজেপি এরাজ্যের গরিব মানুষের পেটের ভাত কেড়ে নিয়েছে। বঙ্গ বিজেপির নেতরা প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন, একটা ফোন করলেই বাংলায় ১০০ দিনের কাজ শুরু হয়ে যাবে। তাতেই বোঝা যাচ্ছে, দুর্নীতিটা অজুহাত মাত্র। আসল উদ্দেশ্য প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা।’
এতদিন ১০০ দিনের কাজের বাজেট ও পরিকল্পনা করার জন্য সময় পাওয়া যেত এক বছর। কিন্তু কলমের একটা খোঁচায় সেটা ত্রৈমাসিক করা হয়েছে। তিন মাসের জন্য কাজের পরিকল্পনা করতে হবে। সেই কাজ হলে ফের তিন মাসের পরিকল্পনা জমা দিতে হবে। তবে, আগের কাজে কোনও গলদ থাকলে বন্ধ হবে টাকা দেওয়া। অনেকে বলছেন, কেন্দ্রীয় সরকার আদালতকে বোঝাতে চাইছে, তারা কাজ শুরুর পক্ষে। কিন্তু বাস্তবটা হল, তারা সেটা চায় না। সেই জন্য তারা এমন কিছু ‘শর্ত’ চাপাচ্ছে যাতে যে কোনও সময় ফের কাজ বন্ধ করে দিতে পারে। অর্থাৎ শুরুর আগেই কাজ বন্ধ করার রাস্তা পাকা করে রাখছে। উদ্দেশ্য, ছাব্বিশের নির্বাচনের মুখে কাজ বন্ধ করে দিয়ে রাজ্যের শাসক দলকে আরও বিপাকে ফেলা। দুর্নীতির অভিযোগকে সপ্তমে তোলা।
বিজেপি যে ১০০ দিনের কাজ চালু করা নিয়ে প্যাঁচ কষছে, সেটা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝে গিয়েছেন। সেই কারণেই কেন্দ্রের দেওয়া শর্তের প্রতিলিপি ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে তিনি জানিয়েছেন, ‘এটা বাংলার প্রতি বিজেপি সরকারের অসম্মান। যেভাবে আবাস যোজনায় বাড়ির টাকা দিয়েছেন, জবকার্ডধারীদের বকেয়া মিটিয়েছেন, একইভাবে ১০০ দিনের কাজ চালিয়ে যাবেন। কেন্দ্রীয় সরকারের ভিক্ষে তাঁর দরকার নেই।’ একথার অর্থ, ছাব্বিশের ভোটে বিজেপি এসআইআর, ধর্মকে হাতিয়ার করলেও তৃণমূল লড়তে চলেছে রাজ্যের প্রতি কেন্দ্রের বঞ্চনা ও মানুষের রুটিরুজিকে সামনে রেখে।
কেন্দ্রের দেওয়া শর্তে বলা হয়েছে, কোনও গ্রাম পঞ্চায়েতে একসঙ্গে ১০টির বেশি কাজ করা যাবে না। কিন্তু, এরাজ্যের অধিকাংশ পঞ্চায়েতে গ্রাম সংসদের সংখ্যা ১৫ থেকে ২২। তারমধ্যে ১০টি এলাকাকে কাজের জন্য বাছতে গেলেই বাধবে বিরোধ। যাঁরা কাজ পাবেন না তাঁরা পঞ্চায়েত অফিসে গিয়ে বিক্ষোভ দেখাবেন। তাতে হতে পারে আইনশৃঙ্খলার অবনতি। পরিস্থিতির সুযোগ নেবে বিরোধীরা। পাশাপাশি এলাকা অর্ধেক করে দিলে ১০০ দিনের কাজের সংখ্যাটা ৩০ থেকে ৩৫ দিনে নেমে আসবে। তাতে গরিব মানুষ মরবে, কিন্তু ফুলেফেঁপে উঠবে কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থভাণ্ডার। অবশ্য, এটা নতুন কিছু নয়। রবীন্দ্রনাথ সেই কবে বলে গিয়েছেন, ‘রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।’
তবে এই শর্ত চাপানোর পিছনে আরও একটা উদ্দেশ্য আছে। কী সেই উদ্দেশ্য? রাজ্যের সিংহভাগ পঞ্চায়েত তৃণমূলের দখলে। কাজ শুরু হলেই প্রত্যেক সদস্য নিজের এলাকার রাস্তা, খাল সংস্কারের জন্য মরিয়া হয়ে উঠবে। তাতে ১০০দিনের কাজ নিয়ে শাসক দলের সদস্যদের মধ্যেই বেধে যাবে লড়াই। ফলে তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব যেমন বাড়বে, তেমনি শাসক দলের বিরুদ্ধে তৈরি হবে কাজ না পাওয়া গরিব মানুষের ক্ষোভ।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, কেন্দ্রের দেওয়া শর্তের মধ্যে এটাই সবচেয়ে বড় ‘ফাঁদ’। এক অস্ত্রে শাসক দলকে দু’দিকে কাটার চাল চেলেছে বিজেপি। আর প্রশ্নটা এখানেই, এই মোক্ষম চালটা ‘বাঙালি কাঁকড়া’দের মস্তিষ্কপ্রসূত, নাকি ‘বেওসায়ি’ বিজেপির?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ