সুখেন্দু পাল বর্ধমান
সুখেন্দু পাল বর্ধমান
‘আমাদের ভোটার তালিকায় নাম থাকবে তো...?’ রবিবার ছিল ছুটির দিন। দলের তেমন কোনও কর্মসূচিও ছিল না। ছুটির মেজাজে বাড়িতে সময় কাটাচ্ছিলেন জৌগ্রামের দাপুটে এক বিজেপি নেতা। আচমকা তাঁর দুয়ারে হাজির পুরুষ-মহিলা মিলিয়ে পাড়ার বেশ কয়েকজন। নেতাকে ঘিরে ধরে সবার একটাই প্রশ্ন—‘এখানে এসআইআর শুরু হলে ভোটার তালিকায় আমাদের নাম থাকবে তো! কেননা, বিহারে বহু ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। তাই, জানতে এসেছিলাম।’ এলাকায় নানা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ওই নেতার মুখে খই ফুটলেও পাড়ার লোকেদের এমন প্রশ্নে একেবারে নীরব। আমতা আমতা করে কিছু বলার চেষ্টা করেছিলেন। তাতে খুব একটা লাভ হয়নি দেখেই ‘জরুরি কাজ’ রয়েছে বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। এটা একটা টাটকা উদাহরণ মাত্র। এভাবে জেলার গেরুয়া শিবিরের একাধিক নেতাকে নির্বাচন কমিশনের ‘স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন’ বা এসআইআর নিয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে। দলের কর্মীরাও জানতে চাইছেন নাম বাদ যাবে কি না। এমন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে গিয়ে অনেকটা ‘ধর্মসঙ্কট’-এর মধ্যে পড়েছেন পদ্ম নেতারা।
ইতিমধ্যেই পড়শি বিহারে এসআইআরের ঝাঁঝ এসে পড়েছে বাংলায়। কীভাবে এই বিশেষ নিবিড় সমীক্ষা করতে হবে, তা নিয়ে বিএলওদের প্রশিক্ষণও শুরু হয়ে গিয়েছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, বিহারের মতো বাংলাতেও এসআইআর করতে বদ্ধপরিকর নির্বাচন কমিশন। পূর্ব বর্ধমানে ওপার বাংলা থেকে বহু পরিবার এসে বসবাস করছেন। তাঁদের অনেকের কাছে কয়েক মাস আগে আধারকার্ড নিস্ক্রিয় হওয়ার চিঠি আসে। পরে রাজ্যের হস্তক্ষেপে সেগুলি পুনরায় চালু হয়। সেই আতঙ্কের মধ্যেই এসআইআর নিয়ে তৎপরতা। তাতে সিঁদুরে মেঘ দেখছেন তাঁরা।
চাষের কাজ সেরে বাড়ি ফিরছিলেন প্রণব বিশ্বাস। মশাগ্রাম স্টেশনের কাছে দাঁড়িয়ে তিনি বলছিলেন, ‘২০ বছর আগে বাংলাদেশ থেকে চলে এসেছি। ভোটার, আধারকার্ড রয়েছে। তারপর যদি আবার অন্য নথি চায়, তাহলে পাব কোথায়? এলাকার বিজেপি নেতাদের কাছে বিষয়টি জানতে চেয়েছিলাম। তাঁরা কোনও উত্তর দিতে পারেননি।’ পূর্ণিমা সরকার নামে মশাগ্রামের আর এক মহিলার উদ্বেগ, ‘শুনছি কাগজ দেখাতে না পারলে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দিয়ে দেওয়া হবে। এর আগে অনেকবার ভোট দিয়েছি। এখন কেন নতুন করে কাগজ দেখাতে হবে, সেটা বুঝতে পারছি না।’
রাজনৈতিক মহলের বক্তব্য, ‘নির্বাচন কমিশনের এসআইআরের সিদ্ধান্ত ঘিরে গেরুয়া শিবির এখন বেশ অস্বস্তিতে। কারণ, সবার কাছে এমন একটা ধারণা তৈরি হয়েছে, এনআরসি’র বৃহত্তর কর্মকাণ্ডের মুখপাত এসআইআর। আর সেটা সত্যি হলে ডিটেনশন ক্যাম্পে যাওয়ার ভয়। ইতিমধ্যেই রাজ্যের শাসকদল বিষয়টিকে হাতিয়ার করে ময়দানে নেমে পড়েছে। বিজেপি এখনও হাত গুটিয়ে বসে। তারা বুঝে উঠতে পারছে না, কীভাবে এসআইআর আতঙ্কের মোকাবিলা করবে? তাদের অবস্থা এখন অনেকটা ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’র মতো!