নিজস্ব প্রতিনিধি, শালবনী: বাবা ও মা দু’জনেই দিনমজুর। তাই মাত্র এগারো বছর বয়সেই বিয়ে দিয়েছিলেন পরিবারের সদস্যরা। বিয়ের পরে অভাবের তাড়নায় টোটো চালানোর পাশাপাশি সাঁওতালি লোকনৃত্যে পারদর্শী হয়ে ওঠেন শালবনী ব্লকের আসমানচক এলাকার বাসিন্দা বিজলি মুর্মু। মাথার উপর ১৩টি কলসি নিয়ে নাচ করে তাক লাগিয়ে দেন গ্রামবাসীদের। এবার সেই বিজলি আমেরিকার বিখ্যাত রিয়েলিটি শোয়ের অনলাইন অডিশনে বিচারকদের মুগ্ধ করল। তাই এবার তিনি আমেরিকায় নৃত্য প্রদর্শন করতে যাবেন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, দিনে আট থেকে দশ ঘণ্টা টোটো চালিয়ে সংসার চালান বিজলি। তারপরেও চলে নাচ নিয়ে কঠোর পরিশ্রম। ইতিমধ্যেই তিনি রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোসের কাছ থেকে পুরস্কৃত হয়েছেন।
এদিন বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে টোটো চালাচ্ছিলেন বিজলি। তিনি বলেন, ছোট থেকে খুব কষ্ট করেই বড় হয়েছি। অভাবের তাড়নায় পড়াশোনাটুকু করতে পারিনি। শ্বশুরবাড়িতে এসেও খুব সমস্যায় পড়েছিলাম। তবে কিছু করে দেখানোর ইচ্ছে ছিল বরাবরই। সেই ইচ্ছে শক্তির জোরে এগিয়ে চলেছি। আমেরিকান রিয়েলিটি শোতে অনলাইনে অডিশনে থাকতে পেরে আপ্লুত। ওঁরা আমার নৃত্য দেখে খুশি হয়েছেন। প্রসঙ্গত, বিজলির বাপের বাড়ি পূর্ব মেদিনীপুর জেলার পাঁশকুড়াতে। তাঁর বাবা জুটিরাম মুর্মু ও মা সরযূ হেমব্রম দিনমজুরের কাজ করতেন। তাঁদের একবেলার খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খেতে হতো। তাই কোনওদিন স্কুলের মাটিতেই পা দেননি বিজলি দেবী। প্রায় ৩০ বছর আগে মাত্র এগারো বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয়ে যায়। শালবনী ব্লকের আসমানচক এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে চলে এলেও অভাব পিছু ছাড়েনি। সেই সময় তিনিও দিনমজুরের কাজ করতে শুরু করেন। বিয়ের পর দুই পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। নিজে পড়াশোনা করতে না পারলেও দুই সন্তানকে শিক্ষিত করে তোলার বাসনা ছিল। তাই স্থানীয় স্কুলে ছেলেদের নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি হাতের কাজ শিখতে শুরু করেন। এরপর একসময় তাঁর মনে খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বাসনা জেগেছিল। কিন্তু সেই পথে না গিয়ে সাঁওতালি লোকনৃত্যকে তিনি বেছে নেন। শুরু হয় মাথার উপর কলসি নিয়ে নৃত্যের তালিম। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি সেই নৃত্যে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। ২০১৪ সালে নৃত্য পরিবেশন করে তিনি জাতীয় পুরস্কার পান। এরপর আর তাঁকে থেমে থাকতে হয়নি। একসময় তিনি বাংলাদেশে গিয়ে নৃত্যের অনুষ্ঠান করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন।
বিজলি বলেন, ছেলের স্কুলের অভিভাবকদের সঙ্গে গুলি-চামচ দৌড়ে নেমেছিলাম। সেই দৌড়ে প্রথম হওয়ার পরেই আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। বহু মানুষ আমার নৃত্যকলা দেখে প্রশংসা করেন। এটাই জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
স্থানীয় বাসিন্দা সানি রাম বলেন, ওঁর প্রতিভা রয়েছে। আমরা সকলেই চাই আমেরিকার মাটিতে গিয়ে উনি সাঁওতালি লোকনৃত্যকে তুলে ধরুন। সংসারে অভাব থাকলেও উনি মনের জোরে এগিয়ে গিয়েছেন। রাজ্য তৃণমূল যুব কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক সন্দীপ সিংহ বলেন, বিজলি দেবীর নৃত্যের প্রতিভা দেখে সকলেই মুগ্ধ হন।