সংসারে সমাজে নারীর টিকে থাকার লড়াই চিরকালীন। তাই তো তাকে দশ হাতে ধরতে হয় দশটি অস্ত্র। রক্ষা করতে হয় নিজেকে এবং আরও অনেক নারীকে। দেবীর বোধন আসলে নারীর অন্ধকার থেকে আলো হয়ে ওঠার কাহিনি। লিখলেন ঈশা দেব পাল।
সংসারে সমাজে নারীর টিকে থাকার লড়াই চিরকালীন। তাই তো তাকে দশ হাতে ধরতে হয় দশটি অস্ত্র। রক্ষা করতে হয় নিজেকে এবং আরও অনেক নারীকে। দেবীর বোধন আসলে নারীর অন্ধকার থেকে আলো হয়ে ওঠার কাহিনি। লিখলেন ঈশা দেব পাল।
এক নাবালিকা । কপালে চন্দন। মাথায় বিয়ের চেলি। ছুটে আসছে মাঠ পেরিয়ে, পথ পেরিয়ে। ছুটে আসছে তার ইস্কুলের প্রধান শিক্ষিকার কাছে। তার অভিযোগ জোর করে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে তার। সে বিয়ে করবে না। বাবা পরিযায়ী শ্রমিক। অল্প রোজগার। মেয়েটিই পরিবারের মধ্যে একমাত্র যে হাই স্কুলে পড়ছে। শান্ত স্বভাবের মেয়েটির আপত্তিকে আমল না দিয়েই বিয়ের আয়োজন হয়েছে তার। আর বিবাহের রাতেই সে পালাতে পেরেছে। তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন শিক্ষিকা। দাঁড়িয়েছে প্রশাসন। মেয়েটির বিবাহ বাতিল হয়েছে। বিবাহ নামের প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাহ্য করে মেয়েটি আত্মপ্রতিষ্ঠায় মন দিতে পারবে। মেয়েটির বাবাকে চাপ দিয়ে হলেও বোঝানো গিয়েছে। মেয়েটি উচ্চশিক্ষিত হওয়ার স্বপ্নকে আর একটু লালন করার সুযোগ পেয়েছে।
দুর্গাপুজোর মাত্র অল্প কদিন আগে পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার খবর। এমন খবর বিচ্ছিন্ন কিছু নয়, প্রায়ই আমরা পড়ি। হ্যাঁ, সেদিনই আসলে বোধন ঘটে গিয়েছে মায়ের। চেতনার উদ্বোধনে লড়াই করে জিতে গিয়েছে সেদিন মা দুর্গা। তিনি যাবতীয় দুর্গতি নাশ করেন বলেই তো দুর্গা। আর প্রতিবাদের আলো, উদ্বোধনের আলোই তাঁর আগমনি।
যদিও ভারতের পুরাণ ও ইতিহাসে অধ্যায়ের পর অধ্যায়ে লেখা রয়েছে মেয়েদের চোখের জলের গল্প। রামায়ণের ‘সীতা’-কে দিয়ে যার শুরু। রামের সঙ্গে বনবাস যাওয়ার জন্যে তাঁকেও ত্যাগ করতে হয়েছে রাজসুখ। স্বাভাবিক নারীজীবনের স্বাচ্ছন্দ্য। বনবাসে রাবণ তাঁকে হরণ করলে শ্রীরাম তাঁকে উদ্ধার করেন। আর এই উদ্ধারের আগে লঙ্কাবধের জন্যে শক্তি সঞ্চয় করতেই শ্রীরাম আয়োজন করেন মা দুর্গার পুজো। শরৎকালের এই অপ্রচলিত দুর্গাপুজোর জন্যই একে ‘অকাল বোধন’ বলা হল।
কিন্তু অযোধ্যায় ফিরে প্রজাদের তুষ্ট করার জন্য প্রজাবৎসল রাজন রামই নিজের স্ত্রী সীতাকে গর্ভবতী অবস্থায় বনবাসে পাঠান পুনরায়। লব-কুশের জন্মের পর সীতা অযোধ্যায় ফিরলে আবার অগ্নিপরীক্ষার আয়োজন হলে এবার সীতা সিদ্ধান্ত নেন। স্বামী রাম, শ্বশুরবাড়ি, তাঁর প্রিয় পুত্র সবকিছু ছেড়ে তিনি চলে যান মা বসুধার কাছে। এই চলে যাওয়া ছিল আত্মহত্যারই শামিল। পিতৃতন্ত্রের চাপিয়ে দেওয়া সব সিদ্ধান্ত যতটা হৃদয়হীন, ততটাই হৃদয়বিদারক সীতার এই চলে যাওয়া। এক্ষেত্রেও বিবাহ নামের প্রতিষ্ঠান আত্মসম্মানের বাধা হয়ে দাঁড়ালে তাকে বাতিল করে দেন তিনি।
সীতার এই বেদনা আর অপমানকে অনুভব করেই হয়তো মাইকেল মধুসূদন দত্তর ‘বীরাঙ্গনা’ কাব্যের ‘দশরথের প্রতি কেকয়ী’ আর ‘নীলধ্বজের প্রতি জনা’ পত্র দু’টিতে দুই স্ত্রী সংসার ত্যাগ করেন। জনা এবং কেকয়ী তাঁদের স্বামীদের ত্যাগ করে চলে যায় সংসার ছেড়ে, স্পষ্ট কারণে তাঁদের স্বামীদের অভিযুক্ত করেন। তাঁরা অভিমান নয়, অভিযোগের ভাষায় নিজেদের বিবাহকে অস্বীকার করে চলে যান একাকী জীবনে। মধুসূদন দত্ত উনিশ শতকের প্রেক্ষাপটে নারীর যে ব্যক্তিত্ব এবং আত্মাভিমানের ভাষা কল্পনা করেছিলেন, তা রামায়ণের যুগে বাস্তবত ছিল না। তাই ‘অকাল বোধন’-এ রামের সহায়তা করেছিলেন যে দুর্গতিনাশিনী, তিনিই শ্রীরাম এবং তাঁর পিতৃতন্ত্রের দুর্গতি থেকে উদ্ধার করেন সীতাকে। কিন্তু তাঁদের জিতিয়ে দেন উনিশ শতকের পুরুষ কবি।
অপমান, যন্ত্রণা কিংবা মানসিক দুর্বলতার সংকট থেকে ত্রাণ তিনি মহাভারতের কাহিনিতেও করেন। বারো বছরের বনবাস পর্ব শেষ হলে পাণ্ডবরা দ্রৌপদী সহ বিরাট নগরে প্রবেশ করলেন ছদ্মবেশে। একবছর লুকিয়ে কালযাপনের জন্য। শর্ত ছিল এমনই, কৌরবরা যদি একবার তাঁদের ছদ্মবেশ ধরে ফেলে, গুপ্তচর মারফত খবর পেয়ে সন্ধান পায় তাঁদের, তাহলে আরও বারো বছর বনবাসে যেতে হবে। এই অহরহ ভয়, মানসিক সংকট থেকে ত্রাণ পেতেই সেদিন যুধিষ্ঠির দুর্গাকে স্মরণ করে বলেছিলেন— আগমন্মনসা দেবীং দুর্গাং ত্রিভুবনেশ্বরীম। মহাভারতের টীকাকার ব্যাখ্যা করেছিলেন এই শ্লোককে এভাবে— যিনি দুরূহ সংকট থেকে ত্রাণ করেন তিনিই দুর্গা।
অর্থাৎ শারীরিক এবং মানসিক উভয় সংকটেই মা দুর্গা স্মরণীয়। তিনি মহামায়া, তিনিই পার্বতী। পৃথিবীতে যাবতীয় নারীর সত্যের জন্য যুদ্ধেও তাই তিনি সঙ্গ দেন। নারীর অবমাননা তাঁরই বেদনা। তাঁকে আলাদা করে পুরাণ শাস্ত্রে খুঁজতে চাওয়া বৃথা। নারীর জয় পরাজয় তাঁরই অসুরদলন অথবা পরাজয়। তবে মহাভারতে তিনি স্বয়ং কৃষ্ণের বড়দিদি। কংস তাঁকে হত্যা করতে গেলে তিনি, ‘তোমাকে বধিবে যে/ গোকুলে বাড়িছে সে’ বলে ত্রস্ত করেন।
এই ক্রোধ, এই শাসন বহন করেছিলেন মহাভারতের নায়িকা স্বয়ং দ্রৌপদীও। তাই তাঁর বস্ত্রহরণ ম্লান হয়ে যায় তাঁর প্রতিজ্ঞার কাছে। পঞ্চ স্বামীর স্ত্রী রাজবধূ নারীটি প্রতিজ্ঞা করেন যতদিন না দুঃশাসনের রক্ত দিয়ে চুল ধুতে না পারছেন, তিনি প্রসাধন করবেন না, চুল আঁচড়াবেন না। পাঁচ স্বামী রাজ্য ছেড়ে গেলে তিনিও রাজসুখ ছেড়ে, সন্তানসুখ ছেড়ে তাঁদের সঙ্গে যান শুধু এই কারণেই যে স্বামীরা যাতে কোনওভাবে এই প্রতিজ্ঞার লক্ষ্যভ্রষ্ট না হন। ভারত জানে দ্রৌপদীর এই ইচ্ছাপূরণের গল্প। তাই দুর্গতিনাশিনী তখন তিনিই।
ভারতের ইতিহাসে ঠিক যতটা আছে মেয়েদের পরাজয়ের কথা, ততটাই আছে তাদের লড়াই আর জয়ের গল্পও। মেয়েদের যাবতীয় অবমাননায় যেমন দেখি তাঁর অশ্রু, পরমুহূর্তেই দেখি তাঁর ক্রোধ ছড়িয়ে পড়েছে দিকে দিকে। সেই দিগ্বিদিগ ক্রোধেই তাঁর পূজার উৎসব। সেই ক্রোধ ধারণ করেই পুরুষের হাতে নিগৃহীত সকল নারীই অকুতোভয় ও নির্ভীক হয়ে ওঠেন। সেই অনির্বাণ ক্রোধই জন্ম দেয় একজনের বিনিময়ে লক্ষ লক্ষ বীরাঙ্গনা নারীকে।
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর সংকলিত ‘টুনটুনির বই’-তে সেই টুনটুনি পাখিটির কথা মনে আছে, যে রাজতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করে বলেছিল— রাজার ঘরে যে ধন আছে/টুনির ঘরেও সে ধন আছে। রাজা হাজার চেষ্টা করেও ধরতে পারেন না সেই পাখিটিকে। একবার ধরে সাত রানির কাছে এনে দিলে রানিরা তাকে নিয়ে দেখাদেখি করতে গেলে পাখি উড়ে যায়। রাজার ভয়ে কম্পমান সাত রানি একটা ব্যাঙ ভেজে খেতে দেয় রাজাকে আর টুনটুনি তখন বাইরের জানালা থেকে বলে— কী মজা কী মজা/ রাজা খায় ব্যাঙ ভাজা... রাজা সাত রানির নাক কাটে এবং গল্পের শেষ অবধি পাখিটকে ধরতে পারে না, বরং পাখিকে মারতে গিয়ে নিজের নাক কেটে যায়। আপামর বাঙালির স্মৃতিতে থাকা এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় রাজার হারেমে থাকা ‘স্ত্রী’ পরিচয়ে বন্দিনী নারীদের কথা। যাদের হাত থেকে একটা পাখি উড়ে গেলে তাদের নাক কেটে শাস্তি দেন রাজা। আর টুনটুনি যেন সেই প্রতিবাদিনী স্বাধীন মেয়েটি যে রাজতন্ত্র তথা পুরুষতন্ত্রকে নস্যাৎ করে উড়ে যায় এক ডাল থেকে অন্য ডালে। এই ডানার অভাবেই তো মেয়েরা কখনও মুখ থুবড়ে পড়ে, কখনও নিজেকে বিস্তার দেয় বৃহত্তর জগতে। রাজসুখ ভোগ করার জন্য রাজার অধীনে থাকার চেয়ে মুক্ত স্বাধীন জীবন যে অনেক শক্তিশালী টুনটুনি বুঝিয়ে দেয় তার গল্পে।
এই ডানা থাকার মানসিক শক্তিই তো এক এক নারীকে পূর্ণ করে তোলে। পৌঁছে দেয় সাফল্যের চূড়ায়। আর একটি লোককথায় আছে এক বৃদ্ধ রাজা তাঁর তিন মেয়েকে জিজ্ঞেস করছেন, তারা কার ভাগ্যে খায়? বড় দুই মেয়ে বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতা দেখালেও ছোট মেয়ে বলে— সে নিজের ভাগ্যে খায়। রাজা তাকে রাজ্য থেকে তাড়িয়ে দিয়ে এই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় যে ভাগ্যের জোর থাকলে সে নিজের ভাগ্যে খেয়ে দেখাক। এবং সত্যিই নানা লড়াই কষ্টের পর সে প্রচুর অর্থ উপার্জন করে বড়লোক হয় এবং একদিন দরিদ্রদের ভোজন করানোর আয়োজন করলে রাজ্যহীন সম্বলহীন বাবাকে হতদরিদ্রদের দলে আবিষ্কার করে। পরবর্তীতে সে বাবা এবং বোনদের দায়িত্ব নেয়। রূপকথা আর লোককথায় নারীমনের একাধিক ইচ্ছায় প্রতিফলিত গড়ে ওঠা কাহিনির এই মেয়েটিই কি সেই অভীপ্সিত মেয়েটি নয়, যে নিজের ভাগ্য নিজে গড়তে এগিয়ে আসতে চায় বহুকাল ধরে? যাকে আমরা আমাদের চারপাশেই দেখি নিত্য।
পুরাণে শিবকন্যা মনসারও তো ছিল বাবার বিরুদ্ধে জেহাদ। জারি ছিল তাঁর লড়াই। এই ব্যক্তিত্বকে, এই স্বাধীন সত্ত্বাকে পুরুষতন্ত্র স্বীকৃতি দেয়নি পুরাণ থেকেই। বরং চাঁদবেনের বাঁ হাতে পুজোর গল্পই যুগে যুগে প্রচলিত।
শুধু তো রূপকথাতেই নয়, বাস্তবে যে এমন নারীর দেখা বিরল হলেও সত্য। ঠাকুর পরিবারের মেয়ে সরলা দেবী চৌধুরাণীর গান কবিতার পাশাপাশি তরবারি চালনাতেও ছিল সমান দক্ষতা। শুরু করেছিলেন বীর রাজা প্রতাপাদিত্য উৎসব। সক্রিয় স্বদেশি আন্দোলনে যুক্ত হয়ে চেয়েছিলেন যুবসমাজের মধ্যে বীররস সিঞ্চন করতে। ভারতবর্ষের স্বদেশি আন্দোলনে মেয়েদের ভূমিকা খতিয়ে দেখলে দেখা যায় কী বিপুল শক্তির অধিকারিণী তাঁরা। অরন্ধন উৎসব চালুই হয় মেয়েদের সক্রিয় সহযোগিতায়। চিত্তরঞ্জন দাশ পথে নেমে স্বদেশি আন্দোলন করলে সেকালের ভদ্র পরিবারের মেয়েদের সঙ্গে পতিতারাও শামিল হয়েছিলেন এবং স্বীকৃতি পেয়েছিলেন সমান শ্রদ্ধায়। সেকথার উল্লেখ আছে ‘শিক্ষিতা পতিতার আত্মচরিত’-এ। মেয়েদের লড়াই অবশ্য শুধুই পিতৃতন্ত্র বা পুরুষের বিরুদ্ধে নয়, নারীর লড়াই চলতে থাকে তার নিজের সঙ্গেও।
নারীর অতি অনুভূতিপ্রবণ মন, তার আজন্ম লালিত সংস্কার, তার উপর চাপিয়ে দেওয়া প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কিছু রক্ষণশীলতা, তার স্ত্রী এবং মা হিসেবে সার্থক হওয়ার দায় এবং তার নানা শারীরিক সংকট— নানা বিরুদ্ধশক্তি। এত কিছুর সঙ্গে যুদ্ধও তো কম কঠিন নয়! তাই নারীর দশ হাতে ধরতে হয় দশটি অস্ত্র। রক্ষা করতে হয় নিজেকে এবং আরও অনেক নারীকে। দুর্গা দুর্গতিনাশিনী হয়ে পথ দেখাতে হয়, চিনিয়ে দিতে হয় ভারসাম্যের উপায়। তাই দুর্গার এক হাতে লীলাকমল, অন্য হাতে ত্রিশূল একইসঙ্গে বিরাজ করে। একইসঙ্গে তিনি চণ্ডী আবার অন্নপূর্ণাও। তাঁর বোধন বস্তুত উদ্বোধন। অন্ধকার থেকে আলো হয়ে ওঠা।