সুখেন্দু পাল, রায়না: একসময় গ্রামে কারও বাড়িতে ঢেঁকি থাকলে তার কদর ছিল অন্যরকম। ভোর থেকে মহিলারা ধান থেকে চাল তৈরি করতেন। শত শত বছরের প্রাচীন এই সংস্কৃতি। কিন্তু যন্ত্রের যুগে ঢেঁকির কদর কমে যায়। এখন মেশিনে ধান দিলে কয়েক মিনিটেই তৈরি হয়ে যায় চাল। কিন্তু ঢেঁকিতে ভাঙা চাল বা চালের গুঁড়ির স্বাদ ছিল অন্যরকম। গোবিন্দভোগ ধান ঢেঁকিতে দিলে চারদিকে সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ত। চালের সেই স্বাদ ফিরিয়ে দিতে উদ্যোগী রায়নার সীমা মণ্ডল, রিম্পা ঘোষ, নাসিমা খাতুনরা। বাড়িতে ঢেঁকি বসিয়ে তাঁরা সুগন্ধি ধান থেকে চাল তৈরি করছেন। বিক্রি করছেন সৃষ্টিশ্রীর মতো সরকারি মেলাগুলিতে। এছাড়া, ভিনরাজ্য থেকেও অর্ডার আসছে। গোবিন্দভোগ চাল প্যাকেটজাত করে তাঁরা কেরলে পাঠাচ্ছেন। তাতে তাঁদের লক্ষ্মীলাভ হচ্ছে।
সীমা মণ্ডল বলেন, আমরা প্রায় ৩০০ জন মহিলা মিলে গোবিন্দভোগ ধান চাষ করছি। কাটা, ঝাড়াই সবকিছুই আমাদের দায়িত্বে। পরে সেই ধান থেকে ঢেঁকিতে চাল তৈরি করছি। চালের গুঁড়িও তৈরি হচ্ছে। পরিশ্রম বেশি করতে হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু লাভ পাওয়া যাচ্ছে। নাসিমা খাতুন বলেন, বিভিন্ন মেলায় চালের গুঁড়ি বিক্রি করছি। এছাড়া প্যাকেটে ভরেও চাল বিক্রি করা হচ্ছে। কয়েকটি রাইসমিলের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। তাদের মাধ্যমেই চাল বিভিন্ন রাজ্যে যাচ্ছে।
রিম্পা ঘোষ বলেন, আমরা বাড়িতেই ঢেঁকি বসিয়ে নিয়েছি। কীভাবে গোবিন্দভোগ চাষ করতে হবে, তা নিয়ে প্রশাসনের তরফে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। কালো ধান চাষ করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এই চালেরও কদর রয়েছে। সামনের মরশুমে বিভিন্ন গ্রামে এই ধান চাষ করা হবে।
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, মহিলাদের স্বনির্ভর করতে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বড়দিনের মরশুমে কয়েকটি স্বনির্ভরগোষ্ঠী কেক তৈরি করে আয় করেছে। তাদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া, বেশ কয়েকটি গোষ্ঠীর মহিলাদের গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তাঁরা আগামী দিনে গাড়ি চালিয়ে স্বনির্ভর হবেন।
রায়না-২ ব্লকের সীমা, রিম্পারা গোবিন্দভোগ ধান চাষ করে স্বনির্ভর হচ্ছেন। তাঁরা বলেন, গোবিন্দভোগ চালের চাহিদা সবসময় বেশি থাকে। যাঁরা ভোজন রসিক তাঁরা ঢেঁকিতে ভাঙা চাল পছন্দ করেন। মেশিনের থেকে ঢেঁকিতে ভাঙা চালের গুণমান বেশি। অনেকে বাড়ি থেকে এই চাল কিনে নিয়ে যান। এছাড়া, রাজ্য সরকারও যথেষ্ট সহযোগিতা করছে। বিভিন্ন মেলায় চাল বিক্রির জন্য স্টল তৈরির সুযোগ করে দেয়। এখন বিভিন্ন জায়গায় মেলা চলছে। সেখানে ঢেঁকি বসিয়ে সবার চোখের সামনে চাল তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে। এই চালের গুঁড়ি থেকে তৈরি পিঠের স্বাদও অন্যরকম।
সৃষ্টিশ্রী মেলায় সীমাদের স্টল। মঙ্গলবার কৃষ্ণ প্রধানের তোলা ছবি।