Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বাংলার গর্বে আঘাত

ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক দেশ। দেশজুড়ে নানা ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের বসবাস

বাংলার গর্বে আঘাত
  • ১১ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক দেশ। দেশজুড়ে নানা ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের বসবাস। এত বিভিন্নতা কোনওভাবেই বিভাজনের সূচক নয়, বরং এই দেশের এক ঈর্ষণীয় সৌন্দর্য। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যই এই দেশের শক্তি এবং অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের সূত্র। ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি এবং অঞ্চল ভেদে ভারতবাসীর আচার আচরণ, উৎসব পালন, যাপনরীতি প্রভৃতি বিচিত্র। কিন্তু এগুলির কোনওটিই কারও জন্য সংঘাতের উৎস বা অশান্তির কারণ নয়, বরং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের এক অফুরান ভাণ্ডার। প্রতিবেশীর সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত এবং সম্পৃক্ত হওয়ার দুর্লভ সুযোগ আমাদের প্রত্যেকের সামনে উন্মুক্ত। কিন্তু সেই সুযোগ গ্রহণ করে সমৃদ্ধ হওয়ার পরিবর্তে, কেউ কেউ নিজেদের দরজা জানালা অন্যদের সামনে বন্ধ রাখার মতো মূর্খামি করছি! আমরা এমনই হভভাগ্য জন! ভুলে যাচ্ছি যে, ভারতবর্ষ এই ঐতিহ্য আগলে রেখে সারা পৃথিবীকে বিস্মিত করে চলেছে প্রাচীনকাল থেকেই। আর সেই পর্যবেক্ষণ থেকেই রবীন্দ্রনাথ কাব্যিক বর্ণনা রেখে গিয়েছেন, ‘দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে’। 

Advertisement

কিন্তু কতিপয় উগ্র ধর্মান্ধ লোকজন ভারতের এই মহান ব্যবস্থার মূলে কুঠারাঘাত করতে যেন মরিয়া। একবার ভারত ভাঙা থেকেও শিক্ষা নেয়নি তারা। দিকে দিকে বিচ্ছিন্নতাবাদের কারণ ব্যাখ্যার নামেও বিভ্রান্তিকর তত্ত্ব ছড়ায় এই শক্তি। তারা ভেবে দেখছে না উগ্র দেশপ্রেমের বিস্তারের নামে দেশটাকে ক্রমে দুর্বল এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকে দেউলিয়া করে তুলছে। এসব করা হচ্ছে কখনও পোশাকের দোহাই পেড়ে, কখনও খাদ্যের নামে কিংবা উপাসনা পদ্ধতির বিশিষ্টতার কারণে। মোদিযুগে এই ব্যাধির কিছু দৃষ্টান্ত প্রথম রেখেছে উত্তর ভারতের একাধিক রাজ্য। মোদি-শাহের রাজ্য গুজরাত এবং দক্ষিণ ভারতেও বিজেপি প্রভাবিত কিছু স্থানে এই রোগসংক্রমণজ্বালা আমাদের পীড়া দিয়েছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের অসম এবং ত্রিপুরায় বিজেপি সরকার তৈরি হওয়ার পর ধর্মীয় ঘৃণার রাজনীতি সেখানকার পবিত্র জনসমাজকে কলুষিত করেছে। একাধিক তুচ্ছ অজুহাতে হিন্দি বলয়ে প্রাণহানির মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটে গিয়েছে ইতিমধ্যে। তবে এই ব্যাপারে স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে ধারাবাহিকভাবে স্বস্তিতেই ছিল আমাদের পশ্চিমবঙ্গ। অন্তত এখানে কেউ কারও উপর ফতোয়া জারি করার দুঃসাহস দেখায়নি। 
কিন্তু সেই গর্বের বাঁধ এক লহমায় ভেঙে গেল গত রবিবার (৭ ডিসেম্বর)। গীতাপাঠের অনুষ্ঠানে কেন আমিষ খাবার বিক্রি করা হচ্ছে? এই নিয়ে অনুষ্ঠান শেষে ধুন্ধুমার কাণ্ড ঘটানো হল ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে। কপালে তিলক, মাথায় গেরুয়া ফেট্টি বাঁধা একঝাঁক লোকের হাতে বেধড়ক প্রহৃত হলেন দুই প্যাটিস বিক্রেতা। বলার অপেক্ষা থাকে না যে, তাঁরা দু’জনেই গরিব এবং ঘুরে ঘুরে খাবার বিক্রিই তাঁদের একমাত্র পেশা। এই কাজ ছাড়া তাঁদের পরিবারের ভরণপোষণের অন্য উপায় নেই। তবু ওই ধর্মান্ধরা তাঁদের উপর নৃশংস আক্রমণ করেছে। এমনকি মারধর করেই ক্ষান্ত দেয়নি দুর্বৃত্তরা, তাঁদের প্যাটিস ভরতি ডালাও উলটে ফেলে দেওয়া হয়েছে! অর্থাৎ নষ্ট করে দেওয়া হয় তাঁর সমস্ত বিক্রয়যোগ্য সামগ্রী বা খাবার। অথচ ওই দুই ব্যক্তি ময়দান চত্বরে খাবার বেচেন তিনদশক যাবৎ। মূলত প্যাটিস বেচা পয়সাতেই তাঁদের সংসার নির্বাহ হয় কোনওরকমে। তাঁদের পসরায় থাকে নিরামিষ ও আমিষ দু’রকমেরই খাবার। দু’ধরনের ক্রেতাই সেসব সাগ্রহে কিনে খান। ক্রেতাদের তা নিয়ে কখনও কোনও সমস্যা হয়নি, তাঁরা বিন্দুমাত্র আপত্তিও করেননি কখনও। আর ব্রিগেডের মতো জায়গায় ব্যবসা করতে এসে ‘জনরোষের শিকার’ হওয়ার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তাঁদের জীবনে এই প্রথম। সৌজন্যে দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভক্তকুল। এই ঘটনা বর্বরোচিত এবং অত্যন্ত নিন্দনীয়। বিষয়টি ইতিমধ্যেই পুলিশ এবং আদালতের গোচরে আনা হয়েছে। প্রশাসনের উচিত দুর্বৃত্তদের দ্রুত চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা। অভিযুক্তরা এই যাত্রায় রেহাই পেয়ে গেলে তাদের দুঃসাহ বেড়ে যাবে। ‘বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি’ বলে আমাদের যে অহংকার, অদূর ভবিষ্যতে তা ধূলিসাৎ হতে পারে এই দুর্বৃত্তদের আজ রেয়াত করা হলে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ