Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

কমিশনের কাছে বাংলার প্রত্যাশা

রাজ্যে এসআইআর শুনানি সবে শেষ হয়েছে। তবে শুনানিতে জমা পড়া নথি স্ক্রুটিনি এখনো শেষ হয়নি। মাইক্রো অবজার্ভার ও রোল অবজার্ভাররা বিধানসভা কেন্দ্র ভিত্তিক নথি পরীক্ষা করছেন।

কমিশনের কাছে বাংলার প্রত্যাশা
  • ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

রাজ্যে এসআইআর শুনানি সবে শেষ হয়েছে। তবে শুনানিতে জমা পড়া নথি স্ক্রুটিনি এখনো শেষ হয়নি। মাইক্রো অবজার্ভার ও রোল অবজার্ভাররা বিধানসভা কেন্দ্র ভিত্তিক নথি পরীক্ষা করছেন। আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি, শুনানিতে তলব এবং নথিগ্রহণ নিয়ে ইসিআই লাগাতার সিদ্ধান্তহীনতার পরিচয় দিয়েছে। ইসিআই আজ যা বলেছে কালই বাতিল করেছে তা কিংবা তাতে নতুন কিছু সংযোজন অথবা বিয়োজন করেছে। সব মিলিয়ে মধ্যযুগের নিন্দিত তুঘলকি কারবারের সঙ্গেই তুলনা চলে এসেছে জ্ঞানেশ কুমারের দপ্তরের কর্মকাণ্ডের। তবে জ্ঞানেশ কুমার অ্যান্ড কোং-এর এই বেনজির কারবারে বাংলার সাধারণ ভোটারদের জিনা হারাম হওয়ার অবস্থা হয়েছে। আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে ঘরে ঘরে। শতাধিক মানুষ মারাও গিয়েছেন। তাঁদের কেউ ভোটার, কেউ-বা বিএলও। সব মিলিয়ে রাজ্যজুড়ে নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। প্রতিবাদের ঢেউ, বিচারের দাবি পৌঁছে গিয়েছে রাজপথ থেকে বিধানসভা, সংসদ, এমনকি সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত। তবু ইসিআই বাস্তবজ্ঞানের পরিচয় দিতে নারাজ, বরং মানুষের প্রতিবাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে কমিশনের ‘স্বৈরাচার’! বহু ভোটারকে শুনানি কেন্দ্রে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে একাধিকবার। কিছু ভোটারের নথি একবার যাচাই করেই ক্ষান্ত হয়নি তারা, কিছু বাছাই ভোটারের নথি পুনরায় যাচাই করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মাইক্রো অবজার্ভারদের। সম্প্রতি এক বৈঠকে মাইক্রো অবজার্ভারদের বলা হয়েছে, পঞ্চায়েত প্রধানের ইস্যু করা জন্মের সার্টিফিকেট তাঁরা যেন গ্রহণ না করেন, সেগুলি বাতিলই গণ্য করতে হবে। অথচ নিয়ম অনুযায়ী, এতদিন গ্রামীণ এলাকায় প্রধানরাই জন্মের শংসাপত্র দিয়ে এসেছেন। স্বভাবতই প্রশ্ন, ভোটারদের ভোগান্তি আরো বৃদ্ধির প্ল্যান নিয়েই কি কমিশন এগোচ্ছে? 

Advertisement

কমিশনের এসআইআর ভূমিকা নিয়ে তৃণমূল সেনাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভীষণ ক্ষুব্ধ। তাঁদের স্পষ্ট বক্তব্য, স্বাধীন নিরপেক্ষ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হয়েও ইসিআই কেন্দ্রীয় শাসক দলের আজ্ঞাবহ দাসের ভূমিকায় অবতীর্ণ। কমিশন বিজেপির হুকুম মতো এবং তাদের সুবিধে পাইয়ে দিতেই যাবতীয় পদক্ষেপ করছে। বাংলায় মোদি-শাহের পার্টির মজবুত সংগঠন নেই। রাজ্যবাসীর মন জয়ের জন্য কোনো কাজই করে না মোদি সরকার। উলটে বাংলার মানুষকে জব্দ করার জন্য কেন্দ্রীয় বঞ্চনা, প্রতারণার রেকর্ড গড়ে চলেছে মোদি জমানা। স্বভাবতই ভোটের বাজারে গেরুয়া শিবিরের কানাকড়িও মূল্য নেই প঩শ্চিমবঙ্গে। অথচ নবান্ন দখলের ইচ্ছে ষোলো আনার জায়গায় আঠারো আনা, সেই স্বপ্নেই বিভোর শমীক ভট্টাচার্য থেকে নরেন্দ্র মোদি। সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না নিশ্চিত হয়েই বিজেপির থিঙ্কট্যাঙ্ক বিশেষ প্ল্যানমাফিক এগোচ্ছে। তার প্রথমটা হল বাংলায় কেন্দ্রীয় এজেন্সির নির্বাচিত এবং অতিসক্রিয়তা। দ্বিতীয়টার নাম এসআইআর। পরবর্তী ধাপে আছে ভোটের আগেই কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন। এজন্য এরিয়া ডমিনেশন থেকে শুরু করে ঝামেলাপ্রবণ এলাকাগুলিতে মানুষের মনোবল বৃদ্ধির যুক্তি দেওয়া হয়। কিন্তু রাজ্যের শাসকের অভিযোগ থাকে, এই পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষকে ভীত করা এবং তৃণমূলকে চাপে রাখা। 
এই জিনিস অবশ্য নতুন নয়—২০২১ বিধানসভা নির্বাচন এবং ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনেও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের অনুশীলন দেখেছে রাজ্যবাসী। ফের তার পুনরাবৃত্তি করতে চলেছে কমিশন। এসআইআর আবহে এবং ভোট ঘোষণার আগেই বঙ্গে কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জ্ঞানেশ কুমাররা। তবে এই মুহূর্তে ঠিক কত কোম্পানি আধাসেনা এখনই পাঠানো হবে, তা অজানা। দিনকয়েক আগেই রাজ্যে স্পর্শকাতর বুথ ও এলাকা চিহ্নিত করতে প্রতিটি জেলাকে নির্দেশ পাঠিয়েছিল কমিশন। ভোটে হিংসার ইতিহাস ও দৈনন্দিন আইনশৃঙ্খলা রিপোর্টের ভিত্তিতে, স্পর্শকাতর বুথ ও ভোটকেন্দ্র ছাড়া অতিস্পর্শকাতর এলাকাও চিহ্নিত করতে বলা হয়েছে জেলাগুলিকে। কাজটা এগিয়েছেও অনেকাংশে। একেকজন সেক্টর অফিসার ১০ থেকে ১২টি বুথের পরিস্থিতি পর্যালোচনাসহ এই তালিকা দ্রুত তৈরি করছেন। গোটা প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর জেলাগুলির রিপোর্ট জমা পড়বে সিইও দপ্তরে। সেগুলি একত্র করে পাঠানো হবে দিল্লিতে নির্বাচন সদনে। ভোট ঘোষণার আগে কোথায় কীভাবে বাহিনী নিয়োগ করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে তারপরই। প্রথম পর্যায়ে, অর্থাৎ ভোট ঘোষণার আগে মূলত অতিস্পর্শকাতর এলাকাগুলিতেই বাহিনী আসছে। সংসদীয় গণতন্ত্র রক্ষায় নির্বাচনের ভূমিকাই প্রধান। নিরপেক্ষভাবে এবং পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে ভোটগ্রহণ হলেই সেই উদ্দেশ্য সাধিত হওয়া সম্ভব। কিন্তু টি এন সেশনের জমানা বাদ দিলে কমিশন কবে এই কাজে বিশেষ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে? কোনো আশাব্যঞ্জক উত্তর মেলে না। তাই কমিশনের কাছে রাজ্যবাসীর প্রত্যাশা, ইসিআই যেন এসআইআর এবং নির্বাচন অনুষ্ঠানে পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহাসিক সমস্যার কথা মাথায় রেখেই বাস্তববোধের পরিচয় দেয়। অন্যথায় এই নির্বাচন ব্যর্থতা ও যন্ত্রণার নামান্তর হতে পারে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ